আল মাহমুদ ও তাঁর নিজস্ব কাব্যভুবন 

মুহম্মদ মতিউর রহমান

আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। অসংখ্য কবির ভিড়ে তিনি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সনাক্তযোগ্য একজন কবি হিসাবে আধুনিক বাংলা কবিতার সমৃদ্ধ ভুবনে নিজের আসন চিহ্নিত করে স্বকীয়তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাঁর কবিতায় আধুনিকতার সাথে সনাতন ঐতিহ্য ও গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশের এক স্বচ্ছন্দ সংমিশ্রণ ঘটেছে। যে কারণে তাঁর কবিতার আবেদন হয়েছে অনেকটা সর্বজনীন ও কালাতিক্রম্য।

আধুনিক বাংলা কাব্যের জনক হিসাবে পরিচিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-৭৩) সবদিক থেকেই বাংলা কাব্যের এক নতুন যুগের প্রবর্তন করেন। ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাবকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে তিনি আধুনকিতার প্রবর্তন করেন। কাব্যের আঙ্গিক, ভাষা-ছন্দ, আবেদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী কবিদের থেকে আলাদা। তাঁর কাব্যের ভুবন একান্তই তাঁর নিজস্ব। মাইকেলের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এক স্বতন্ত্র কাব্য-ভাষা, ভাব-বিষয়, ঐতিহ্যচেতনা, আবেদন ও ওজস্বিতা নিয়ে তাঁর এক নিজস্ব বর্ণাঢ্য কাব্য-ভুবন নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথের পর কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কাব্যে তাঁর নিজস্ব ধারা ও স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হলেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়ের জীবনকালে এবং তাঁদের অব্যবহিত পরে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলা কাব্যে আবির্ভূত হলেন জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), ‘পল্লী কবি’ হিসেবে খ্যাত জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৪), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪), তালিম হোসেন (১৯১৮-৯৯) প্রমুখ।

তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ঢং-এ কাব্যের সুষমামন্ডিত বর্ণাঢ্য ভুবন নির্মাণ করেছেন। তাঁদের কবিতার দূরাগত স্বপড়বময় উজ্জ্বল ভূবনে তাঁরা স্ব স্ব মহিমায় দীপ্ত, সমুজ্জ্বল। তাঁদের সমকালে আরো অনেকেই বাংলা কাব্যে তাঁদের নিজ নিজ প্রতিভার পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন এবং বাংলা কাব্যে নানা বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে প্রতিভাবান যেসব কবি বাংলা কাব্যের দিগন্তকে নানা বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্যতায় সুষমাম-িত করে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে বিশেষ উলেখযোগ্য হলেন- সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-৭৫), আব্দুল গণি হাজারী (১৯২১-৭৬), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আবুল হোসেন (১৯২২-), সানাউল হক (১৯২৪-৮৩), আবদুর রশীদ খান (১৯২৪-), আতাউর রহমান (১৯২৫-২০০১), আশরাফ সিদ্দিকী (১৯২৭-), আব্দুস সাত্তার (১৯২৭-২০০০), মাযহারুল ইসলাম (১৯২৮-৮৩), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৮), মোহাম্মদ মাহ্ফুজউলাহ (১৯৩৩-), ফজল শাহাবুদ্দিন (১৯৩৬-), আল মাহমুদ (১৯৩৬-), ওমর আলী (১৯৩৯-), শহীদ কাদরী (১৯৪২-) প্রমুখ। এঁদের মধ্যে আল মাহমুদ নিঃসন্দেহে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উলেখযোগ্য কবি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। হাজার বছরের বাংলা কাব্যের ইতিহাসে অসংখ্য কবির আগমন ঘটেছে, কিন্তু তাঁদের ক’জন অক্ষয়-অমর হয়ে আছেন কালের ইতিহাসে? কেবল মৌলিক প্রতিভার অধিকারী কবি-সত্তাই টিকে থাকে কালের উদ্দাম গতি ও ঝড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে আর তাঁদের প্রত্যেকেরই থাকে এক একটা স্বতন্ত্র পরিচয়, যা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় তাঁদের কাব্যে।  প্রত্যেক মৌলিক কবিরই একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। এ বৈশিষ্ট্য সব সময় এক রকম হয় না। কিন্তু যার যে রকম বৈশিষ্ট্যই থাক না কেন, প্রত্যেকের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগত স্বাতন্ত্র্যের কারণে আমরা সহজে তাঁকে চিহ্নিত করতে পারি। গোলাপ, বেলী, বকুল- প্রত্যেকেই তার নিজস্ব রং, গঠন ও গন্ধেই সুপরিচিত। প্রত্যেক কবিও তেমনি তাঁ র নিজস্ব ভাব, ভাষা, শিল্পনৈপুণ্য ও কাব্যিক আবেদনের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মহিমায় সমুজ্জল। আল মাহমুদ তাঁর নিজস্ব ভাষা-রীতি, শিল্প-নৈপুণ্য, উপমা-রূপকল্পের ব্যবহার ও বিষয়-ভাবনার দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছেন।

বাংলা কাব্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব ঊনিশ শতকেব মধ্য-পঞ্চাশে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মৌড়াইলের মোলাবাড়িতে ১৯৩৬ সনের ১১ জুলাই তাঁর জন্ম। পিতার নাম মীর আবদুর রব, মাতা রওশন আরা মীর। পিতামহ মীর আবদুল ওয়াহাব আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ভাষা জানতেন। মাতামহী বেগম হাসিনা বানু মীরের নিকট বিসমিলাহ খানির পর তিনি গ্রামের মসজিদের ইমামের নিকট ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এম. ই. স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ষষ্ঠ শেণ্র ী পর্যন্ত অধ্যয়নের পর জর্জ হিক্সথ হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। অতঃপর সীতাকুণ্ড হাইস্কুল ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। শেষোক্ত হাইস্কুলে দশম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সনে তিনি ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে পড়াশোনা সাঙ্গ করে আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করেন। ব্রাক্ষণবাড়িয়া ভাষা আন্দোলন কমিটির পক্ষ থেকে ঐ সময় একটি প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে তরুণ আল মাহমুদের চার লাইনের একটি কবিতা ছাপা হয়। আর তাতেই পুলিশের রোষাণলে পড়ে আত্মগোপন করেন। এ অবস্থায় তিনি কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গে গিয়েও আশ্রয় নেন। তারপর ঘুরে ফিরে ঢাকা শহরে এসে আশ্রয় নেন ১৯৫৪ সনে এবং কালক্রমে এটাই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী আস্তানা। ঢাকায় আসার আগেই স্কুল-জীবনে তিনি কবিতা লেখার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কবিতা লেখার কলা-কৌশল জানার জন্য তিনি দীর্ঘপথ অতিক্রম করে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার অন্য আরেকজন খ্যাতনামা এবং তাঁর অগ্রজ কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজউলাহর সান্নিধ্যে যান এবং বাংলা কবিতার ছন্দ সম্পর্কে তাঁর নিকট তালিম গহ্রণ করেন। আল মাহমুদ তাঁর আত্ম-জীবনীতে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় এসে তিনি ওমর আলী, শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ কবিদের সাথে পরিচিত হন এবং তাঁদের সানিধ্যে কবিতা চর্চায় মেতে উঠেন।

ঢাকায় এসে আল মাহমুদ ১৯৫৪ সনে প্রথমে ‘দৈনিক মিলাত’ পত্রিকায় প্র“ফরীডার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৫ সনে মিলাত ছেড়ে তিনি ‘কাফেলা’য় যোগ দেন সহ-সম্পাদক হিসাবে। সেখান থেকে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’এ প্র“ফ রীডার হিসাবে যোগ দেন ১৯৬৩ সনে। পরে সেখানে তিনি মফস্বল সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সনে সাময়িকভাবে ‘ইত্তেফাক’ বন্ধ হলে তিনি চট্রগ্রামে ‘বই ঘর’-এর প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। এ সময়ই অর্থাৎ ১৯৬৮ সনের সেপ্টে¤র^ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে তাঁর বিখ্যাত ‘সোনালী কাবিনে’র সনেটগুলো রচিত হয়। অতঃপর দৈনিক ইত্তেফাক পুনরায় চালু হলে তিনি তাতে সহ-সম্পাদক হিসাবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের ৮নং থিয়েটার রোডে প্রতিরক্ষা বিভাগের স্টাফ অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি গ্রুপ ঢাকা¯ ’ র‌্যাঙ্কিং স্ট্রীট¯ ’ ‘দৈনিক সংগ্রাম’ অফিস দখল করে ‘দৈনিক গণকন্ঠ’ প্রকাশ করলে আল মাহমুদ তার সম্পাদক নিযুক্ত হন। সরকার-বিরোধী র‌্যাডিক্যাল পত্রিকা হিসাবে গণকন্ঠ সরকারের রোষাণলে পতিত হয় এবং আল মাহমুদ কারারুদ্ধ হন। এর তিন দিন পর গণকন্ঠও বন্ধ হয়ে যায়। দশ মাস জেলে থাকার পর তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সনে নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীতে সহকারী পরিচালক নিযুক্ত করেন। ১৮ বছর চাকরি করার পর তিনি ১৯৯৩ সনের ১০ জুলাই শিল্পকলা একাডেমীর গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি ‘দৈনিক সংগ্রামে’ সহকারী সম্পাদক হিসাবে কয়েক বছর কাজ করেন।

