ঈদ-উল-আজহা ও কোরবানির শিক্ষা

আফতাব চৌধুরী : ঈদ-উল-আজহা সারা মুসলিম বিশ্বে খুশি, হজের প্রীতি আর কোরবানির পরিতৃপ্তিতে আলো ও বাতাস ছড়িয়ে দেয়। এ সময়ে দিকে দিকে হাসিখুশি, খানাপিনা, দান-খয়রাত চলতে থাকে। ঈদ-উল-আজহার তিনটি প্রধান অঙ্গ-হজ, কোরবানি ও যাকাত। এ তিনটি ধর্মীয় কর্মকান্ডে সঠিক তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের পাতায়। মহররমের সঙ্গে জড়িত কারবালা প্রান্তরের রক্তে রাঙ্গা ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত ছিল বাবেল প্রদেশ, পরবর্তীকালের ‘বেবিলন’ শহর এবং বর্তমানের ইরাক রাষ্ট্র। এ বাবেল প্রদেশের রাজা ছিলেন নমরুদ। বাবেলবাসীরা ছিলেন পৌত্তলিক আর রাজা নমরুদ ছিলেন নাস্তিক। নমরুদ নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করতেন। এবং নিজের মূর্তিকে ঈশ্বর বলে পূজা করার ফতোয়া জারি করেন সারা দেশে। তার আদেশ লঙ্ঘন করার ক্ষমতা কারও ছিল না।

দিন যায়, মাস যায়, ঘুরে আসে নতুন বছর। একরাতে নমরুদ স্বপ্ন দেখলেন, আকাশ থেকে একটি উজ্জল তারকা তার দিকে ছুটে আসছে। রাজার স্বপ্ন বলে কথা। ভোর হতে না হতে রাজপন্ডিতকে ডেকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা চাইলেন নমরুদ। রাজপন্ডিত শাস্ত্র ঘেটে জানালেন নমরুদের রাজ্যে এমন এক শিশুর জন্ম হবে যার হাতে তার মৃত্যু হবে। সঙ্গে সঙ্গে রাজাদেশ জারি হল, বাবেল প্রদেশে যত শিশুর জন্ম হবে রাজঘাতক তাকে হত্যা করে ফেলবে। প্রজাদের পূজার জন্য নমরুদের মূর্তি তৈরী করত এক মৃৎশিল্পী। তার নাম ছিল আজহার এবং তার স্ত্রীর নাম ছিল আদনা। আদনার গর্ভে জন্ম নিল এক শিশু। নাম রাখা হল ইব্রাহিম (আ.)। আজহার-আদনা দম্পতি রাজকোষ থেকে রক্ষা করার জন্য ইব্রাহিমকে (আ.) এক গর্তের ভিতর লুকিয়ে রাখলেন। শিশু জন্মের কথা মাতাপিতা ছাড়া আর কেউ জানতেন না। মাতা আদনা শিশু ইব্রাহিমকে (আ.) অন্ধকার কূপের মধ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে লালন পালন করলেন দীর্ঘ ৭ বছর। এর পর শিশু ইব্রাহিম (আ.) অন্ধকার কূপের জীবন ছেড়ে এলেন আলো-বাতাস ভরা মানব সমাজে। স্রষ্টার সৃষ্টি এত আলো এত তারা- নক্ষত্র, এত গাছপালা, এত মানুষ এত জীবজন্তু এক বৈচিত্র রূপে দেখা দিল শিশু ইব্রাহিমের (আ.) চক্ষে। মনের কোণে প্রশ্ন জাগল কে এর স্রষ্টা। সৃষ্টি ও স্রষ্টা সম্পর্কে নানা প্রশ্নে ইব্রাহিমের (আ.) শিশুমনকে করে তুলল অস্থির।

