আলোচিত রিফাত হত্যা: এক মাস কেটে গেলও ধোঁয়াশা কাটেনি

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের এক মাস পূর্ণ হলো আজ। গত ২৬ জুন সকাল সোয়া ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রাস্তায় ফেলে রিফাত শরীফকে স্ত্রীর সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করেন নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ তাদের সহযোগীরা। এ সময় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি হামলাকারীদের সঙ্গে ধস্তাধ্বস্তি করেও স্বামীকে শেষ রক্ষা করতে পারেননি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান রিফাত শরীফ।

প্রকাশ্যে একজন যুবককে হত্যার এমন ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় দেশব্যাপী। এ নৃশংসতা নাড়া দেয় সবাইকে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি ওঠে সব মহলে।

এ হত্যাকাণ্ডের ৩০ দিন কেটে গেলেও ধোঁয়াশা কাটেনি। হত্যার নেপথ্য কারণ এখনও উদ্ঘাটিত হয়নি। একেকবার একেক দিকে মোড় নিচ্ছে। মামলার বেশিরভাগ আসামি ধরা পড়লেও মামলার অগ্রগতি খুব একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না।

রিফাত হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার প্রধান সাক্ষী তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। তাকেই এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। রিমান্ড চলাকালীন মিন্নি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মিন্নির গ্রেফতারের পরেই মামলা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের দাবি, মিন্নির কাছ থেকে জোর করে জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। তিনি এ হত্যা মামলার এক নম্বর সাক্ষীকে (মিন্নি) আসামি করা ও রিমান্ডে নেয়ার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে দায়ী করে আসছেন। গত শুক্রবার গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘সবকিছুই শম্ভু বাবুর খেলা। তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে রক্ষা করার জন্য আমার মেয়ে (মিন্নি) কে বলি দেয়া হচ্ছে।’

শম্ভুর ছেলে সুনামের বিরুদ্ধে কিশোরের অভিযোগ, তার জন্যই এতদিন মিন্নির পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি আইনজীবীরা। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু সমালোচনার পর বরগুনা ও ঢাকার আইনজীবীদের একটি অংশ মিন্নির পক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা গেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল নায়ক সাব্বির আহমেদ নয়ন বন্ড। তাকে এ মামলার প্রধান আসামি করা হয়। নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। নয়নের মায়ের দাবি তাকে হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় ও রিফাতের স্ত্রীকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করায় স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন মিন্নিকে এ মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন মিন্নি এ ঘটনায় দায় এড়াতে পারেন না। কারণ রিফাতের সঙ্গে বিয়ের আগে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির যোগাযোগ ছিল। এ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরেই প্রাণ হারাতে হয় রিফাতকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরগুনার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের এক মাসের মধ্যে এ মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় সম্পন্ন করেছে পুলিশ। এ মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা বেশ কিছু আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিশেষজ্ঞদের মতামতের জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছে পুলিশ। এসব আলামতের মধ্যে নয়ন বন্ডের বাসা থেকে জব্দ করা মেয়েদের একটি জামা, একটি চিরুণী, খোদাই করে শামুকের গায়ে এন+এম লেখা একটি শামুক, নয়ন ও মিন্নির একসঙ্গে একটি ছবি রয়েছে।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ভিডিও পুলিশ মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। আর মোবাইল ফোনসহ কয়েকটি ইলেকট্রনিক উপকরণ মামলার জব্দ তালিকায় রয়েছে। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে মিন্নির বাবার অভিযোগ মিন্নিকে জোর জবরদস্তি করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। প্রভাবশালী মহলকে বাঁচাতে পুলিশ এ ঘটনায় মিন্নিকে ফাঁসাতে এমনটি করেছে। গ্রেফতারের পর মিন্নির ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। তার সারা শরীরে ব্যথা। রাতে ঘুমাতে পারেন না তিনি।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পুলিশ মিন্নির জবানবন্দি নিয়েছে। প্রভাবশালী মহলকে বাঁচাতে পুলিশ এ ঘটনায় মিন্নিকে ফাঁসাচ্ছে। তাই এ মামলার তদন্ত পিবিআইতে স্থানান্তরের দাবি জানাচ্ছি।

মিন্নি স্বামী রিফাতকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে দাবি করে মোজাম্মেল হক বলেন, আপনারা সবাই ভিডিও ফুটেজে দেখেছেন রিফাতকে বাঁচাতে মিন্নি জীবনবাজি রেখেছে। শত চেষ্টা করেও তাকে রক্ষা করতে পারেনি।

মিন্নিকে যে গ্রেফতারের পর নির্যাতন করা হয়েছে, সেটি উঠে এসেছে তার আইনজীবীর কথায়ও। বরগুনা বারের সাধারণ সম্পাদক ও মিন্নির আইনজীবী মো. মাহবুবুল বারী আসলাম বুধবার দুপুরে তার সঙ্গে জেলহাজতে দেখা করেন।

পরে মিন্নির উদ্ধৃতি দিয়ে আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মিন্নির পুরো শরীরে ব্যথা আছে। তিনি রাতে ঘুমাতে পারেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তিনি।’

এমতাবস্থায় মিন্নির চিকিৎসা দরকার জানিয়ে আইনজীবী মাহবুবুল বারী বলেন, জেল সুপারের উপস্থিতিতে মিন্নির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, তার সঙ্গে জোর-জবরদস্তি করা হয়েছে। তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, সে খুব অসুস্থ। তার চিকিৎসার প্রয়োজন।

এ সময় সাংবাদিকরা মিন্নির ওপর কী ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে, জানতে চাইলে আইনজীবী বলেন, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানায়নি। তবে তিনি খুবই অসুস্থ। তিনি জানিয়েছেন, তার শরীরে খুব ব্যথা। তার চিকিৎসার প্রয়োজন। কারাগারে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন।

মিন্নিকে দিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ানো হয়েছে বলেও আইনজীবীকে জানান মিন্নি। মাহবুবুল বারী মিন্নির উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, ‘মিন্নি রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তা পুলিশ শিখিয়ে দিয়েছে। সেই জবানবন্দি মিন্নি প্রত্যাহার করতে চাচ্ছেন। তাই আমি মিন্নিকে এ স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদনের প্রক্রিয়া শিখিয়ে দিয়েছি।’

প্রসঙ্গত বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় ২৬ জুন সকাল ১০টার দিকে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বিকাল ৪টায় বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এ হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের পরের দিন রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এ ছাড়া সন্দেহভাজন অজ্ঞাতনামা আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। এ মামলার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। মামলার এজাহারভুক্ত ছয় আসামিসহ এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

রিফাত হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী ও রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে গিয়ে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পর থেকে মামলা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

১৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরগুনার মাইঠা এলাকার বাবার বাসা থেকে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তার বক্তব্য রেকর্ড করতে বরগুনা পুলিশলাইনসে নিয়ে যায় পুলিশ। এর পর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাত ৯টায় মিন্নিকে রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

পর দিন মিন্নিকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আদালত মিন্নির পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী।

পর দিন বৃহস্পতিবার বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে জানান, মিন্নি তার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

গত শুক্রবার বিকালে মিন্নি একই আদালতে তার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

You Might Also Like