ইতঃমধ্যে চট্রগ্রা ম থেকে ‘দৈনিক কর্ণফুলি’ প্রকাশিত হলে সম্পাদক হিসাবে সেখানেও তাঁর নামে মুদ্রিত হতে থাকে। পরবর্তীতে বিভিনড়ব পত্রিকার লেখক ও কলামিস্ট হিসাবে তিনি কাজ করেন। কবিতা লেখা ও সাহিত্য-চর্চায় তিনি তখনো ছিলেন। সমকালীন বাংলা কাব্যে তিনি অন্যতম প্রধান শক্তিমান কবি হিসাবে পরিচিত। তবে কবি হিসাবে সমধিক পরিচিত হলেও গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ সাহিত্যেও তাঁর উলেখযোগ্য অবদান রয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আল মাহমুদ এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন।  মধুসূদন আধুনিক বাংলা কাব্যের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান কবি হলেও রবীন্দ্রনাথ আধুনিক তথা সমগ্র বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। রবীন্দ্র-যুগে রবীন্দ্র-প্রভাব এত ব্যাপক ও সর্বব্যাপী ছিল যে, সেটা অনেকটা একঘেঁয়েমীর মতো মনে হয়। নজরুল এ একঘেঁয়েমীর হাত থেকে মুক্তি দিয়ে বাংলা কাব্যে নতুন প্রাণ-প্রবাহ সৃষ্টি করেন। এরপর তিরিশের কবিরা বাংলা কাব্যে আরেকটি নতুন মাত্রা যোগ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিরোধী শান্তি-প্রত্যাশী চেতনার বিস্তার ঘটে। তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি জীবনান্দ দাশসহ তিরিশের অনেক কবিই তখন যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তি-প্রত্যাশী, মানবতাবাদী কবিতা চর্চায় ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ তখন পরাধীন, দ্বিতীয় যুদ্ধের পর পঞ্চাশের (বাংলা ১৩৫০, ইংরাজি ১৯৪৩ সন) মন্বস্তরে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, স্বাধীনতা আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ইংরাজ ও হিন্দুদের দ্বিমুখী শোষণ-নির্যাতনে অতিষ্ঠ মুসলমানদের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ-বিরোধী, শান্তিবাদী মনোভাবের কোন স্থান ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে ফররুখ আহমদের আবির্ভাব। নিরন্ন-বুভুক্ষ, স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তৎকালীন পরাধীন ভারতের মুসলমানদের মধ্যে যে স্বপ্নময় আবেগ সৃষ্টি করে ফররুখ আহমদের কাব্যে সে আবেগ রোমান্টিক কাব্য-ভাষা খুঁজে পায়। ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান সৃষ্টির নেতাদের ডিগবাজি, প্রতারণা ও মুনাফিকীর কারণে ফররুখ আহমদসহ অনেকেরই সে লালিত স্বপেড়বর প্রাসাদ গুঁড়িয়ে যাবার উপμম হয়। নেতারা যে আদর্শের কথা বলে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করেছিলেন, পাকিস্তান সৃি ষ্টর পর তাঁরা বেমালুম সেটা ভুলে যান। ফলে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। এ হতাশা μমান্বয়ে আরো বৃদ্ধি পায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি নানারূপ বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে। এ ধরনের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে কবি আল মাহমুদের কাব্য-ক্ষেত্রে আবির্ভা ব। পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর প্রথম কাব্য ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৭০ (১৯৬৩) সনে। বাংলা সাহিত্যের বিভিনড়ব শাখায় যেমন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও জীবনী ইত্যাদি সাহিত্যের নানা আঙ্গিকে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রšের’ একটি তালিকা প্রদত্ত হলোঃ

আল মাহমুদের বেশ কিছু সংখ্যক কবিতা বিদেশী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এর একটি তালিকা নিন্মরূপঃ

Selected Poems of Al Mahmud (Translated by Kabir Chowdhury, 1981), Poems from Bangladesh:

Ed: Pritish Nandy, Lyebrid press, London Voice of Modern Asia: Ed. Dorothy Blair Shimer, a Mentor Book, New York, 1973; Bharatiya Janpith, Delhi-1973; CBET BOZROJ, an anthology of poems from Bangladesh, Moscow 1973, Sherthaye Aj Bangladesh: an anthology of poems from Bangladesh-Tehran, 1973, Poems of Bangladesh: Ed: Pritendra Mukharjee, Paris 1974:

GANGESDELTA: Ed. Lother Lutza and Aloker Anjan Dasgupta, Horst Erdman Verlaye-1994: La

POESIE CONTEMPO RAINE DU BANGLADESH: ALLANCE FRANCAISE, DACCA 1992;

THEIS SAME SKY: A Collection of Poems from around the world. MAXWELL MAC MILLAN INTERNATIONAL, New York, 1992, Poetic Imagination of Al Mahmud: Beyond the Blue Beneath the Bliss, Transleted by Mahbubul Alam Akhond (2000), ইত্যাদি।  প্রত্যেক মানুষেরই একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী থাকে। সৃষ্টিশীল প্রতিভার ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি প্রযোজ্য। তাঁরা তাঁদের স্ব-স্ব জবনীদৃষ্টি দ্বারা আমাদের নিকট পরিচিত। অনেক সময় ভাল লাগা, মন্দ লাগার মাপকাঠিও তৈরি হয় এর ভিত্তিতে। নিজস্ব বর্ণ-সুষমা, সুরভি-সৌকর্যে যেমন ফুলের পরিচয়, কবির পরিচয়ও তেমনি তাঁর কাব্য-কর্মের মাধ্যমে। আর এ পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হলো তাঁর রচিত কাব্যে প্রতিফলিত বিশা¦ স, বিষয়-বৈভব, ভাবৈশ্বর্য, বাক-বিন্যাস, কলা-নৈপুণ্য, ছন্দ, প্রতীক, উপমা, রূপক ইত্যাদির ব্যবহারে। বিশ¦ি বখ্যাত অমর কবি হোমার, মিল্টন, হাফিজ, রুমী, জামী, ফেরদৌসী, শেখ সাদী,

ইকবাল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ফররুখ এঁরা সকলেই তাঁদের স্বকীয় জীবনদৃষ্টির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁদের

কাব্যে। এ বিশা¦ স ও আত্মপ্রত্যয় ব্যতীত বলিষ্ঠ উজ্জল¡ কাব্য-কবিতা রচনা করা অস¤ব¢ । বিশ্বাসের দীপ্তি প্রত্যেক কবির

কাব্য-ভুবনে চন্দ্রালোকের উজ্জল¡ কিরণ-প্রভা বিকিরণ করে। আল মাহমুদও বিশা¦ সের বৃত্তে আবর্তিত। তবে তাঁর বিশা¦ স কোন একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে স্থিত থাকেনি, নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে μমান্বয়ে এক স্থায়ী, উজ্জ্বল রূপ লাভ করেছে।  প্রথম জীবনে আল মাহমুদ ছিলেন অনেকটা সংশয়বাদী, বামপন্থী, মার্কসীয় চিন্তা-চেতনার ধারক। ধীরে ধীরে তাঁর বিশা¦ সের বলয়ে পরিবর্তন ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয়লাভকারী মুক্তিযোদ্ধা কবি। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরে তৎকালীন সরকারের বিরোধিতার কারণে কারারুদ্ধ হন। এ কারাবাসকালেই তাঁর জীবনের সর্বাধিক

গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সংঘটিত হয়। তাঁর ভাষায় ঃ

“আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগতরহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ এবং পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কোরানে এসে উপনীত হয়েছি।” (আল মাহমুদঃ কবিতার জন্য বহুদূর, পৃ. ৩২-৩৩)।

এরপর কবি আরো স্পষ্ট ভাষায় তাঁর বিশা¦ স ও প্রত্যয়ের কথা উচ্চারণ করেনঃ

“…আমি ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহলোকেই আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি একটি পারমাণবিক বিশ¦ি বনাশ যদি ঘটেই যায়, আর দৈবμমে মানবজাতির যদি কিছু অবশেষও চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট

থাকে তবে ইসলামই হবে তাদের একমাত্র আচরণীয় ধর্ম। এই ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্যই আমার কবিস্বভাবকে আমি উৎসগর্ করেছি। … আলাহ প্রদত্ত কোন নিয়মনীতিই কেবল মানবজাতিকে শান্তি ও সম্যের মধ্যে পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিতে পারে। আমার ধারণা পবিত্র কোরানেই সেই নীতিমালা সুরক্ষিত হয়েছে। এই হলো আমার বিশা¦ স। আমি এ ধারণারই

একজন অতি নগণ্য কবি।” (পূর্বোক্ত, পৃ.৩৩)।

কবি অন্যত্র বলেনঃ “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি জীবনের একটি অল্যেকিক কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়ম হিসেবে। মার্কসবাদ স¤^ে ন্ধ রীতশ্রদ্ধ হয়ে। (আল মাহমুদঃ কবির আত্মবিশ্বাস, পৃ ১১)।

আল মাহমুদ দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে আরো বলেনঃ “নাস্তিকতার ওপর মানবতা দাঁড়াতে পারে না, পারবে না।” (ঐ, পৃ১৮)।  আল মাহমুদ কোন গতানুগতিক মুসলমান নন। আধুনিক বিভিনড়ব মতবাদ, প্রচলিত প্রধান ধর্মসমূহ ইত্যাদি গভীর অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করে ঐশী গ্রন্থ আল কুরআনের সাথে তা মিলিয়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব সহজেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। তাই প্রচলিত ধারণা ও অন্ধবিশা¦ সের বশবর্তী হয়ে নয়, গভীর প্রত্যয়ের সাথে মুক্ত মন ও উদার যুি ক্তপূর্ণ মানসিকতা থেকেই তিনি ইসলামকে একমাত্র সত্য ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তাই তিনি অবিচল বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারেন ঃ

উদিত নক্ষত্র আমি। শূন্যতার বিরুদ্ধগামী, পূর্ণ করে তুলেছি বিস্তার।

আমি আলো, দীপ্ত করে তুলেছি পৃথিবী।

আমি তাল মাত্রা বাদ্যযন্ত্র ছাপিয়ে ওঠা আত্মার ক্বেরাত।

আরম্ভ ও অস্তিমের মাঝখানে স্বপড়ব দেখি সূর্যের সিজদারত নিঃশেষিত আগুনের বিনীত গোলক।

নবী ইব্রাহিমের মত অস্তগামীদের থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।

আমিও জেনে গেছি কে তুমি কখনো অস্ত যাও না।  কে তুমি চির বিরাজমান। তোমাকে সালাম। তোমার প্রতি মাথা ঝুকিকয়ে দিয়েছি। এই আমার রুকু, এই আমার সেজদা।

(হে আমার আরম্ভ ও শেষঃ দোয়েল ও কবিতা)

এখানে কবির বিশ্বাস ও প্রত্যয়দীপ্ত আত্মসমর্পিত চিত্তের গভীর আকুতি নিঃসংশয় প্রার্থনার মত অভিব্যক্ত হয়েছে। কবির এ বিশা¦ স ও প্রত্যয় তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, অন্তরের একান্ত গভীর উপলব্ধি থেকে সঞ্জাত। অতএব, ধরে নেয়া যায় তা নিখাদ ও অকৃত্রিম। কবির বিশা¦ সের সাথে বিষয়, বিষয়ের সাথে ঐতিহ্য-চেতনা ও বিষয়-বৈভবের দিক থেকে তাঁর পূর্বসূরী নজরুল-ফররুখের সাথে ঘনিষ্ঠ অন্বয় থাকলেও কবি-কল্পনা ও প্রকাশভঙ্গীর দিক থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, ভিনড়ব স্বাদ ও মেজাজের। এ বৈশিষ্ট্যের গুণেই আল মাহমুদকে সহজে চেনা যায়। ঐতিহ্য ধারণ করে ঐতিহ্যের ছড়ে নতুন ঝংকার সৃষ্টি করার মধ্যেই মৌলিকতার প্রকাশ। আল মাহমুদের মধ্যে সে মৌলিকতা সুস্পষ্ট।

আল মাহমুদের বিশ্বাস, ঐতিহ্যবোধ ও মৌলিকত্ব তাঁর জীবন-বাস্তবতার সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অনেক চড়াই-

উৎড়াই পেরিয়ে তিনি যে বিশা¦ সের পটভূমিতে এসে স্থিত হয়েছেন, তা মূলত তাঁর জীবন-স্বভাবের সাথে এবং তাঁর কবিতার সাথে অবিমিশ ্র হয়ে গেছে। তাই তিনি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারেনঃ “এই জন্য আমাকে গাল দেয়া হয়। বলা হয়, আমি হলাম মৌলবাদী। যে যাই বলুক না কেন সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমার একটা আদর্শ  আছে। অনেকের তো এ জিনিসটি নেই। আমি মুসলমান। কাজেই আমার ধর্ম, আমার বিশা¦ স আমার সাহিত্যে আসবেই। এটাই তো আমি লিখবো। আমি যেটা জানি না সেটা কেনো লিখবো?” (সাহিত্যে ত্রৈমাসিক ‘চাঁড়–লিয়া’ ওমর বিশ্বাস সম্পাদিত, আল মাহমুদ সংখ্যা, ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, জলু াই-আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃ.১১৮)

আল মাহমুদ রোমান্টিক কবি। রোমান্টিক কবি-স্বভাবের বৈশিষ্ট্য হলো ঐন্দ্রজালিক কবি-কল্পনায় অবস্তুগত সৌন্দর্য, রূপ, সুষমা ও আনন্দের অনুধ্যান করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোন রোমান্টিক কবিই ইন্দ্রিয়ানুভূতির উর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ পরাবাস্তবতার উপর তাদের কল্পনার বিস্তার ঘটাতে পারে না। তারা একটা অবল¤ন^ খোঁজেন। কখনো এ অবল¤ন^ হয় নারী, কখনো ফুল, পাখি, গাছ-বৃক্ষ-লতা, অনন্ত নিঃসীম প্রকৃতি অথবা একত্রে এসব কিছুই। তবে তাদের কল্পনা ব¯ু—-গত অবল¤^ে নর মধ্যে কখনো সীমাবদ্ধ থাকে না। বিন্দু থেকে সিন্ধু, বস্তু থেকে অবস্তুগত, ইন্দ্রিয় থেকে অতিন্দ্রীয়লোকে ধাবিত হয়, সীমাকে ছাড়িয়ে অসীমের মধ্যে ঘটে তার অনন্ত বিস্তার। পৃথিবীর শেষ্ঠ্র রোমান্টিক কবি শেলৗ, কীটস্, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সকলের মধ্যেই রোমান্টিকতার এ প্রাণধর্ম বিদ্যমান। প্রথমোক্ত তিন ইংরাজ কবি প্রধানত প্রকৃতির কবি। প্রকৃতির রূপ- সৌন্দর্যের মধ্যেই তাঁদের কবি-কল্পনা প্রায়শ স্ফূর্তি লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথও প্রকৃতির কবি। তবে প্রথম জীবনে নারী, বিশেষত নারীর দেহগত সৌন্দর্য পরবর্তীতে দেহাতীত সৌন্দর্যের রূপ লাভ করেছে এবং আরো পরে তা অধ্যাত্ম্য সৌন্দর্যের অসীমতায় বিলীন হয়েছে। আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই। তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য হলো নারী ও প্রকৃতি। নারীর দেহগত রূপ- সৌন্দর্যের উপলব্ধি কবি-কল্পনাকে এমন বিহ্বল করেছে যে, তিনি প্রায়ই শীলতা ও সুরুচির সীমা অতিμম করে গেছেন। দেহজ কামনা-বাসনার অভিব্যক্তি কবি-কল্পনাকে বহুলাংশে ¤ান করে দিয়েছে। ইন্দ্রিয়কে অতিμম করে অতিন্দ্রীয়লোকে তাঁর আর অগ্রগতি ঘটেনি। বস্তুকে অতিμম করে দেহাতীত অবস্তুগত কল্পনার দ্বৈরথের স্পশর্  তিনি পাননি। দেহজ কামনা-বাসনা এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতি তাঁর কবি-কল্পনাকে মাটির সংলগড়ব করে রেখেছে। যেমনÑ

১. শঙ্খমাজা স্তন দু’টি মনে হবে শ্বেতপদ্ম কলি,

(সিম্ফনি : লোক-লোকান্তর)

২. স্তন দুটি দুধের ভারে ফলের আবেগে ঝুলে আছে।

(অন্তরভেদী অবলোকন : সোনালি কাবিন)

৩. চাষীর বিষয় নারী

উঠোনে ধানের কাছে নূয়ে থাকা

পূর্ণস্তনী ঘর্মাক্ত যুবতী।

(কবির বিষয় : অদৃষ্টবাদীদের রানড়বাবানড়বা)  ৪. সামান্য চৌকাঠ শুধু তুচ্ছ করে এসো এই ঘরে  বাসনার স্থিরমুদ্রা স্পর্শ যদি করে নাভিমূল;

কী হবে শরীর ঢেকে, জানালার পাট বন্ধ করে?