ধীরে ধীরে পিতা-মাতার পৌত্তলিক বিশ্বাস ও বাদশা নমরুদের মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে মত পোষণ করলেন শিশু ইব্রাহিম (আ.)। সৃষ্টি রহস্যের নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিশেহারা ইব্রাহিম মগ্ন হন গভীর তপস্যায়। দর্শন লাভ করেন সৃষ্টির সাথে। প্রচার করলেন, তৌহিদের বানী একশ্বেরবাদ। রাজরোষের ভয়ে কুমার আজহার পুত্রকে আপন গৃহ থেকে বহিস্কার করে দিলেন। ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক নমরুদের ঈশ্বরত্বের প্রতিবাদের খবর পৌঁছল রাজ দরবারে। রাজার আদেশে একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ইব্রাহিমকে (আ.) বন্দী করে আনা হল রাজ দরবারে। নির্ভীক যুবক ইব্রাহিম (আ.) রাজসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন তার একশ্বরবাদের কথা। রাগে অপমানে নমরুদের মাথায় আগুন চড়ল। রাজা হল ইব্রাহিমের (আ.) প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড। তৈরী হল বিরাট অগ্নিকুন্ড। নিক্ষেপ করা হল ইব্রাহিমকে (আ.) সে অগ্নিকুন্ডে। দৈববাণী হল অগ্নির প্রতি, অগ্নিকুন্ড হয়ে উঠল ফুলবাগিচা। ইব্রাহিম (আ.) অবস্থান করলেন সেখানে চল্লিশ দিন। মতান্তরে ষাট দিন।

এ ঘটনার চল্লিশ দিন পর ইব্রাহিমের (আ.) প্রতি দৈববাণী হল, শ্যামদেশে (বর্তমান সিরিয়ায়) যাওয়ার জন্য। ইব্রাহিম (আ.) যেদিন সিরিয়ায় পৌঁছলেন, সে দিন ছিল রাজকুমারী ছরার স্বয়ম্ভর সভা। দেশবিদেশ থেকে আগত অনেক সুসজ্জিত রাজকুমার ছারার পাণিপ্রার্থী হয়ে উপস্থিত হয়েছেন। দীর্ঘ পথক্লেশে ক্লান্ত, ময়লা-ছেঁড়া বস্ত্রধারী ইব্রাহিম (আ.) দর্শক রূপে রাজকুমারদের পাশে দাঁড়ালেন। রাজকন্যা ছারা বরণমালা দিলেন ইব্রাহিমের (আ.) গলায়। সভাস্থলে সবাই অবাক। স্বর্গ থেকে ধ্বনিত হল ‘মার হাŸা ইয়া ইব্রাহিম, মার হাব্বা ইয়া ছারা’। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এখন আর কুমার আজহর নন্দন ইব্রাহিম (আ.) নন। তিনি এখন শ্যামদেশের রাজ জামাতা। শ্বশুরের দেশে ইব্রাহিম (আ.) শুরু করলেন একেশ্বরবাদের প্রচার। কিছুদিন যেতে না যেতে আবার আদেশ হল, ইব্রাহিমকে (আ.) মিশরে যাওয়ার জন্য।

মিশরের রাজা তখন স্বেচ্ছাচারী ফারাহ। চরিত্রহীন, লম্পট স্বভারের লোক। নারীদেহ ছিল তার সবচেয়ে লোভনীয় বস্তু। ইব্রাহিম (আ.)-ছারা দম্পতি মিশরে পৌঁছার সাথে সাথে দুজনকে বন্দি করে হাজির করা হল রাজার স¤মুখে। সুন্দরী, মহীয়সী রমণী ছারার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে বাদশা ফারহ। নানা মিথ্যা অজুহাতে ইব্রাহিমকে (আ.) বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করে ছারাকে নিয়ে আসলেন নিজ হারেমে। উদ্দেশ্য তার একটি। ছারাকে নিজের ভোগের পণ্য করে হারামে রাখা।

