ইসলামী অর্থনীতি দর্শন ও কর্মকৌশল

ইসলামী অর্থনীতি বর্তমানে একটি বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এ কথাও বলা যায় যে, এ সাবজেক্টের বয়সও খুব বেশি নয়। মাত্র সত্তর বা আশি বছর। এর আগে এটা পলিটিক্যাল সায়েন্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তখন এটাকে পলিটিক্যাল ইকোনমি বলা হতো।

গত সত্তর বছর ধরে ইসলামী অর্থনীতির ওপর ব্যাপক কাজ হচ্ছে। বেশ কিছু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সিনিয়র অর্থনীতিবিদ এই বিষয়ে কাজ করছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর খুরশীদ আহমদ, ড. নাজাত উল্লাহ সিদ্দিকী, প্রফেসর ড. ওমর চাপড়া, ড. মনজের কাহাফ, ড. তরিকুল্লাহ খান, ড. মুনাওয়ার ইকবাল প্রমুখ। এ ছাড়াও অন্য স্কলাররা এই বিষয়ে অনেকে কাজ করেছেন। আস্তে আস্তে ইসলামী অর্থনীতি একটি পূর্ণ বিজ্ঞানে পরিণত হয়েছে।

ইসলামী অর্থনীতির ওপর আলোচনা করতে গেলে এর যে দর্শন বা স্ট্র্যাটেজি সেই বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। ইসলামী অর্থনীতির দর্শনই হলো এই অর্থনীতির ভিত্তি অথবা তার স্ট্র্যাটেজি বা কর্মকৌশলের ভিত্তি। কেননা, একটি বিল্ডিং যেমন নির্ভর করে তার ফাউন্ডেশনের ওপর, ফাউন্ডেশনটাই বলে দেয় বিল্ডিংটি কী রকম হবে, তেমনিভাবে ইসলামী অর্থনীতির দর্শন বলে দেয় যে, তার স্ট্র্যাটেজিটা কী হবে বা কী হওয়া উচিত।

কিন্তু সেই দর্শন এবং কর্মকৌশল আলোচনার আগে আমি মনে করি, বর্তমান বিশ্বে যা চলছে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা দরকার। বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক চলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে ক্যাপিটালিজম। আমরা যদি এই ক্যাপিটালিজমের সমস্যাগুলো বুঝতে পারি তা হলেই ইসলামী অর্থনীতির গুরুত্ব বুঝতে পারব। এটা এই জন্যই প্রয়োজন যে, বর্তমান রুলিং আইডিওলজি দৃশ্যত খুব শক্তিশালী, খুব সফল বলে মনে হয়। অনেকের এ-ও মনে হতে পারে যে, এর বুঝি কোনো দুর্বলতা নেই। কিন্তু এ কথাটা সত্য নয় এবং এ কথাটাই আমি এখানে আলোচনা করতে চাই।

ক্যাপিটালিজমের বয়স ষোড়শ শতাব্দী থেকে ধরা হয়। প্রায় পাঁচ শ’ বছর এর বয়স। এই পাঁচ শ’ বছরে ক্যাপিটালিজম যে দুনিয়ার অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে তা অস্বীকার করা যাবে না। তেমনি এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, ক্যাপিটালিজম বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য, অসমতা দূর করতে পারেনি। কাজেই ক্যাপিটালিজম দোষমুক্ত বা সমস্যামুক্ত এটা যেমন অতীতের ক্ষেত্রে বলা যায় না, তেমনি আজকেও বলা যায় না। আজকেও আমরা জাপানের অর্থনীতির মধ্যে একটা নিম্নগতির ধারা, আর্জেন্টিনাতে বিরাট অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখি। সেখানে অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে পাঁচ-ছয় মাসে চারজন প্রেসিডেন্ট বদল হয়েছে এবং এখনো বিরাট ক্রাইসিস চলছে।

আমরা গত বিশ বছরে পুঁজিবাদী বিশ্বের অনেক সঙ্কট দেখেছি। সাউথ ইস্ট এশিয়ায় বিরাট অর্থনৈতিক ক্রাইসিস দেখলাম বিগত শতাব্দীর একেবারে শেষের দিকে এবং সেটি এখনো চলছে। ল্যাটিন আমেরিকাতেও আমরা বিভিন্ন সময় ক্রাইসিস দেখেছি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও আমরা বিভিন্ন সময় ডাউনটার্ন লক্ষ করেছি। এ সম্পর্কে অনেক কথা বলা যায়।

ক্যাপিটালিজম আমরা কম-বেশি সবাই বুঝি। বিভিন্ন অর্থনৈতিক মতবাদ প্রধানত পাশ্চাত্যেই তৈরি হয়েছে। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরাই এর ওপর বেশি কাজ করেছেন। এ কথাগুলো শুধু ক্যাপিটালিজমের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, সোস্যালিজমের ক্ষেত্রেও সত্য। ওয়েলফেয়ার ইকোনমিকস নামে যা বিশ্বে চলছে সেটিও পাশ্চাত্যেরই অবদান। পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদরাই এসব ধারণা নিয়ে এসেছেন।

ক্যাপিটালিজমের ভিত্তি ছিল বা এর পেছনে শুরুতে কাজ করত খ্রিষ্টান এথিকস বা খ্রিষ্টান নৈতিকতা। কারণ পাশ্চাত্যের যেখানে এর বিকাশ ঘটে সেই সমাজ মূলত খ্রিষ্টান সমাজ ছিল। মৌলিকভাবে জনগণ খ্রিষ্টীয় এথিকসে বিশ্বাস করত। ফলে ক্যাপিটালিজমের অর্থনৈতিক নীতিমালায় যা-ই ত্রুটি থাকুক না কেন, খ্রিষ্টান এথিকস তাকে মডারেট করত, তার খারাপ প্রভাবকে সংযত করত, তাকে নিয়ন্ত্রণ করত।

