ইমরান খানের বার্তা

জাতিসঙ্ঘে ভাষণ দিচ্ছেন ইমরান খান

গত শুক্রবার জাতিসঙ্ঘের ৭৪তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দেয়া ভাষণটি এখন বহুল আলোচিত। ৪৯ মিনিটের দীর্ঘ ভাষণটিতে তিনি চারটি মৌলিক ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন এবং প্রতিটি জটিল সমস্যা দর্শকদের বোঝার জন্য সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

সফল ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক হওয়া, ইমরান খান আধুনিক রাজনীতিবিদদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। সাধারণ অধিবেশনে তিনি টেলিপ্রোম্পটার, এমনকি কাগজ না দেখেই এমনভাবে বক্তব্য রেখেছেন যেন সরাসরি কথা বলছেন। অত্যন্ত অভিব্যক্তিপূর্ণভাবে তিনি যখন ভাষণ দিয়েছেন, তখন মনে হয়েছে হৃদয় থেকে কথাগুলো বলছেন এবং প্রতিটি কথার প্রতি তিনি গভীর আস্থা রাখেন।

ইমরান খান ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ভারত কর্তৃক সংঘটিত নৃশংসতার বিষয় তুলে ধরতে জাতিসঙ্ঘে গিয়েছিলেন। ইসলামোফোবিয়া, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থপাচার নিয়েও কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের প্রথম ইস্যুটি ছিল জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে। তার দেশ কিভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সেটি তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ পানি আসে হিমবাহ থেকে। এসব হিমবাহ শুধু পাকিস্তানের অংশ থেকে নয়; এমনকি ভারত থেকেও, কারাকোরাম হিমবাহ, হিমালয় ও হিন্দকুশ হিমবাহ থেকে আসে। এগুলো প্রবাহিত হয় বিপজ্জনক গতিতে। ইতোমধ্যে পর্বতগুলোতে ৫০০০ হিমবাহ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বড় আকারের আকস্মিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের জন্য ধনী দেশগুলোই মূলত দায়ী আর এ বিষয়ে প্রতিকারের কাজে জাতিসঙ্ঘকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।’

ইমরানের দ্বিতীয় ইস্যুটি ছিল মুদ্রা পাচার। এটি নিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতি বেশ সঙ্কটের মুখে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা দরিদ্র দেশগুলো থেকে ধনী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। মুদ্রা পাচার, কর ফাঁকি, পশ্চিমা দেশে বিলাসবহুল সম্পত্তি ক্রয়ের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরা এটা করছেন। এর ফলে ক্রমেই ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর পার্থক্য আরো বাড়ছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র দেশগুলোর সম্পদ তাদের এলিটরা লুট করে নিচ্ছেন। দুর্নীতিবাজ নেতাদের দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিংয়ের সম্পত্তি পশ্চিমা পুঁজিতে বিনিয়োগকৃত। এটা উদ্ধার করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ধনী দেশগুলোর অবশ্যই এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। দরিদ্র দেশগুলো থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থের পাচার তারা অনুমোদন দিতে পারেন না। বিশ্বে এখন পরিবর্তন ঘটছে। গরিব আরো গরিব হচ্ছে এবং ধনী হচ্ছে আরো ধনী। এটি বড় একটি সঙ্কট তৈরি করবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিকে অবশ্যই এসব লুটপাট বন্ধ করার উপায় বের করতে হবে।

ইমরানের তৃতীয় পয়েন্টটি হচ্ছে ইসলামোফোবিয়া। এ বিষয়ে তিনি খোলামেলাভাবে এবং তার গভীর বিশ্বাস থেকে কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘৯/১১’-এর পর থেকে ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিপজ্জনক। ইসলামোফোবিয়ার কারণ হলো কিছু পশ্চিমা নেতা সন্ত্রাসবাদ আর ইসলামকে এক করে দেখেন। তারা ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ, র‌্যাডিকাল ইসলামে’র কথা বলেন। অথচ ইসলাম একটাই। আমরা কেবল হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ইসলামের অনুসরণ করি। এ ছাড়া আর কোনো ইসলাম নেই। সন্ত্রাসের সাথে কোনো ধর্মেরই সম্পর্ক নেই। সব ধর্মের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ন্যায়পরায়ণতা, যা মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে থাকে।