এক গভীর রাত্রে বিবি ছারা গভীর নিদ্রায় মগ্ন। ফারাহ চুপি চুপি প্রবেশ করলেন বিবি ছারার শয়নকক্ষে। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে? বিবি ছারার সতীত্বের তেজে বাদশা ফারহ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। তার সারা দেহ অবশ হয়ে গেল এবং দুটি চোখও অন্ধ হয়ে পড়ল। ভীত, শঙ্কিত বাদশাহ ফারাহ পায়ে ধরে মাফ চাইল বিবি ছারার কাছে। ছারা তাকে বললেন, মাফ চাও আল্লাহর কাছে। ফারাহ মাপ চাইল আল্লাহর কাছে। সঙ্গে সঙ্গে সে ফিরে পেল দেহের শক্তি ও চোখের জ্যোতি। গ্রহণ করল অনেক প্রজাকে সঙ্গে নিয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রবর্তিত একেশ্বরবাদ এবং নিজের কন্যা হাজেরাকে উপটৌকন হিসাবে দিলেন বিবি ছারাকে। বিবি ছারার কোনও সন্তান ছিল না। তাই সন্তানের মুখ দর্শনের আশায় স্বামী হযরত ইব্রাহিমের (আ.) সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দেন হাজেরার। কিছুদিন পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্ত্রীদ্বয়কে সঙ্গে নিয়ে চলে যান ফিলিস্তিনে। সেখানে পৌঁছানোর পর আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ হল, ইব্রাহিমকে (আ.) নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার। খোদাভক্ত হযরত ইব্রাহিম (আ.) স্ত্রীদ্বয়কে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন নিজের মাতৃভ‚মি বাবেলে। তৌহিদের কলেমা একেশ্বরবাদ গ্রহণ করার প্রস্তাব পাঠালেন বাদশা নমরুদের কাছে। ফল হল বিপরীত। নমরুদ হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) খোদার সঙ্গে স¤মুখ সমরে মুখামুখি করার বাসনা ব্যক্ত করলেন।

নমরুদ একদল সৈন্য নিয়ে নিকটবর্তী খোলা মাঠে উপস্থিত হয়ে আহ্বান করলেন ইব্রাহিম (আ.) প্রচারিত সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে স¤মুখ সমরে। ক্ষমতার দর্পে উন্মত্ত নমরুদ অপেক্ষা করতে লাগলেন ইব্রাহিমের (আ.) খোদার। কদিন পর হঠাৎ দেখা গেল আকাশে একটুকরো কালো মেঘ। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল ঝাঁকে ঝাঁকে মশার দল এবং দংশন করতে লাগল নমরুদের সৈন্যদের। মশার কামড়ে দিশেহারা হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল নমরুদের সৈন্যদল। একটি মশা প্রবেশ করল নমরুদের নাকের ভিতর দিয়ে মস্তিস্কে এবং কামড়াতে শুরু করল মস্তিস্কের ভিতর। মস্তিস্কে মশার কামড়ে অস্থির নমরুদ তার চাকরকে আদেশ দিল তার মাথায় জোরে আঘাত করতে। শেষ পর্যন্ত চাকরের এক কঠিন আঘাতে নমরুদের মৃত্যু হল। এভাবে সামান্য একটি মশার কামড়ে মৃত্যু হল বলদর্পী নাস্তিক নমরুদের।

নমরুদের মৃত্যুর পর বাবেলে একেশ্বরবাদ প্রচারে আর কোনও প্রতিবন্ধকতা রইল না হযরত ইব্রাহিমের (আ.) সামনে। ইত্যবসরে বিবি হাজেরা জন্ম দিলেন এক পুত্র সন্তানের। নাম রাখা হল ইসমাইল (আ.)। ইসমাইলের (আ.) জন্ম এবং নমরুদের মৃত্যু, ইব্রাহিমের (আ.) জীবনে এক নতুন গতি সঞ্চার করল তৌহিদের কলেমা (একেশ্বরবাদ) প্রচারে। কিন্তু বাধা সাধলেন বিবি ছারা। সতীসাধ্বী, মহীয়সী রমণী বিবি ছারা পারলেন না বিবি হাজেরার গর্ভজাত সন্তানকে মাতৃস্নেহে কোলে তুলে নিতে। তার ভেতর বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। ইব্রাহিমের (আ.) উপর তার প্রভাব হাজেরার তুলনায় বেশী। তাই স্বামীকে প্ররোচিত করলেন সতীন হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে (আ.) নির্জন মরুপ্রান্তরে নির্বাসন করতে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হযরত ইব্রাহিম (আ.) একদিকে প্রিয়তমা পত্মী বিবি ছারার বাসনা, অন্যদিকে বিবি হাজেরা ও তার প্রাণপ্রিয় শিশুপুত্র ইসমাইল। হযরত ইব্রাহিম (আ.) উভয় সঙ্কট থেকে উদ্ধার করলেন খোদা নিজে। নির্দেশ হল- ইব্রাহিম (আ.)- ছারার বাসনা পূর্ণ কর। খোদাভক্ত ইব্রাহিম (আ.) বিবি হাজেরা ও শিশুপুত্র ইসমাইলকে রেখে আসলেন নির্জন, জনমানবহীন মরুভ‚মির মাঝখানে।