(বধির টঙ্গার : কালের কলস)

৫. তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী

ক্ষেতের আড়ালে এসে নগড়ব কর যৌবন জরদ,

(সনেট-১০ : সোনালী কাবিন)

৬. গাছের আড়াল থেকে ইশারায় ডাকছে। ফলটার হলুদ কষ গড়িয়ে পড়ছে তার নগড়ব উরু বেয়ে।

(চিঠি : একচক্ষু হরিণ)

৭. রাতের নদীতে ভাসা পাউড়ী পাখির ছতরে, শিষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাঙ্গে ছলছল  আমার চুম্বন রাশি μমাগত তোমার গতরে

ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জার আগল

(সনেট-১৪ : সোনালী কাবিন)

আল মাহমুদের প্রথম দিককার কাব্য-কবিতায় এরূপ দেহজ কামনা-বাসনা ও নারীর নগড়ব দেহের উত্তেজক বর্ণনা বহু রয়েছে। তবে পরিণত বয়সে আল মাহমুদ অনেকটা মার্জিত হয়ে এসেছেন। নারী, নদী, প্রকৃতির প্রসঙ্গ এখনো আছে, কিন্তু তাঁর উপস্থাপনা ও রূপকল্প সম্পূর্ণ ভিনড়ব ধরনের। বিশেষ করে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আল মাহমুদের চিন্তাচেতনার জগতে যে পরিবর্তন ঘটে, তখন থেকে তাঁর কাব্যের উপজীব্য, রূপকল্প, চিত্রকল্প, উপমা ও প্রতীকের ক্ষেত্রেও উলেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। যেমনÑ

… ঝড়ো বাতাসের

ঝাপটা থেকে তোমার উড়ন্ত চুলের গোছাকে  ফিরিয়ে আনো মুঠোর মধ্যে। বেণীতে বাঁধো

অবাধ্য অলোকদাম।

কেন জিনেরা তোমার কেশ নিয়ে খেলা করবে?

আজ সমুদ্রের দিকে তাকাও। দ্যাখো জোয়ারে ফুলে উঠেছে

দরিয়া। চাঁদের গুঁড়িয়ে যাওয়া প্রতিবিম্বকে নিয়ে

টাকার মতো লোফালুফি করছে উন্মত্ত তরঙ্গের মাতাল হাত।

তোমার আব্রু ঠিক করে নাও। এইতো ছতর ঢাকার সময়। কোথায় হারিয়ে এসেছো তোমার বুকের  সেপটিপিন?

আজ ইবলিসকে তোমার ইজ্জত শুঁকতে দিও না।

(নীল মসজিদের ইমাম : বখতিয়ারের ঘোড়া)

এখানেও নারী আছে। কিন্তু এ নারী নগড়ব দেহের আদিম লালসার প্রতীক নয়, স¤ম£ শীলা মহিয়সী নারী। এ নারী কামোত্তজনা সৃষ্টি করে না, স¤ম£ জাগায়। নারীর তিন শাশ্বত রূপ : বধূ, মাতা, জায়া। তিন রূপই যেমন প্রেম-প্রীতিভালোবাসার প্রতীক আবার তেমনি চিরন্তন কল্যাণ ও শাস্তি-সুখের শাশত¦ প্রতীক। আল মাহমুদ প্রথম জীবনে এবং যৌবনে নারীকে শুধূই বধূ, প্রেমময়ী কামসঙ্গীরূপে দেখেছেন। এখনো তাই দেখেন। তবে সে প্রেমময়ী বিবসনা রমণী এখন খানিকটা বসনাবৃত মাধুর্যময়ী কল্যাণব্রতী রমণীর রূপ লাভ করেছে। পরিণত আল মাহমুদের রোমান্টিক কবি-দৃষ্টিতে নারী অনেকটা মাতা-জায়ার রূপেও আবির্ভূত হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে তাঁর সুপরিণতির লক্ষণ। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় নারী ও প্রকৃতিকে উপজীব্য করার বিষয়ে লিখেছেনঃ “আমার কবিতার প্রধান বিষয় হলো নারী। আমি এক সময় ভাবতাম একজন কবি-পুরুষের কাছে নারীর চেয়ে সুন্দর আর কী আছে? না, কিছু নেই। পৃথিবীর যত জাতির কবিতায় যত উপমা আছে আমি আমার সাধ্যমত পরীক্ষা করে দেখেছি সবই নারীর সাথে তুলনা করেই দয়িতার দেহের উপমা দিতে কবিরা পৃথিবী নামক এই গ্রহকে চষে ফেলেছেন। এমন নদী, পর্বত বা প্রান্তর নেই যার সাথে কবিতা তাদের প্রেমিকার দেহসৌন্দর্যের তুলনা দেননি।

আমার কবিতার আরেক প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতি। আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই যা আমাকে জগৎ রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। এক ঝাঁক পাখি যখন গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ায়, মাটি ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসে পতঙ্গ ও পিঁপড়ের সারি, আর মৌমাছিরা ফুল থেকে ফুলে মধু শুষে ফিরতে থাকে

আমি তখন শুধু এই আয়োজনকে সুন্দরই বলি না বরং অন্তরালবর্তী এক গভীর প্রেমময় রমণ ও প্রজনন μিয়ার নিঃশব্দ

উত্তেজনা দেখে পুলকে শিহরিত হই।” (কবিতার জন্য বহু দূর, পৃ.৩২-৩৩)

আল মাহমুদ তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান উপজীব্য প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেনঃ “আমি একদা আমার কৈশোরে প্রকৃতির মধ্যে নিজের তন্ময় মুগ্ধতাকে আবিস্কার করে মত্ত হয়ে থাকতাম। ট্রেনে কোথাও যেতে একটা পাহাড় বা বেগবতী নদীর দিকে তাকিয়ে এমন পুলক অনুভব করতাম যে, কি আল বলবো! মনে হতো প্রকৃতির দিগন্ত প্রসারিত বিস্তারের মধ্যেই বঝি জগৎ রহস্যের চাবিখানি আমার জন্য কেউ লুকিয়ে রেখেছে। একদিন আমি তা খুঁজে পাবো। কিন্তু ভ্রমরের মতো প্রতিটি ফুলের প্রস্ফুটনে আমার অনুসন্ধানী মন ঘুরে বেড়িয়েও জগৎ রহস্যের কোন কিনারা দেখতে পায়নি। বরং রহস্যের জাল আর বৃদ্ধি পেয়েছে। … এই রহস্যের কথা আমি আমার কিশোর বয়সের কবিতায় খানিকটা উচ্চারণ করেছি। এই

উচ্চারণের মধ্যে শুধু মুগ্ধতাই আছে।”(দিন যাপন, পৃ.১০) কবির বক্তব্য থেকে তাঁর কবিতার বিষয়ব¯ ‘ সম্পর্কে ধারণা করা চলে। তবে সময় অতিμমের সাথে সাথে কবির অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির দিগন্ত প্রসারিত হয়েছে। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুরও ব্যাপ্তি ঘটেছে, বিশেষ করে তাঁর নতুন উপলব্ধি তথা ইসলাম সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন তা তাঁর একাত্তুরের স্বাধীনতা-পরবর্তী কবিতায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। অবশ্য নারী ও নিসর্গ এ পর্যায়েও তাঁর অন্যতম প্রধান উপজীব্য।