ইমরান খান মুসলিম নেতৃত্বের প্রসঙ্গেও কথা বললেন। উল্লেখ করেন, দুঃখজনক হলো- মুসলিম নেতারা র‌্যাডিকালিজম নিয়ে কথা বলতে ভয় পান। তারা ‘মডারেট’ হতে চান। মুসলিম নেতৃবৃন্দের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, হজরত মুহাম্মদ সা: আমাদের কী বার্তা দিয়েছেন? নবী সা: পবিত্র কুরআনের সাক্ষ্যদাতা। পবিত্র কুরআন হচ্ছে সেই মহাগ্রন্থ, যা মুসলমানদের জীবনের চলার পথনির্দেশনা। কুরআন আমাদের কী নির্দেশনা দিয়েছে, সে বিষয়ে নবী সা: ছিলেন জীবন্ত উদাহরণ। সুতরাং তিনিই ছিলেন আদর্শ যাঁকে আমরা অনুসরণ করতে পারি। হজরত মুহাম্মদ সা: মদিনায় আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনার প্রথম দিনই কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামী রাষ্ট্র দুর্বল, বিধবা, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল; দরিদ্র্রদের জন্য ট্যাক্স সংরক্ষণ করেছিল।

তখন রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল- সব আদম সন্তান সমান, তাদের গায়ের রঙ যাই হোক না কেন। মুহাম্মদ সা: ঘোষণা করেছিলেন, দাসদের সাথে পরিবারের সদস্যদের মতো আচরণ করতে হবে। ফলে মুসলিম বিশ্বে এমন কিছু ঘটেছিল, যা অন্যান্য সভ্যতায় ঘটেনি। মুসলিম বিশ্বে দাস রাজবংশের আবির্ভাব ঘটেছিল। দাসরা রাজা হয়েছিলেন। মামলুক দাসরা মিসর শাসন করেছিলেন। ভারতেও দাসরা শাসন করেছিলেন। সংখ্যালঘুর প্রশ্নে সব ধর্মের উপাসনালয়কে নিরাপত্তা দেয়া ইসলাম পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখে। ইসলাম ঘোষণা করেছে, সব মানুষ সমান। ইসলামের চতুর্থ খলিফা যিনি ছিলেন তখন মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান, তিনি একজন ইহুদির বিরুদ্ধে আদালতের রায়ে হেরে গিয়েছিলেন। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এটিই তখন প্রমাণিত হয়।

ইমরানের চতুর্থ এবং মূল পয়েন্ট ছিল কাশ্মির ইস্যু। তিনি কাশ্মির প্রসঙ্গে ভারত এবং নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। বলেছেন, জাতিসঙ্ঘের মনে রাখা উচিত, ১৯৩৯ সালে ইউরোপ হিটলারের অপরাধকে গুরুত্ব দেয়নি বলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। শুধু এ কথাতেই থামেননি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। মোদির নাম করে বলেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরএসএস নামে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের আজীবন সদস্য। আরএসএস এমন একটি সংগঠন যেটি অ্যাডলফ হিটলার এবং মুসোলিনির হিংস্র আদর্শে অনুপ্রাণিত। নাৎসিরা যে পদ্ধতিতে অন্য সব জাতি থেকে নিজেদের সেরা ভাবত, একইভাবে আরএসএসও সবার চেয়ে সেরা মনে করে নিজেদের। আরএসএস হিন্দুত্ববাদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী। তারা মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়। তারা বিশ্বাস করে, মুসলিম শাসনের ফলে হিন্দুত্ববাদের সোনালি যুগের অবসান ঘটেছে। আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা গোলওয়ালকার। তার ঘৃণার আদর্শই ১৯৪৮ সালে হত্যা করেছে ভারতের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধীকে।