পরবর্তীকালে কোনো কোনো লেখকের দ্বারা অষ্টাদশ শতাব্দীতে মুক্তবুদ্ধির যে আন্দোলন শুরু হয় তার মূল দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধর্মকে জীবনের মৌলিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেয়ারও চেষ্টা করা হলো। এই আন্দোলনের কারণে বাস্তবে সেক্যুলারিজম প্রাধান্য পায় এবং সমাজ সেক্যুলারিস্ট হয়। সেখানে মরালিটি শুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং যুক্তিকে (রিজন) প্রাধান্য দেয়া হয়। এতে মনে করা হলো, যুক্তিই সবকিছুর সমাধান করতে পারে। যদিও আমরা জানি, যুক্তিবাদে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এর দ্বারা সব সমাধান করা যায় না। যুক্তিবাদ সত্ত্বেও মানুষের ভেতর মতবিরোধ দেখা দেয় এবং আজকে যেটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় কালকে সেটি যুক্তিসঙ্গত থাকে না। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা সময় গেছে যখন রিজনকে প্রায় পূজা করা হতো। আল্লাহর স্থানে, গডের স্থানে রিজনকে নিয়ে আসা হলো। ভ্রান্ত ছিল সেটি, বিভ্রান্তি ছিল, ভুল ছিল।

এনলাইটমেন্ট মুভমেন্টের কারণে (ক্যাপিটালিজমের ভিত্তি হওয়ার কারণে বা এর ফলস্বরূপ) চলে এলো ম্যাটেরিয়ালিজম ভোগবাদ, ব্যক্তিবাদ, স্বার্থপরতার মতো বস্তুবাদের বিষয়গুলো। এর ফলে আসে হাই কনজাম্পশন। অন্য দিকে এটা একটা সামাজিক ডারউইনিজম সৃষ্টি করল। আমরা ডারউইনিজম সম্পর্কে জানি। ডারউইনিজম হচ্ছে জীবজগতের সেই ধারণা যা ডারউইন থেকে এসেছে বা ডারউইন উদ্ভাবন করেছে। অর্থাৎ জীবজগৎ সম্পর্কিত ডারউইনের ধারণাই ডারইউনিজম। এখানেও সোস্যাল ডারউইনিজম বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পেয়েছে। এনলাইটমেন্ট মুভমেন্ট এবং ম্যাটেরিয়ালিজমের বিকাশের কারণে।

ক্যাপিটালিজমের মাধ্যমে এই ধারণা সৃষ্টি হয় যে, অর্থনীতিতেও ন্যাচারাল সিলেকশন হবে এবং এখানে শুধু ফিটেস্টরাই সারভাইভ করবে। যোগ্যরাই বাঁচবে। অর্থনীতিতে যদি তা-ই হয় তা হলে তার মানে হবে প্রকৃতপক্ষে দুর্বলের কোনো স্থান থাকবে না, দরিদ্রের স্থান থাকবে না। যদি থাকেও তা হবে খুব সঙ্কীর্ণ।

সোজা কথায়, বিশ্ব অর্থনীতি বড়লোকের, যোগ্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। অর্থাৎ ম্যাটেরিয়ালিজম এনলাইটমেন্ট মুভমেন্টের কারণে সোস্যাল ডারউইনিজমের কারণে পুঁজিবাদ একটি ডকট্রিনে পরিণত হয়। অর্থনীতিতে শুধু যোগ্যরাই টিকে থাকবে তা দর্শনে পরিণত হয়। এতে দরিদ্রের প্রতি খ্রিষ্টান ইথিকসের কারণে যে মায়া-মহব্বত ছিল, তাদের প্রতি যে দায়িত্ববোধ ছিল, সেটি উঠে গেল। এমনকি দর্শনের মাধ্যমে সেটি উঠে গেল। তখন তারা দরিদ্র মারা গেলে কী হবে সে যুক্তি খাড়া করতে পারল না। যোগ্যদের টিকে থাকার ফলে দরিদ্ররা মরে যাবে। এই ধরনের ফলাফল অষ্টাদশ শতাব্দীর মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের কারণে দেখা দিয়েছিল।

ক্যাপিটালিজমের থিওরির পেছনে কতগুলো অগ্রহণযোগ্য ধারণা ছিল যেগুলো কিছুটা আমাদের জানা দরকার। যেগুলো প্রকৃতপক্ষে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন তারা বলেন, অর্থনীতির আইনগুলো হচ্ছে ফিজিক্যাল ল-এর মতো। যেমন যেভাবে পৃথিবী ঘুরছে বা সূর্য যেভাবে চলছে নিজস্ব নিয়মে অথবা বায়ুপ্রবাহ-নদী বা সমুদ্রের গতি প্রভৃতি ফিজিক্যাল ল’জ যেমন সঠিক তেমনি ইকোনমিক ল’জ সঠিক। এখানে অর্থনীতির আইন ফিজিক্যাল আইনের মতোই এরকম একটা ধারণা নিয়ে আসা হলো। তারা এগুলো বিশ্বাস করে। কিন্তু এটা একেবারে সত্য নয়। আমরা জানি, বাজার ক্রমাগত পরিবর্তন হতে থাকে। যেই পরিবর্তন আমাদের সোলার সিস্টেমে হয় না বা আমাদের ফিজিক্যাল ল’তে হয় না। অথচ যেকোনো বাজার ব্যাপক পরিবর্তনের সম্মুখীন। সুতরাং এ রকমই একটা ভুল ধারণার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপিটালিজম।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার।

You Might Also Like