তবে তার উপস্থাপনা ও প্রকাশভঙ্গী হয়েছে ভিনড়ব- অনেকটা শীল ও রুচিশীল। এটা তাঁর সুপরিণতিরই লক্ষণ।  আল মাহমুদের একটি উলেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য হলো তাঁর কবিতার শব্দ চয়ন ও তার কুশলী বিন্যাস। অনেকের ধারণা, কবিতা মূলত শব্দের শিল্প। শব্দ ব্যবহারে সজ্ঞানতা ও তার সপু ্রযুক্ত কুশলী ব্যবহারের উপর কবিতার সাফল্য-সার্থকতা অনেকখানি নির্ভরশীল। কবিতায় অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহারের কোনই অবকাশ নেই। সুনির্বাচিত শব্দের যথার্থ অর্থবহ প্রয়োগেই সার্থক কবিতার সৃি ষ্ট হয়। এজন্য মহানবী (স.) বলেনঃ “আশ্শেয়রু বিমানঝিনাতিল কালাম, হুসনুহ কালামে ওয়া ক্ববিহু হুকা কাবিহিল কালাম।” অর্থাৎ কবিতা মূলত কথা বা শব্দ- তার ভালটা ভাল এবং তার খারাপটা খারাপ বা পরিত্যাজ্য। (মিশকাত শরীফ)। মহানবী (স.) এ প্রসঙ্গে আরো বলেন ঃ “কিছু কিছু কথা বা শব্দ এমন যা যাদুর মত।” (আওন আল বারী, ৬/৯৬)। এ কথার অর্থ হলো, সুচয়িত অর্থপূর্ণ শব্দের কুশলী বিন্যাস ভাব, কল্পনা, ছন্দ ও আবেগের সাথে যখন সুবিন্যাস্ত হয় তখনি তা কবিতার মোহনীয় জাদুতে পরিণত হয়।  শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আল মাহমুদের একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। এক্ষেত্রে তিনি যত না নজরুল-ফররুখের অনুসারী তার চেয়ে জসীমউদ্দীন অনেক কাছাকাছি। আল মাহমুদ তাঁর কবিতার শব্দ সন্ধানে অভিধান খুঁজে পেরেশান হন না, অতিরিক্ত পাণ্ডিত্য দেখাবার জন্য গ্রীক বা হিন্দু মিথোলিজি থেকে উপমা খোঁজেন না, আমাদের একান্ত পরিচিত, গ্রাম-বাংলার মুসলিম সমাজে প্রচলিত ও সহজবোধ্য শব্দের কুশলী ব্যবহারে তাঁর কবি-কল্পনার বর্ণাঢ্য রূপায়ন ঘটান। বিদেশী, অপরিচিত মিথোলোজি থেকে দুর্বোধ্য উপমা সংগ্রহ না করে তিনি গ্রাম-বাংলার সাধারণ নারী-পুরুষ, তাদের বিচিত্র জীবন, নিসর্গের দৃশ্যপট থেকে সহজ ও সাধারণ উপমা-রূপক-চিত্রকল্প সংগ্রহ করে তাঁর কবিতার বাণী-রূপ নির্মাণ করেন। আল মাহমুদের এ সারল্য ও সহজতা তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ফলে তাঁর কাব্যে কোন কৃত্রিমতা নেই, দুর্বোধ্যতা নেই। আবহমান বাংলার

সোঁদা মাটির গন্ধ তাঁর কাব্যের শরীরে ছড়ানো-ছিটানো। যেমনÑ

কে জানে ফিরলো কেনো, তাকে দেখে কিষাণেরা অবাক সবাই।

তাড়াতাড়ি নিড়ানির স্তূপাকার জঞ্জাল সরিয়ে

শস্যের শিল্পীরা এসে আলের উপর কড়া তামাক সাজালো।

এক গাদা বিচালি বিছিয়ে দিতে দিতে

কে যেনো ডাকলো তাকে; সসেড়বহে বললো, বসে যাও, লজ্জার কি আছে বাপু, তুমি তো গাঁয়েরই ছেলে বটে,

আমাদেরই লোক তুমি। তোমার বাপের

মারফতির টান শুনে বাতাস বেহুঁশ হয়ে যেতো। পুরনো সে কথা উঠলে এখনো দহলিজে সমস্ত গাঁয়ের লোক নরম নীরব হয়ে শোনে।

কত সহজ অনাড়ম্বর আটপৌঢ়ে ভাষা! অথচ কত সুন্দর কাব্যময় চিত্রকল্প। এ অনাড়ম্বর শব্দ ব্যবহারে মুনশীয়ানা ও চিত্রকল্প ব্যবহারের কৌশল তাঁর একান্ত নিজস্ব। এ রকম আরো দু’একটি উদাহরণ:

গ্রামীণ ব্যাংকের চালে উড়ে এসে বসেছে হুতুম

রৌদ্রঝরা দিন শেষে ধেয়ে আসে মরুর রজনী, চোর ও শেয়াল ছাড়া আর সবি নিঃসাড় নিঝুম সিঁদেল ইঁদুর খোঁজে স্বাবল¤ী^ বিধবার ননী।  পেঁচা তা লক্ষèীর পাখি চোরের ওপরে বাটপার

ইঁদুরের রক্ত চেটে পূজো পায় কুশীদজীবীর, গ্রামীণ ব্যাংকের চালে চমৎকার ইঁদুর আহার  কিষাণীর শূন্য ভাঁড়ে এক ফোঁটা পুঁজির শিশির।

(খরা সনেট গুচ্ছ-৪, দোয়েল ও দয়িতা) অথবা, কখন যে কোন মেয়ে বলেছিল হেসে: নাবিক তোমার হৃদয় আমাকে দাও,  জলদস্যুর জাহাজে যেও না ভেসে  নুন ভরা দেহে আমাকে জড়িয়ে নাও।  জল ছেড়ে এসো প্রবালেই ঘর বাঁধি  মাটির গন্ধ একবার ভালবেসে  জল ছেড়ে এসো মাটিতেই নীড় বাঁধি  মুক্তো কুড়াতে যেয়োনা সুদূরে ভেসে।

(সমদু ্র-বিষাদ/ লোক লোকান্তর)

আরো একটি উদাহরণÑ

যদি যান, কাউতলী রেলব্রীজ পেরুলেই দেখবেন

মানুষের সাধ্যমত

ঘরবাড়ী।

চাষা হাল বলদের গন্ধে থমথমে হাওয়া।  কিষাণের ললাট লেখার মতো নদী, সবুজে বিস্তীর্ণ দুঃখের সাম্রাজ্য।  (রাস্তাঃ লোক লোকান্তর)

শব্দ ব্যবহারে অনায়াস-সাধ্য সহজ নৈপুণ্য দেখাবার সাথে সাথে উপমা, রূপক ব্যবহারেও আল মাহমুদ বিরল মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। এক্ষেত্রেও তাঁর কবি-কল্পনার স্বাতন্ত্র্য ও সহজতা সকলকে বিমুগ্ধ করে, কবি মৌলিকত্বকে করে তোলে সুস্পষ্ট। যেমনÑ

মাটিতে মোরব্বার মত ছিদ্র করে ভরে তোলে নিজেদেরই কবরের ঢিবি।

(হে আমার অক্লান্ত বিচরণশীল ঊরতের প্রশংসায় ফুল তোলা বালিশ)।

(দৈত্যের বদলে এক পাল তোলা আত্মাঃ দোয়েল ও দয়িতা)  পাতাল রেলের যান্ত্রিক অজগরের উদরে তুর্কী রাতার মশলদার রানের মত  হজম হতে হতে যখন একটু দুলনিতে দুলছি।  (লন্ডনের গল্পঃ দোয়েল ও দয়িতা)

পিয়ালার মতো দুটি বক্ষপদ্মে উড়ে গেল দৃষ্টি ভ্রমর।

(অসুখে একজনঃ কালের কলস)

তুমি আমার অসুখ ঘরে বাসক পাতা

অসুস্থতার গন্ধমোছা ঘরের দাওয়া

তুমি আমার বর্ষাজলের সিক্ত ছাতা

উষ্ণ কোন গ্রীষ্মদিনের ঠাণ্ডা হাওয়া।

(বেহায়া সুরঃ কালের কলস)

তবে কি প্রাথর্ন া করবো? না, মৃত্যু তো চেঙ্গিসের

অশ্বের মত দ্রুতগামী, বধির।  (অন্ত^রভেদী অবলোকনঃ সোনালী কাবিন)

আর আমার চোখ ছিল গাসে ভিজানো

ইছবগুলের দানার মতো জলভরা।

(আমার চোখের তলদেশে/ সোনালী কাবিন)

এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। আমাদের পরিচিত পরিবেশ থেকে শব্দ, রূপক, উপমা, চিত্রকল্প সংগ্রহ করে আল মাহমুদ তাঁর সুরভিত, মনোরম, বর্ণ্যঢ্য কাব্যের উদ্যান সাজিয়েছেন। তাঁর কাব্য-ভাষা সম্পর্কে তাঁর নিজের বক্তব্যঃ  “কবিতা রচনার বেলায় আমি আমার নিজের জন্য একটি সুবিধামত ভাষা তৈরি করতে গিয়ে আঞ্চলিক শব্দরাজির সন্ধান পাই। এই শব্দ-সম্ভারও বহমান। খুব ব্যাপকভাবে না পারলেও আধুনিক বাংলা ভাষার গতি-প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রচুর শব্দরাজি আমি আমার রচনায় ব্যবহার করে পরিতৃপ্ত।” (ভূমিকাঃ আল মাহমুদের কবিতা)।  আল মাহমুদ অন্যত্র বলেনঃ “আমি আমার কবিতার জন্য একটি পছন্দমত ভাষাভঙ্গী উদ্ভাবন করতে গিয়ে আঞ্চলিক শব্দরাজির সন্ধান পাই। অকস্মাৎ আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত আধুনিক বাংলা ভাষার সমকালীন সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দরাজি বহু কবির বিচিত্র ব্যবহারে ও যথেচ্ছ আচরণে তিরিশ দশকেই বিস্বাদ, এমন কি পরবর্তী কবিদের জন্য গন্ধহীন পুষ্পের পচা স্তুপে পণিত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের বিভিনড়ব অঞ্চলের দৈনন্দিন ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দের যে অক্ষয় ভাণ্ডার রয়েছে সেখান থেকে ব্যাপকভাবে শব্দ আহরণ করে সাহিত্য রচনা করতে না পারলে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একঘেঁয়েমি কাটবে না। এই আহরণ নির্বিচার হলে চলবে না। প্রতিভাবান কবি ও কথাশিল্পীর অন্তরদৃষ্টি সেখানে একান্ত দরকার।…আধুনিক বাংলা ভাষার চলতি কাঠামোকে পরিত্যাগ করে নয় বরং এই কাঠামোর মধ্যেই আঞ্চলিক শব্দের কাব্যময় প্রয়োগকে নিশ্চিত করতে হবে। তবেই ভাষা লাফিয়ে উঠবে সমুদ্র তরঙ্গের মত।… আমাদের ভাষাও এক স্বতন্ত্র বাংলা ভাষা। আমাদের রাজধানী নগরীকে ঘিরে মহলায় মহলায় ইট-কাঠ ও ইমারতের প্রতিটি প্রকোষ্ঠে, সাজানো বিপণীকেন্দ্রে, মাঠে-ময়দানে পাক খাচ্ছে যে নব্য সতেজ শব্দরাজি আর বিচিত্র বাকভঙ্গী যা আধুনিক বাংলা ভাষার কাঠামোর মধ্যেই আঞ্চলিক ও প্রাকৃত শব্দের সচ্ছল গতায়াতে জেট পেনের মত গতিশীল, আমরা সেই দ্রুতগামী আধুনিক বাংলা ভাষারই কবি। আমি নিজেও।”

(কবিতার জন্য বহুদুরঃ আল মাহমুদ, প.ৃ ৩২)।

উপরোক্ত বক্তব্য থেকে আল মাহমুদের কাব্য-ভাষা সম্পর্কে ধারণা সৃষ্টি হয়। পশ্চিমবঙ্গের ভাষা থেকে আমাদের ভাষার একটা পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য দিন দিন আরো বেড়ে যাচ্ছে কারণ আমাদের ভাষা যেখানে আঞ্চলিক ভাষার শব্দরাজিতে পূর্ণ হয়ে μমান্বয়ে সতেজ ও সমৃদ্ধ হয়ে দেশের মানুষ ও মৃত্তিকা সংলগড়ব হচ্ছে, পশ্চিবঙ্গের বাংলা ভাষা ততই হিন্দী, সংস্কৃত ও অন্যান্য ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবে দিন দিন তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। আল মাহমুদ তাই যথার্থই আমাদের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ ব্যবহার করে বাস্তবতাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি যথার্থই আমাদের কবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে আবুল মনসুর আহমদের মত ঢাকাকে আধুনিক বাংলা ভাষার রাজধানী বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এটা এক যথার্থ স্বপড়বদ্রষ্টা কবির সাহসী উচ্চরণ। আল মাহমুদের সবগুলো কাব্যেই এই বিশিষ্ট কবি-ভাষার পরিচয় সুস্পষ্ট। এ কারণেই ফররুখ-পরবর্তী বাংলা কাব্য সাহিত্যে আল মাহমুদ একজন সনাক্তযোগ্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পনড়ব মৌলিক প্রতিভাধর কবি।

আধুনিক জীবনে নানা ধরনের অস্থিরতা। আমাদের সাহিত্যেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে অনেক কবির কবিতায়ও ভাষা ও চিন্তার অস্পষ্টতা ও জটিলতা এসেছে। কিন্তুু আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিকতার সকল লক্ষণ ধারণ করেও আল মাহমুদ

এ জটিলতা ও অস্পষ্টতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কয়েকটি উদাহরণঃ

১. “বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকূল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলে কন্যা কবুল কবুল।”

২. “নদীর চরের প্রতি জলে-খাওয়া ডাঙার কিষাণ

যেমন প্রতিষ্ঠা করে বাজখাঁই অধিকার তার,

তোমার মস্তকে তেমনি তুলে আছি ন্যায়ের নিশান

দয়া ও দাবীতে দৃঢ় দীপ্তবর্ণ পতাকা আমার।”

৩. “কই হারামজাদা, দেখুম আজকা তোর হগল পুংটামি  কোনখানে পাড়ো তুমি জবর সোনার আন্ডা, কও মিছাখোর?

তাজ্জবের মতো তারপর বলেই টানবে লেপ,

পেখম উদাম করে দেখবে এক বেশরম কাউয়ার গতর।”

আল মাহমুদের কবিতায় গ্রাম বাংলা, গ্রামীণ দৃশ্যপট, গ্রামীণ মানুষ সবই এসেছে যেমন অনায়াস ¯”^ ছন্দে, আধুনিক নাগরিক জীবন ও নগর-প্রসঙ্গও এসেছে তেমনি অকৃত্রিম সহজতায়। কবি বলেনঃ

“স্বপেড়ব আমার কুশল পুছে রোজ  ভাল কি আছ? হায়রে ভাল থাকা  নগরবাসী কে রাখে কার খোঁজ।”  (এক নদীঃ সোনালী কাবিন)

উনিশ শো বায়ানড়ব সনে ভাষা আন্দোলনের সময় কবি ভাষা আন্দোলন বিষয়ক কয়েক ছত্র কবিতা লিখে পুলিশের নজরে পড়ে সেই যে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারপর এ শহরই হয়েছে তাঁর জীবন-জীবিকার অবলম্বন। কবি এখানেই কাটিয়েছেন তাঁর যৌবনের প্রারম্ভ থেকে সারাটি জীবন। ঘর থেকে বের হয়ে শহরে আসার সে স্মৃতিটা তাঁর

কবিতায় ধরা পড়েছে এভাবেÑ

“ছিটকানিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর  মস্ত বড় শহরটা এই করছিল থর থর।”  নগরবাসী কবি নগরকে যে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে স্বস্তি পেয়েছেন তা নয়। নগর জীবনের কৃত্রিমতা, যান্ত্রিকতা, কলুষতা, হৃদয়হীনতা ও ক্লান্তিকর একঘেঁয়েমিপূর্ণ জীবনযাত্রায় কবি প্রায়শই অসহায় ও বিপনড়ব বোধ করেন। অনেক সময় তিনি মনে

করতে বাধ্য হন যে, তিনি বুঝি এখানকার কেউ নন। কবি তাই বলেনঃ

“আপনি উল্টোপথে বাজারে এসেছেন,  এটাতো বেঈমানের গলি।

গাধামুখো পুরুষ আর কুকুরমুখো  কসবীদের বাজার। এখানে সবুজ  কোথায় পাবেন?

আপনি বুঝেছি এ হাটের লোক নন।”

(হৃদয়পরু ঃ আমি দূরগামী)

আল মাহমুদের এ জীবনবোধ ও উপলব্ধি সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহিত্য-সামালোচক অনড়বদা শংকর রায় বলেনঃ “তাঁর কবিতার ভাষা অকৃত্রিম, অনাড়ম্বর, সহজ, সরল, প্রবহমান, সুমধুর। ছন্দের উপর তাঁর অসামান্য দখল। তিনি স্পষ্টভাষী। তাঁর হৃদয় ঠিক জায়গাতেই আছে। গ্রামের জন্য গ্রামবাসী জনগণের জন্য পলী প্রকৃতির জন্য তাঁর হৃদয় আকুল। নাগরিক জীবন

তাঁ কে আকর্ষণ করে না। শহরে তিনি পরবাসী।”

আল মাহমুদের কবি-পরিচয় ও তাঁর বৈশিষ্ট্য উপরোক্ত মন্তব্য সম্পর্ণ সঙ্গত ও যথাযথ সন্দেহ নেই। বাংলা কাব্যে ফররুখ

