আমার সন্তানের মুখ রক্তাক্ত কেন?

আনিসুল হক
আপনারা কি ফেনীর সেই স্কুলছাত্রটির ছবি দেখেছিলেন? একজন ছাত্র, পিঠে ব্যাকপ্যাক, রাস্তায় বসে পড়েছে, তার সমস্ত চোখেমুখে থকথক করছে রক্ত!
সেই শিশুটাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ, আর আমাদের ক্ষমতা দখলের রাজনীতি তার মুখে মারছে বোমা, তাকে রক্তাক্ত করে তুলছে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকেই তারা ক্ষতবিক্ষত করে তুলছে।
আমরা কেউ চাই না, ঘর থেকে বেরোনো আমাদের সন্তানটি বিপদের মধ্যে পড়ুক, সবাই চাই সে ফিরে আসুক নিরাপদে। আমরা নিরাপদে ঘুমাতে চাই, আমরা শান্তি চাই; আমরা কাজের, চলাফেরার, লেখাপড়ার, আয়-উন্নতি, ভালো থাকার পরিবেশ চাই।
এটা সবাই চায়। তাহলে কেন আমাদের শিশুদের বোমা হামলার শিকার হতে হয়? কে দায়ী?
বিএনপি বলবে আওয়ামী জোট দায়ী। আওয়ামী লীগ বলবে বিএনপি জোট দায়ী।
প্রথমে পরিস্থিতিটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগের হয়ে ভাবার চেষ্টা করি।
প্রথমেই বিএনপিওয়ালাদের মনের ভাষাটা বোঝার চেষ্টা করি।
বিএনপিওয়ালাদের ভাষ্য হতে পারে এমন:
২০১৩ সালের আগে সব ধরনের জরিপে দেখা যাচ্ছিল, জনপ্রিয়তায় বিএনপি এগিয়ে। ভোট হলেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত বিএনপি জোটই। সরকার জানত যে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটায় এমন নির্বাচন হলে তারা আবার ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করল। যদিও উচ্চ আদালত আরও দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার সুযোগ দিয়েছিলেন। আর সংবিধান পরিবর্তনের আগে যত বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধির মত নেওয়া হয়েছিল, তাঁরা কেউই তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেননি। তা সত্ত্বেও একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা হয়।
এরপর বিএনপি ও তার জোট কীভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে? তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করতে শুরু করে। তার পরও সরকার গায়ের জোরে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে গেলে তারা নির্বাচন বর্জন করে এবং প্রতিহতের ডাক দেয়। এর আগে দু-দুবার তো আওয়ামী লীগ ও তার জোট তা-ই করেছিল। ১৯৯৬ সালে বিএনপি একা একা নির্বাচন করলে তা টেকেনি, অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি প্রণয়ন করে ওই একদলীয় সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান পদে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অধিষ্ঠিত হলে একপর্যায়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে। তখন মইন উ আহমেদরা হস্তক্ষেপ করলে সে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
তাহলে বিএনপি কেন শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে? আর যে নির্বাচনে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরা নেই, তা হতে দেবেই-বা কেন? ওই একতরফা নির্বাচনের পর আশা করা গিয়েছিল, সরকার আলোচনা শুরু করবে, একটা গ্রহণযোগ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে দেশ এগিয়ে যাবে। কিন্তু সরকারের দিক থেকে ক্ষমতা ছাড়ার কোনো ইচ্ছা নেই। বরং তারা বিরোধী দলকে কোনো রকমের পরিসর দিতে চায় না। মিছিল হলেই গুলি হয়। জনসভার অনুমতি পাওয়া যায় না।
এখন পরিস্থিতি এমন যে বেগম জিয়ার মতো দু-দুবারের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, একাধিক টেলিভিশন ও সংবাদপত্র বন্ধ, সর্বশেষ একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুম, খুন, অপহরণের ঘটনা ঘটছে। এ অবস্থায় অবরোধ ডাকা ছাড়া বিএনপি ও তার জোট আর কী করতে পারে? কাজেই চাই তীব্র আন্দোলন, যাতে সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়! সরকার যদি মনে করে তারা এতই জনপ্রিয়, তারা ঢাকায় বিএনপিকে একটা জনসভা করার অনুমতি দিক না কেন? তারাও জনসভা করুক। দেখা যাবে, কোন জনসভায় বেশি লোক হয়!