এ প্রসঙ্গে এর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে বিষয়টি আরো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ইমরান। এতে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং তার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী এখনো আরএসএসের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতারা মুসোলিনি এবং হিটলারের প্রশংসা করেছেন। আরএসএসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা এম এস গোলওয়ালকারের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে মোদি নিবন্ধ লিখেছেন এবং তাকে ‘পূজনীয় গুরু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৩৯ সালে ‘উই, আওয়ার নেশানহুড ডিফাইন্ড’ শীর্ষক বইয়ে চূড়ান্ত সমাধান সম্পর্কে মোদির এই গুরু লিখেছেন, ‘একটি জাতি ও তাদের সংস্কৃতির শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য সেমিটিক জাতি ইহুদিদের শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে জার্মানি বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। দেশটির আত্মমর্যাদার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এখানে। জার্মানি এটাও দেখিয়েছে, যেখানে মূলে মতপার্থক্য রয়ে গেছে, সেখানে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির একত্রিত হওয়া কতটা অসম্ভব। হিন্দুস্তানের জন্য এটা একটা ভালো শিক্ষা, যেখান থেকে তারা উপকৃত হতে পারে।’

মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে দুই হাজার মুসলিমকে গলা কাটতে এই ঘৃণার আদর্শ আরএসএসকে প্রেরণা দিয়েছিল। মোদির নির্দেশে গেরুয়া পাঞ্জাবি পরে তিন দিন ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল আরএসএসের সন্ত্রাসীরা। তাদের তাণ্ডবে দুই হাজার মুসলিম নিহত হয়েছিল এবং গৃহহীন হয় দেড় লাখ মুসলিম। মোদি এ কারণে তখন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে আমেরিকা ভ্রমণ করতে পারেননি।

দীর্ঘ ভাষণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য ছিল কাশ্মির ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ। তিনি বারবারই বলতে চেয়েছেন, ভারত শাসিত কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা সম্প্রতি বিলোপ করে প্রায় দুই মাস ধরে ৮০ লাখ কাশ্মিরিকে যেভাবে ‘পশুর মতো’ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, তা যেকোনো সময় বিপজ্জনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তিনি সাবধান করে দেন, আশঙ্কা রয়েছে কাশ্মিরি তরুণ-যুবকেরা যেকোনো সময় সহিংস বিক্ষোভ শুরু করতে পারে, যে জন্য ভারত হয়তো পাকিস্তানকে দায়ী করবে। তেমন কিছু হলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা নাকচ করা যায় না, যে যুদ্ধ পারমাণবিক সংঘর্ষের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। যদি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হয়, তাহলে ছোট দেশ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া পাকিস্তানের কোনো বিকল্প থাকবে না।

ইমরান বলেন, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের উগ্র চিন্তাধারা নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপিকে অন্ধ করে দিয়েছে। যখন কারফিউ উঠে যাবে, তখন কী ঘটবে তারা কী চিন্তা করছেন? কাশ্মিরিদের খাঁচাবন্দী পশুর মতো বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের, এমনকি ভারতপন্থীদেরও গ্রেফতার করে অন্য রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ১৩ হাজার যুবককে ধরে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। যুবকদের ছররা গুলি দিয়ে অন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু যখন ৮০ লাখ কাশ্মিরি বন্দিত্ব ভেঙে ৯ লাখ সৈন্যের মোকাবেলা করবে, তখন কী ঘটবে? আশঙ্কা করছি, রক্তগঙ্গা বইবে।

তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসঙ্ঘের রিপোর্ট অনুসারে গত ৩০ বছরে কাশ্মিরে এক লাখ নাগরিক নিহত হয়েছে, ১১ হাজার নারী হয়েছে ধর্ষিতা। কিন্তু বিশ্ববাসী কিছুই করছে না। কারণ, তারা দেখছে- ভারত তাদের জন্য ১.২ বিলিয়ন জনসংখ্যার বিশাল বাজার। বস্তুগত স্বার্থের কাছে বলি হচ্ছে মানবতা। মুসলমানদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত করে তাদের ব্যাপারে সবাই নীরব হয়ে থাকে। আজকে যদি ইহুদিরা এভাবে অবরুদ্ধ থাকত, তাহলে কি বিশ্বসম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এমন হতো? মুসলিমদের মধ্যে যারা উগ্রবাদে জড়ায়, তারা ইসলামের কারণে নয়, ইনসাফের অভাবেই এ পথে পা বাড়ায়। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায় এড়াতে পারে না।

আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং পশ্চিমা হস্তক্ষেপের কারণে পাকিস্তানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ইমরান। ভারত ও ভারতীয়দের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে তারা কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে তিনি দীর্ঘসময় বক্তব্য রাখেন। এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আফগান প্রসঙ্গ পটভূমি হিসেবে তুলে এনেছেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যোগ দেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান তার সবচেয়ে খারাপ সময় অতিবাহিত করেছে। এতে পাকিস্তানের ৭০ হাজার লোক মারা গেছে, অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ১৫০ বিলিয়ন ডলার। ৭০ হাজার পাকিস্তানি নিহত হলো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে। অথচ ৯/১১-এর সাথে কোনো পাকিস্তানি জড়িত ছিল না। তালেবান ও আলকায়েদা আফগানিস্তানে তৈরি হয়েছে, পাকিস্তানে নয়।

ভারত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার দল ক্ষমতায় আসার পর আমার প্রথম উদ্যোগ ছিল ভারতের ব্যাপারে। নরেন্দ্র মোদিকে বললাম, আমাদের সমস্যাগুলো একই। আসুন, আমরা একসাথে কাজ করি। দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুতে একসাথে কাজ করি। বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে আমরা সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করি। কিন্তু তিনি উত্তরে বললেন, পাকিস্তান সব সময় আমাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। আমি বলেছি, আমাদের সমস্যা একই। একইভাবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ভারতীয় গুপ্তচর কুলভূষণ যাদব ধৃত হয়েছেন। তিনি স্বীকারও করেছেন, ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর হয়ে কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু আসুন, আমরা সেসব বিরোধপূর্ণ বিষয় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাই শান্তির জন্য। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ। কিন্তু মোদি তা মানলেন না।

তিনি আমাদের সাথে সব সংলাপ বাতিল করে দিলেন। মোদি নির্বাচনে প্রচারণা চালিয়েছেন যে, “তিনি পাকিস্তানকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি ছিল ট্রেইলার, পূর্ণ মুভি পরে আসছে।” আমরা ভাবলাম, এটা নির্বাচনে জেতার জন্য দেয়া বক্তৃতা। নির্বাচনের পর আমরা স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যাবো। কিন্তু বিষয়টি তা ছিল না। নির্বাচনের পর আমরা বুঝতে পারি, অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য ভারত আমাদের দেশকে এফএটিএফের কালো তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আমরা আশঙ্কা করছি আরো একটি ‘পুলওয়ামা ঘটনার’। আর যথারীতি ভারত দায়ী করবে পাকিস্তানকে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেছেন, সীমান্তে ৫০০ সন্ত্রাসী অপেক্ষা করছে। ৯ লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে ৫০০ সন্ত্রাসী কী করবে? ইসলামিক টেররিজম পরিভাষা ব্যবহার করে ভারত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং কাশ্মিরিদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি করে চলেছে। কেন তারা শান্তিপ্রক্রিয়া বিঘিœত করছেন? কারণ, ভারতের হাতে বিকল্প নেই। কাশ্মিরে তাদের নিষ্ঠুরতার প্রতিক্রিয়ায় পুলওয়ামার মতো আরেকটি ঘটনা ঘটবে এবং তারা আমাদের দায়ী করে আবার পাকিস্তানে বোমা মারার চেষ্টা করবেন।