আহমদের পরে যে দু’জন কবি সর্বাধিক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তাঁরা হলেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। দু’জনেই প্রায় সমসাময়িক। পঞ্চাশের দশকে উভয়ের কাব্য-ক্ষেত্রে আবির্ভাব। দু’জনের আদি নিবাস গ্রা মাঞ্চলে হলেও প্রথম জন আজীবন নগরবাসী এবং দ্বিতীয় জন যৌবনের প্রার¤ ¢ থেকে নগরবাসী। তা সত্ত্বেও শামসুর রাহমান একজন নাগরিক কবি, আর আল মাহমুদ পরবর্তীতে নগরবাসী হয়েও গ্রাম-জনপদে মুক্ত প্রকৃতির অন্তর্লীন স্বভাবের কবি। একজন ইউরোপীয় ভাবধারা ও মানবতাবাদী আদর্শে উদ্ধুদ্ধ, অন্যজন দেশজ চিন্তা-চেতনা, আদশর্  ও ঐতিহ্য  লালিত প্রগাঢ় আন্ত রিকতায় দীপ্ত কবিসত্তা-অতএব, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে তিনিই যে অধিক প্রাধান্য পাবার যোগ্য তা বোধ করি, বলার অপেক্ষা রাখে না। সাহিত্যে গ্রহণযোগ্যতার একটি চিরন্তর মানদণ্ড রয়েছে, তা হলো জীবনধর্মিতা-জীবনের সাথে যা ঘনিষ্ঠভাবে সংশিষ্ট জীবনের সুখ-দুঃখ, পূর্ণতা-অপূর্ণতা, চাওয়া-পাওয়া, আশা ও স্বপড়বময়তার আশেষে যা সৃষ্ট, তার আবেদন তত স্থায়ী ও ব্যাপক। এদিক থেকে আল মাহমুদ ফররুখ-উত্তর সর্বাধিক উলেখযোগ্য কবি বলে অনেকের ধারণা। আল মাহমুদের জীবন-সংশিষ্টতা, ঐতিহ্যপ্রিয়তা, বিশ্বাসের প্রগাঢ়তা এবং সর্বোপরি অসাধারণ কবি-প্রতিভা, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিজস্ব কাব্য-ভুবন নির্মাণের সক্ষমতা তাঁকে বাংলা কাব্য-জগতে যথারীতি এক মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে।

‘লোক লোকান্তর’ ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’-এর আল মাহমুদ আর ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘ দোয়েল ও দায়িতা’,

‘দ্বিতীয় ভাঙন’এর আল মাহমুদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য সত্ত্বেও কবি-প্রতিভার স্ফরূ ণে উভয় ক্ষেত্রেই কবি আন্তরিক ও

জীবন-স্বভাবে উদ্দীপ্ত। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘জিজ্ঞাসা’ সম্পাদক শিবনারায়ণ রায়ের একটি মন্তব্য

অতিশয় প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেনঃ “পচাঁত্তর সালে আল মাহমুদের সঙ্গে প্রথম চাক্ষুস পরিচয় হবার আগে থেকেই আমি তাঁর কবিতার একজন মুগ্ধ পাঠক। সমকালীন যে দু’জন বাঙালি কবির দুর্দান্ত মৌলিকতা ও বহমানতা আমাকে বার বার আকৃষ্ট করেছে তাঁদের একজন বাংলাদেশের আল মাহমুদ অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ‘জিজ্ঞাসা’ প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় আল মাহমুদের একগুচ্ছ কবিতা আগ্রহী হয়ে প্রকাশ করি। আমার মনে হয়েছে যে, বাংলা কবিতায় তিনি নতুন স¤া¢ বনা এনে দিয়েছেন। পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেননি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন; আঞ্চলিক ভাষা, অভিজ্ঞতা, রূপাবলীকে তিনি নাগরিক চেতনায় সনিড়ববিষ্ট করে প্রাকৃত অথচ ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ এক কাব্য-জগৎ গড়ে তুলেছেন। জসীমউদ্দীন এবং জীবনানন্দ উভয়ের থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ভিনড়ব প্রকৃতির কবি। আল মাহমুদের গুচ্ছ কবিতা প্রকাশের পর অনেক বাংলাদেশী পাঠক পত্র লিখে জানান যে, আল মাহমুদ বর্তমানে ইসলামপন্থী প্রচারক হয়ে উঠেছেন যে তিনি সরকারের সমর্থন ও প্রগতিবিরোধী, যে সেই কারণে তাঁর প্রতি আমার মত র‌্যাডিক্যাল মানবতন্ত্রীর অনরু াগ অযৌক্তিক ও অসঙ্গত। উত্তরে আমি আল মাহমুদের আরেক গুচ্ছ কবিতা ‘জিজ্ঞাসা’ তৃতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশ করি এবং পাঠক-পাঠিকাদের জানাই যে, কবির ব্যক্তিগত বিশা¦ সের অংশ ভাগ অথবা তার বিবিধ μিয়াকলাপের সমর্থক না হয়েও তাঁর কবিতা উপভোগ করা স¤ব¢ । অনুভবের সততায়, কল্পনার মৌলকতা, শব্দ ব্যবহারে দক্ষতা, উপমা ও ব্যঞ্জিত বাকপ্রতিমা উদ্ভাবন শক্তি যার কবিতায় প্রত্যক্ষ তার বিশ্বাস ও ব্যবহার যাই হোক না কেন তাঁর কবিতায় সাড়া দেয়া কাব্যনুরাগীর পক্ষে স্বাভাবিক। ঢাকায় পৌঁছার পর বিভিনড়ব ছোটখাট আলোচনায় আল মাহমুদ সম্পর্কে বিরূপ কথা শুনি। যাঁ রা বলেন, তাঁরা অধিকাংশই তরুণ বিশ¦ি বদ্যালয়ের ছাত্র বা অধ্যাপক; কেউ কেউ কবি ও সাংবাদিক। তিনি যে একজন বড় কবি একথা অবশ্য তাঁরা অনেকেই মানেন। কিন্তু তাঁদের আশংকা যে ইসলামী গোঁড়ামি, পশ্চিম এশিয়ার পেট্রো ডলার এবং সামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা এই তিনে মিলে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতি করতে পারে এবং কোন শিল্পী তিনি যত শক্তিশালীই হোন না কেন, যখন ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামরিক সরকারকে সমর্থন করেন তখন তাঁকে আর শ্রদ্ধা করা চলে না। তাঁদের কথা থেকে এটুকু বুঝতে পারি যে, শিক্ষিতদের মধ্যে অনেকেই আল মাহমুদের বিরোধী এবং ঢাকয় বর্তমানে সম্ভবত তিনি নিঃসঙ্গ এবং প্রবাহমান প্রধান ভাবধারা থেকে বিচ্ছিনড়ব।” (দ্র. উপমাঃ আল মাহমুদ সংখ্যা, ১৯৯৪, পৃ. ২৫-২৬)।

নজরুলকেও তাঁর ইসলামী আদশর্  ও ঐতিহ্য চেতনার কারণে নিঃসঙ্গ করে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তুু তিনি তাঁর প্রতিভার সাত রঙা ঔজ্জ্বল্যে সকল বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেন। অনুরূপ একই কারণে ফররুখ আহমদকেও একঘরে করার চেষ্টা হয়। নজরুলের মত তিনি প্রতিবাদী ছিলেন না কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থন বা আত্মপ্রচারণায় অভ্যস্থ ছিলেন না। আলাহর উপর দৃঢ় ঈমানে বলীয়ান ফররুখের মত এক অসাধারণ প্রতিভাকে তাই নীরবে অভিমানে, অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে অকালে ঝরে পড়তে হয়। আল মাহমুদকেও হয়ত একই ভাগ্যবরণে বাধ্য করার চেষ্টা চলে। উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে তার প্রমাণ মেলে। বাস্তবে আরো অনেক প্রমাণ পাওয়া স¤ব¢ । কিন্তু আল মাহমুদ কিছুটা ভিনড়ব ধাঁচের। তাই নিজের অনভু ূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেনঃ

“আধুনিক কবির কোন বন্ধু হয় না।…যূথবদ্ধভাবে রাজনীতি, ছিনতাই বা অন্যকিছু চলতে পারে। কিন্তু কবি হবে নিঃসঙ্গ।

কবির অনুরাগী কিংবা অনুরাগিণী দু’একজন থাকতে পারে। অবস্থার বিপাকে এক-আধজন প্রেমিকও। কিন্তু কবির সাথে