অনেকক্ষণ একাকী থাকার পর ভয়ে দুঃখে কাতর মা হাজেরা পুত্র ইসমাইলের মুখে দেওয়ার জন্য পানি সংগ্রহ করার মানসে ছোটাছুটি করতে থাকেন, ছাপা ও মারওয়া এ দুই পাহাড়ের মাঝখানে। এক ফোটা পানি না পেয়ে ফিরে আসলেন পুত্রের কাছে। অবাক হয়ে দেখলেন শিশুর পায়ের আঘাতে বালুর মধ্যে এক ছোট গর্ত হয়েছে আর তা থেকে বেরিয়ে আসছে আবে জম-জম। এক স্বর্গীয় পবিত্র পানিধারা। এ পবিত্র পানি দেন শিশুপুত্রের মুখে আর নিজে পান করলেন অঞ্জলি ভরে। খোদার প্রতি জানালেন অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা। পরবর্তীকালে এ আবে জম-জম ধারাকে কেন্দ্র করে সে নির্জন মরুর বুকে গড়ে উঠে লোকালয়, ব্যবসাকেন্দ্র ও আজকের মক্কানগরী। এভাবে দিন যায়, মাস যায়-ইসমাইল (আ.) ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। ওদিকে বাবেলে ইব্রাহিমের (আ.) প্রতি নির্দেশনা হল- যাও ইব্রাহিম আপন স্ত্রী-পুত্রের কাছে। বিবি ছারাকে সঙ্গে নিয়ে ইব্রাহিম (আ.) মক্কায় এসে মিলিত হলেন বিবি হাজেরা ও প্রাণপ্রিয় সন্তান ইসমাইলের সাথে। মক্কায় পৌঁছেই হযরত ইব্রাহিম (আ.) বেদুইন পৌত্তলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে একেশ্বরবাদ প্রচারে মগ্ন হয়ে যান। হযরত ইব্রাহিমের (আ.) খোদাভক্তি ও ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে খোদা তাকে শেষ অগ্নি পরীক্ষায় অবতীর্ণ করলেন।

হযরত ইব্রাহিম (আ.) একরাত্রে স্বপ্নাদেশ পেলেন কোরবাণী দাও আপন প্রিয় বস্তু। পরদিন হযরত ইব্রাহিম (আ.) কোরবাণী করলেন একশত উট। কবুল হল না খোদার কাছে। পরের রাত্রে একই স্বপ্নাদেশ। আবার কোরবাণী করলেন একশত উট। কবুল হল না। তৃতীয় রাত্রে আদেশ হল আপন পুত্র ইসমাইলকে (আ.) কোরবাণী কর। এ কী অগ্নি পরীক্ষা! দেখা যাক কে হারে? স্রষ্টা না সৃষ্টি? হযরত ইব্রাহিম (আ.) বিবি হাজেরাকে স্বপ্নাদেশের কথা জানালেন। বিবি হাজেরা হাসিমুখে বারো বছরের পুত্র ইসমাইলকে (আ.) নিজহাতে সাজিয়ে তুলে দিলেন স্বামীর হাতে। পিতা-পুত্র উপস্থিত হলেন- নির্জন মিনা ময়দানে। বেহেস্ত থেকে ধ্বনিত হচ্ছিল, মারহা্বা ইয়া ইব্রাহিম, মারহাব্বা ইয়া ইসমাইল।ঞ্চ হযরত ইব্রাহিম (আ.) পুত্র ইসমাইলকে (আ.) মিনা ময়দানে আসার কারণ ও খোদার আদেশের কথা জানালেন। বাপের বেটা ইসমাইল নির্ভীকভাবে বললেন আপনি আপনার কর্তব্য স¤পাদন করুন। খোদার নামে কোরবাণী হওয়া এ তো আমার ভাগ্যের কথা। আপনি আমাকে ধৈর্যশীল দেখবেন। ইব্রাহিম (আ.) নিজের মাথার পাগড়ি দিয়ে পুত্র ইসমাইলের (আ.) ও নিজের চোখ বেঁধে সজোরে ছুরি চালালেন পুত্র ইসমাইলের গলায়। নিজে অনুভব করলেন ইসমাইলের (আ.) গলা ভেদ করে ছুরি চলেছে। চোখ খুলে দেখলেন পাশে ইসমাইল (আ.) দন্ডায়মান এবং তার জায়গায় কোরবাণী হয়ে আছে একটি দুম্ভা (ভেড়া, ছাগল)। সে মুহুর্তে জিব্রাইল (আ.) উপস্থিত হয়ে ইব্রাহিমকে (আ.) জানালেন খোদা তাঁর কোরবাণী কবুল করেছেন। খোদাভক্তি ও ত্যাগের অগ্নিপরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন।

