আশা ভালোর জন্য, প্রস্তুতি খারাপের জন্য

হোপ ফর দ্য বেস্ট, প্রিপেয়ার ফর দ্য ওয়ার্স্ট। আমরা ভালো কিছুই আশা করব, কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে সবচেয়ে খারাপের জন্য। আশার কথাগুলো আগে বলে নিই।

আমরা চীনের কাছের দেশ। চীনের উহান থেকে করোনার উৎপত্তি। তা ইতালিকে বানাল মৃত্যুপুরী, স্পেন শয্যাশায়ী, নিউইয়র্কে ঘরে ঘরে কান্নার রোল। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি এখনো ইউরোপ–আমেরিকার মতো খারাপ নয় কেন?

ভারতের হায়দরাবাদের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজির (এআইজি) চেয়ারম্যান ও পদ্মভূষণপ্রাপ্ত জি পি নাগেশ্বর রেড্ডির একটা সাক্ষাৎকার প্রথম আলো অনলাইন প্রকাশ করেছে। তিনি বলেছেন, এ ভাইরাসকে জয় করা সম্ভব। তিনি মনে করেন, স্পেনে করোনাভাইরাসের যে প্রকারটা ছড়িয়েছে, ভারতে এসে তা খানিকটা চরিত্র বদলে ফেলেছে। সম্ভবত এই অঞ্চলের ভাইরাসটা একটু দুর্বল।

এর বাইরে আছে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার তত্ত্ব। এমআইটির একটা গবেষণা আছে, সম্ভবত করোনাভাইরাস শীতের দেশে বেশি ভয়ংকর। তবে এরই মধ্যে আরবদেশে, আফ্রিকায় এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে শীত-গরমের তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছে। আর নিউইয়র্ক আইটির এক গবেষণাপত্র বলছে, সম্ভবত সার্বজনীন বিসিজি বা যক্ষ্মার টিকা দেওয়া দেশগুলোতে করোনায় মৃত্যুর হার কম। বাংলাদেশে আমাদের সবারই এ টিকা দেওয়া আছে।

সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। জনগণকে ঘরে থাকতে বলেছে। মানুষ মানুষের পাশে এগিয়ে আসছে। বেসরকারি উদ্যোগে পিপিই বানানো হচ্ছে। বেসরকারি উদ্যোগে বড় হাসপাতাল নির্মাণের কথা শোনা যাচ্ছে।

খারাপের জন্য প্রস্তুত থাকুন

বলা হচ্ছে, একটা জনগোষ্ঠীর শতকরা ৭০ ভাগের যদি একবার করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটে যায়, তারা ইমিউন হয়ে যাবে, এরপর আর ভাইরাস সুবিধা করতে পারবে না।

ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩২ কোটি। ৭০ ভাগ লোককে আক্রান্ত হতে হবে এই ভাইরাসকে কাবু করতে। কমবেশি সংখ্যাটি ২২ কোটি। ২২ কোটির মধ্য ২ ভাগ মারা যাবে (আল্লাহ না করুন)। তাহলে মারা যাবে ৪৪ লাখ। এই মোট সংখ্যাটা এক বছরে হতে পারে, দুই বছরে হতে পারে।

এখন বাংলাদেশের জন্য হিসাবটা আপনি করে নিন।

নিউইয়র্ক মৃত্যুপুরী হয়ে গেছে। নিউইয়র্কের পরিস্থিতির এই দ্রুত অবনতি ঘটেছে চার সপ্তাহের মধ্যে। মার্চের ১ তারিখে নিউইয়র্ক স্টেটে করোনাবাহী ছিলেন একজন, ৮ মার্চ ১০৮ জন, ১৬ মার্চ আক্রান্ত ৯৫০ জন (মৃত্যু ৭)। ১ এপ্রিলে এসে আক্রান্ত ৮৩ হাজার ৭১২, মৃত্যু ১ হাজার ৯৪১।

আমাদের দেশে করোনাবাহী মানুষ এখানে-ওখানে আছেন। আমরা যেভাবে বাসে লঞ্চে ফেরিতে ট্রেনে গাদাগাদি করে চলাচল করেছি, যেভাবে ত্রাণসামগ্রী নেওয়ার জন্য গায়ে গা লাগিয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়েছি, অবশ্যই করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এর কুফলটা আমরা দেখতে পাব এক মাস পরে। এক মাসে নিউইয়র্কে বেড়েছে ৮০ হাজার গুণ। আমাদের দেশে যদি ৫০টাই পরীক্ষিত কেস হয়ে থাকে, এক মাস পর এটা হওয়ার শঙ্কা ৪০ হাজার। এটা জ্যামিতিক হারে বাড়লে পরের এক মাসে করোনাক্রান্ত লাখ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। এক লাখ আক্রান্ত হওয়া মানে ৩৩ হাজার এটা টের পাবেন না, নীরবে বহন করবেন। ৮০ হাজার বাড়িতেই সেরে উঠবেন। বাকি কুড়ি হাজারের হাসপাতাল লাগবে। ৩ হাজারের ভেন্টিলেটর আইসিইউ লাগবে। এই হিসাব এক লাখ আক্রান্ত ধরে। সংখ্যাটি যদি দুই লাখ হয়, তিন লাখ হয়? আমাদের সরকারি আইসিইউ বেড আছে ৪৩২, বেসরকারি ৭৩৭ (মার্চের ২২ পর্যন্ত)। সেসব বেডে অন্য রোগী আছেন।

আমরা এই মহামারি রোধ করতে পারব না। এখান থেকে ওখান থেকে মৃত্যুর খবর আসবে। তখন আমরা কী করব? আবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা নাকি পুরোপুরি লকডাউন করব? কী হবে আমাদের অতিদরিদ্রদের? অসুস্থতা, চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়া, অন্য রোগেরও চিকিৎসা না পাওয়া, প্রসূতি মায়েদের সেবা না পাওয়া, অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের ভবিতব্য?