অন্য কবির দিবস যামিনী সৌহার্দ্য রক্ষা কবিতা নির্মাণে দারুণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (উপমা, ১৯৯৪, পৃ. ১৭)।  অতএব, আদশির্ক কারণে আল মাহমুদের যে নিঃসঙ্গতা, তা কবিকে মনঃক্ষণড়ব করেনি বরং কবির কাব্য-চর্চার ক্ষেত্রে নিঃসঙ্গতা বা অন্যের উপেক্ষা অনেকটা শাপে বর হয়েই দেখা দিয়েছে। এটা যে কোন অভিমানের কথা নয়, তা তাঁর নিরন্ত র সৃষ্টিকর্ম ও এর বৈচিত্র্য থেকে সহজেই ধারণা করা চলে। কবির আত্মাবিশা¦ স ও দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় থেকেই যে এরূপ ঘটেছে তা নিমেড়বাক্ত উদ্ধৃতি থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফররুখ আহমদ প্রসঙ্গে কবি বলেনঃ “ফররুখ আহমদকে একঘরে

করে রাখা, তাঁর সামাজিক বিচ্ছিনড়বতা ও সাহিত্যিক পরিণাম জানা থাকা সত্ত্বেও আমি  ইসলামকেই আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারালৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি।” (কবিতার জন্য বহু দূর পৃ. ৩৩)।

তাঁর পেট্রোডলার প্রাপ্তি সম্পর্কিত যে অপপ্রচার সে সম্পর্কে কবি বলেনঃ “ইসলাম গ্রহণ করে বুঝেছি, আমি বৈষয়িক দিক দিয়ে খুব বেশী বুদ্ধিমানের মত কাজ করিনি। কারণ পেট্রোডলার দূরে থাক, আমার মত নও মুসলিমদের এ তলাটে পেটে পাথর বাঁধার মত অবস্থা প্রায় সবারই।…যারা আমার ইসলাম গ্রহণকে পেট্রোডলারের কারসজি বলে প্রচার করে

একধরনের আন্তর্জাতিক বিরূপতা সৃষ্টির প্রয়াস পাচ্ছেন তাদের জানিয়ে রাখি, আমার ভাগ্যে এখনও কোনরূপ সিকে ছিঁড়ে নি। (কবির আত্মবিশ্বাস পৃ. ১১)।

তাই দেখা যায়, আল মাহমুদের নিঃসঙ্গতা তাঁর বিশা¦ সের কারণে। এ বিশা¦ সে তিনি দৃঢ়বদ্ধ, তাঁর আত্মার গভীর থেকে উৎপনড়ব এ বিশা¦ স। তাই এ বিশা¦ স তাঁকে μমাগত সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, হতাশায় ম্রিয়মান ও স্থবির হয়ে পড়েননি।

আল মাহমুদের কাব্য-কর্মের প্রতি নিবিষ্ট দৃষ্টিপাত করলে তিনটি পর্যায় চোখে পড়ে। তাঁর ‘লোক লোকান্তর’ (১৯৬৩),

‘কালের কলস’ (১৯৬৬) ও ‘ সোনালী কাবিন’ (১৯৭৩) পর্যন্ত একটি পর্যায়। এখানে নারী ও প্রকৃতি একান্তভাবে তাঁর

কবি-কল্পনাকে উদ্রিক্ত করেছে। এ পর্যায়ে নারীর দেহগত রূপ-সৌন্দর্য কবিকে এমনভাবে আকৃষ্ট করেছে যে, তাঁর প্রেম

যৌনতা ও দেহজ কামনা-বাসনার উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাই এ প্রেম একান্ত বাস্তবসম্মত ও আবেগময়। পাঠকের মনকে তা সহজেই তরলিত করে। আল মাহমুদের প্রকৃতি-প্রেমও একান্ত অকৃত্রিম ও স্বাভাবিক। বাংলার শ্যামল-সুন্দর প্রকৃতি চিরদিনই এর অধিবাসীদেরকে নানাভাবে আকৃষ্ট-মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করেছে। বাংলার সবুজ নিসর্গ, ফুল, পাখি, নদী, শ্যামলবরণ নারী সেই চর্যাপদের কাল থেকে আজ পর্যন্ত সকল কবি-শিল্পী, সংবেদনশীল মানুষকেই কমবেশী আকৃষ্ট করেছে। সকলেই এর রূপ-সৌন্দর্যের বর্ণনায় অকুণ্ঠ। তবে সকলের বর্ণনাই যে একরকম তা নয়, আবার সকলের বর্ণনাই সমান মনোমুগ্ধকর তাও নয়। আল মাহমুদ বাংলার কোমল পলিমাটির কোলে মেঘ-মেদুর আকাশের নিচে বেড়ে ওঠা মানুষ। প্রকৃতির নিবিড় আলো-ছায়া, মেঘ-রৌদ্দুরের আনাগোনার মধ্যে আল মাহমুদের দুরন্ত কবি-কল্পনার বিকাশ। বাড়ির পাশের তিতাস নদী, নদী-পাড়ের ঘন শ্যামলতা, শালবন-বাঁশবনের ফাঁকে জীর্ণ মায়াবী কুটির, গাছে গাছে ফুল-ফলের বাহার, নানা রঙের পাখিদের কিচির মিচির শব্দ সবই একান্ত অন্তরঙ্গভাবে আল মাহমুদের কবিতায় রঙ-বর্ণ-গন্ধ-সুষমা বিস্তার করেছে।  ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ (১৯৭৬) থেকে ‘দোয়েল ও দয়িতা’ (১৯৯৭) পর্যন্ত কবিতার যুগকে আল মাহমুদের দ্বিতীয় পর্যায় বলা যায়। ১৯৭৪ সনে কারাবাসের সময় থেকেই আল মাহমুদের চিন্তা-চেতানায় যে পরিবর্তন সূচিত হয় তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় তাঁর এ দ্বিতীয় পর্যায়ের কাব্য-কবিতায়। তাঁর এ পর্যায়ের কবি-কর্মে ইসলামী ঐতিহ্য, ভাব-চেতনা ও বিভিনড়ব ধর্মীয় অনুষঙ্গ স্থান লাভ করেছে। কুরআনের বিভিনড়ব বিষয়-কাহিনী, চরিত্র এই পর্যায়ে কবি-কল্পনার মতূর্  হয়ে উঠেছে। বরং এই চেতনার ফলে বাংলা কাব্যে বিচিত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্পনড়ব নানা রূপকল্প, উপমা ও অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে।  ‘দ্বিতীয় ভাঙনে’ (২০০০) এসে আল মাহমুদ আবার বাঁক ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এটাকে তাঁর কাব্য-কর্মের তৃতীয় পর্যায় বলা যায়। প্রতিভাবাবান ব্যক্তিরা কখনো একস্থানে স্থির হয়ে থাকে না বেশী দিন। একবিংশ শতকে আল মাহমুদ আরো বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব নিয়ে তাঁর কাব্য-ভুবনকে বিচিত্রতর করে তোলার প্রয়াসে তৎপর। আল মাহমুদের সে ক্ষমতা আছে। এ পর্যায়ে আল মাহমুদ অধিকতর ঐতিহ্যসচেতন হয়ে উঠেছেন। মূলত আল মাহমুদের চিন্তা-চেতনায় ইসলামের প্রভাব, তাঁর কাব্যকবিতায় তার প্রকাশ অধিকতর সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সে সাথে যুক্ত হয়েছে তাঁর বিশা¦ সনুভুতি ও দেশ-বিদেশ পরিভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। আল মাহমুদ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসাবে ভারত, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বৃটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ সফর করেন। বিদেশ পরিভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর কাব্যে নতুন ব্যঞ্জনা, বক্তব্য ও অনভু ূতির সঞ্চার করেছে। এটা তাঁর সুপরিণতিরই সুস্পষ্ট লক্ষণ। সাহিত্য-ক্ষেত্রে বিশিষ্ট অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি এ পর্যন্ত যেসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন তা নিমড়বরূপঃ

১.         বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা, ১৯৬৮)

২.         জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার, কলকাতা (কবিতা, ১৯৭২)

৩.        জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার (কবিতা, ১৯৭৪)

৪.         সুফী মোতাহার হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (ছোটগল্প, ১৯৭৬)

৫.        বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (কবিতা, ১৯৮০)

৬.        শিশু একাডেমী (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার (ছড়া কবিতা, ১৯৮১)

৭.         আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (ছড়া কবিতা, ১৯৮৩)

৮.        অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা, ১৯৮৩)

৯.         কাফেলা সাহিত্য পুরস্কার, কোলকাতা (কবিতা, ১৯৮৪)

১০.       হুমায়ুন কািিদর স্মৃতি পুরস্কার (ছোটগল্প, ১৯৮৪)

১১.       একুশে পদক (রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, কবিতা, ১৯৮৭) ১২. ফিলিপ্স সাহিত্য পুরস্কার (কবিতা, ১৯৯০)

১৩.      নাসিরউদ্দিন ¯ণ্বর্ পদক (কবিতা, ১৯৯০)

১৪.       বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল, দুবাই-সাহিত্য পুরস্কার- ১৯৯১

 

 

You Might Also Like