সেদিন ছিল জিলহজ্ব চান্দ্রমাসের দশ তারিখ। এ ঘটনার পর থেকে হযরত ইব্রাহিমের (আ.) অনুকরণে প্রত্যেক মুসলমান তার খোদাভক্তির প্রতীক স্বরূপ গরু-মহিষ-ভেড়া-ছাগল ইত্যাদি কোরবাণী করে খোদার কাছে প্রার্থণা করে, হে খোদা এ পশুর কোরবানীর মধ্য দিয়ে তুমি আমার অন্তর থেকে ষড় রিপুকে দূর করে আমার মনকে পবিত্র করেছ। এ হল কোরবানীর ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক সংক্ষিপ্ত তাৎপর্য।

ঈদ-উল-আজহার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের পাঁচটি ফরজের মধ্যে শেষ দুটি ফরজ পালন জড়িত রয়েছে। ইসলাম ধর্মের পাঁচটি ফরজ (অবশ্য পালনীয়) হচ্ছে ১) কলেমা (একেশ্বরবাদে বিশ্বাস) ২) নামাজ (আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ) ৩) রোজা (সংযম) ৪) হজ্ব ৫) যাকাত।

প্রথম তিনটি ফরজ ধনী-দরিদ্র সকল মুসলমানের জন্য অবশ্য পালনীয়। চতুর্থ ও পঞ্চম ফরজ পালনীয় আর্থিক স্বচ্ছল শ্রেণীর জন্য। আর্থিক স্বচ্ছলতা সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান কমপক্ষে জীবনে একবার মক্কায় গিয়ে ঈদ-উল- আজহা উপলক্ষে হজব্রত পালন করা ফরজ। অনুরূপে যাকাত হচ্ছে বাৎসরিক আয়কর প্রদান। জিলহজ মাস হল, চন্দ্র বৎসরের শেষ মাস। তাই প্রত্যক মুসলমান এ মাসে তার বিগত অর্থ বছরের আয় ব্যয় হিসাব করে ঈদ-উল-আজহা পূর্বে তার বাৎসরিক আয়কর যাকাত প্রদান করতে হয়। এ যাকাত প্রদানের পদ্ধতি অনেকটা আমাদের আয়কর প্রদান পদ্ধতির মতই। প্রত্যেক মুসলমান তার বিগত বৎসরে মোট আয় হতে ভরণ-পোষণ বাদ দেওয়ার পর সাড়ে সাত তোলা সোনার স্থানীয় বাজারমূল্য বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট আয় থাকবে তার পঞ্চাশ শতাংশ নিজের গরীব নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর মধ্যে বিতরণকরে দেওয়ার নাম যাকাত। বর্তমান অর্থ ব্যবস্থার দুই অভিশাপ কালো টাকা ও ধনী দরিদ্রের ব্যবধানের একমাত্র সমাধান এ যাকাত। যাহা নিছক রাষ্ট্রীয় কর্তব্য নহে। ধর্মের দিক থেকে ফরজ।

আসুন আমরা সবাই আমাদের মনের ষড়রিপূকে কোরবানি দিয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ঈদের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হই। আমাদের পরিচয় হোক আমরা মানুষ-সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই।

You Might Also Like