তাহলে কী করব?

এক. কেউ ঘর থেকে বের হতে পারবে না, বের হলে একা বের হবে, তাকে বলতে পারতে হবে কোন জরুরি কাজে সে বের হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতেই হবে। করণীয়, ঘন ঘন সাবান–পানিতে হাত ধোয়া। বাইরে বেরুলে মাস্ক পরা।

দুই. ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করা। পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা, স্বচ্ছতা। যদি জানি আমি আক্রান্ত, তাহলে সাবধান হতে পারব। যদি জানি আক্রান্ত নই, তাহলেও সাবধান হয়ে চলব।

তিন. গরিব মানুষের বাড়িতে বাড়িতে খাবার পৌঁছে দিন। মোবাইলের মাধ্যমে তাদের ঘরে ঘরে টাকা পৌঁছে দিন (এতে দুর্নীতি কমবে)। তাদের ডেকে এনে দয়া করে জড়ো করবেন না। কেন্দ্রীয় ত্রাণ মনিটরিং এবং পরিচালনা সেল করুন। সব সাহায্য, অনুদান সেখানে জমা করুন। সমন্বয় করা দরকার। বস্তির সামনে সাহায্যের ট্রাক নিয়ে গেলে বস্তির মানুষ হাজারে হাজারে ছুটে আসবেই। লকডাউনের উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে।

তিন. ডাক্তার ও সেবাদানকারীদের রক্ষা রসদ দিন। তাঁরা নিরাপদ থাকলে বাকিরা সেবা পাবেন। শুধু যে করোনার সেবা লাগবে তা তো নয়, অন্য রোগেরও সেবা লাগবে, চিকিৎসা লাগবে।

চার. করোনাবাহী মানুষকে ভয় পাওয়া, ঘৃণা করা বন্ধ করতে হবে। আজকে আমরা অন্যকে দেখে পালাচ্ছি, কালকে আমার হলে আমি কী করব? দশ হাত দূরের হাসপাতালের বাতাস থেকে আমার দেহে করোনাভাইরাস আসবে না। কাজেই হাসপাতাল বানাতে দিন। দাফন করতে দিন।

সরকারের আশু, মধ্যবর্তী, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনগণকে বের না হতে বলেছে। এখন তা যেমন শিথিলভাবে চলছে সেভাবেই চলবে, নাকি পুরো লকডাউন করতে হবে? তা কত দিন? ভারত ২১ দিন করছে।

ডাক্তার নাগেশ্বর রেড্ডি ভারতের প্রেক্ষাপটে বলেছেন, ‘করোনা নিয়ে যে ভীতি ছড়িয়েছিল, এর পরিপ্রেক্ষিতে লকডাউন খুবই দরকার ছিল। কিন্তু দীর্ঘ লকডাউন বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে। এটি তিন সপ্তাহের বেশি হওয়া উচিত নয়।’

হাসপাতাল লাগবে। করোনা রোগীর জন্য জেলায় জেলায় আলাদা হাসাপাতাল, ওয়ার্ড, আইসিইউ লাগবে। আগামী এক বছর আমাদের এর সঙ্গেই বসবাস করতে হবে।

অর্থনীতির জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি করুন। স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি, আপৎকালীন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিন।

আসলে কী হবে, আমরা এক মাস পরে একটা ছবি পাব।

সবচেয়ে ভালো কী হতে পারে?

১. এই ভাইরাস আমাদের দেশে এসে নিজেকে বদলে কম ক্ষতিকর করেছে। গরমে আর্দ্রতায় সে আরও দুর্বল হবে। আমরা এ যাত্রা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাব।

২. আগামী ১০ দিন আমরা কঠোর লকডাউন, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং করব। সারা দেশের সব আক্রান্ত মানুষের দেহ থেকে ভাইরাসটা মরে যাবে। (এটা অসম্ভব। কারণ, আমরা কথা শুনি না। কিন্তু বেশির ভাগও যদি কথা শুনি, মহাবিস্তারটা পিছিয়ে দেওয়া যাবে।)

নাগরিকদের বলি, ঘরে থাকুন। ঘরে থাকাই দেশপ্রেম। মোবাইলের মাধ্যমে গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীকে টাকা পাঠান।

আসুন, আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। করোনাভাইরাসকে হারিয়ে দিই। সরকারের অনেক কিছু করার আছে। কিন্তু আমার করণীয় মাত্র একটা, নিজেকে ঘরে রাখা।

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

You Might Also Like