ইমরান খান প্রশ্ন করেন, ‘বিশ্বসম্প্রদায় ১.২ বিলিয়ন লোকের সমস্যা প্রশমনের জন্য কি কিছু করেছে? ন্যায়বিচার ও মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে? পারমাণবিক শক্তিধর দু’টি দেশ প্রচলিত যুদ্ধে মুখোমুখি হলে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। এর পরিণতি হবে মারাত্মক। একটি দেশ যে তার প্রতিবেশীর চেয়ে আয়তনে সাত গুণ ছোট, এমন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলো যে, সে আত্মসমর্পণ করবে নাকি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করবে? নিজেকে এই প্রশ্ন করি। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাবো।’

তিনি বলেন, পরমাণু যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছি না। এটি একটি আশঙ্কা। এটি জাতিসঙ্ঘের জন্য একটি পরীক্ষা। জাতিসঙ্ঘই কাশ্মিরের জনগণের নিজেদের পছন্দ বেছে নেয়ার অধিকারের গ্যারান্টি দিয়েছিল। পদক্ষেপ নেয়ার এটাই সঠিক সময়। ভারতকে অবশ্যই কাশ্মিরে ‘হিউম্যান কারফিউ’ তুলে নিতে বাধ্য করতে হবে, যা গত ৫৫ দিন ধরে চলমান রয়েছে। ১৩ হাজার কাশ্মিরি বালককে মুক্ত করতে হবে।’

ইমরান বিশ্ব ফোরামে কাশ্মিরের ইস্যুকে জোরালোভাবে তুলে ধরার লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছেন বলে প্রতীয়মান। তার বক্তব্য রাখার পর ভারতীয় প্রতিনিধির প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি স্পষ্ট। ভারতীয় প্রতিনিধি মোটাদাগে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘উসকানিমূলক ও অসত্য’ বলেছেন। কিন্তু যেসব সুনির্দিষ্ট কথা ইমরান বলেছেন, তা খণ্ডনের দিকে যাননি।

আলোচিত এই বক্তব্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যত অনেক কিছু অর্জন করতে পেরেছেন। কিন্তু কাশ্মিরকে দখলমুক্ত করা অথবা পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি যে হুমকি ভারতীয় নেতারা দিয়ে যাচ্ছেন, তা নিঃশেষ করার মতো কিছু হয়নি। মনে করা হচ্ছে, এ জন্য পাকিস্তানকে অনেক দূর যেতে হবে এবং এই যাত্রায় সাথে নিতে হবে মুসলিম বিশ্ব ও এর নেতৃত্বকে। গণতন্ত্রকামী ও অন্যান্য মিত্র দেশগুলোকেও সাথে নিতে হবে। এ জন্য ইমরান মধ্যপন্থী ও শক্তিধর কয়েকটি দেশের নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করেছেন। চেষ্টা করছেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যে বিরোধ ও সঙ্ঘাত চলছে আলোচনার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক সমাধান করার।

ইমরান জাতিসঙ্ঘে দেয়া ভাষণে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে যেভাবে অভিষিক্ত হচ্ছেন, সেটি তিনি নিজ দেশের নিরাপত্তা এবং কাশ্মিরিদের মুক্তির জন্য কাজে লাগাতে পারবেন। তেমনিভাবে দুনিয়ার ১২০ কোটি মুসলিমের মধ্যে আদর্শ ও চেতনাগত একটি বিশেষ বন্ধন তৈরি করতেও কাজে লাগাতে পারবেন। এটিই ইমরানের সাফল্যকে একটি পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে উম্মাহ মনে করে।

mrkmmb@gmail.com

You Might Also Like