এবার আওয়ামী লীগওয়ালাদের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখি:
গত নির্বাচনের আগে বিএনপিকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। একটা সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়েছিল। এমনকি বেগম খালেদা জিয়া যেদিন ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিলেন, তা শেষ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দিয়ে তাঁকে হরতাল প্রত্যাহারের আবেদন জানান। তখন তিনি হরতাল প্রত্যাহার করেননি। শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হয়েও তখনকার বিরোধী নেতাকে টেলিফোন করেছিলেন। ফলে বিএনপি নির্বাচনে আসার শেষ ট্রেন মিস করেছে। তারা সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা করেছে নির্বাচন প্রতিহত করার, ট্রেনে-বাসে আগুন দিয়েছে, এমনকি শত শত স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা পুড়িয়েছে। তার পরও নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। এখন তো কিছু করার নেই। আমরা মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন দেব? রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা দেওয়ার জন্য?
বিএনপি আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়েছে। গণ-আন্দোলনের বদলে তারা সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। এতে তারা আরও জনবিচ্ছিন্ন হবে। দেশের মানুষ ভালো আছে। ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। দেশে-বিদেশে সরকার নানা স্বীকৃতি ও পুরস্কার পাচ্ছে। কাজেই এই রকমই চলবে। আরও চার বছর পরে নির্ধারিত নিয়মেই নির্বাচন হবে। তাতে বিএনপি আসবে কি আসবে না, সেটা তারা এখন থেকেই বিবেচনা করে দেখতে পারে। ঢাকায় তাদের জনসভা করার অনুমতি কেন দেওয়া হবে? আমাদের সংবিধান সমবেত হওয়ার অধিকার দিয়েছে, কিন্তু সেটা শর্তসাপেক্ষ। সমাবেশ হতে হবে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র। এর আগে হেফাজতে ইসলামকে ঢাকায় সমবেত হওয়ার অনুমতি দেওয়ার ফল কী হয়েছিল, সবাই জানেন। এরপর তো সরকার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করতে দিতে পারে না। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারের।
এবার আমরা দুই দলের বাইরে গিয়ে পরিস্থিতিটা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি:
এ কথা কারও কারও মনে হতে পারে যে বিএনপি জোট গত নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছে। নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিচ্ছে, এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টে যেত। হাওয়া বিএনপির পক্ষে বইতে শুরু করলে প্রশাসনের লোকজনও আর আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করতে পারতেন না, তাঁরাও আসন্ন বিজয়ী দলের পক্ষেই কাজ করতে শুরু করতেন। আর বর্জন যখন করলই, তখন বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের কৌশল নেওয়া তাদের জন্য ঘোরতর আত্মঘাতী হয়েছে। আন্দোলন থেকে বিযুক্ত হয়েছে মানুষ। তারা নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখনো তাদের উচিত এমন কৌশল অবলম্বন করা, যাতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট করা যায়। মুশকিল হলো, সরকার তাদের সে সুযোগ দিচ্ছে না।
অন্যদিকে, বাস্তবতাও তাদের বিবেচনা করতে হবে। নব্বইয়ের পরের ২৫ বছরে মানুষ বুঝে গেছে, এ-দল ও-দল যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, উইনার টেকস ইট অল, অ্যান্ড উইনার টেকস ইট অ্যালোন। মানুষ আন্দোলন করে, জীবন দেয়, ভোট দেয়—যে পক্ষকেই ক্ষমতায় বসাক না কেন, ক্ষমতাসীনেরা তারপর শুধু চেনে নিজেদের, তারা নিজেদের জন্য, নিজেদের দ্বারা এবং নিজেদের হয়েই কেবল কাজ করে। তাহলে আমি দেশের সাধারণ নাগরিক কেন তোমাকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য লড়াই করব! নিজের ক্ষতি স্বীকার করব!
ব্যাপারটা আমার আবারও মনে হলো। ৪ জানুয়ারি বেগম জিয়াকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আমি সদরঘাট থেকে গুলিস্তানের দিকে আসি সন্ধ্যায়। রাস্তায় যানবাহন ছিল না, কারণ সরকারি অবরোধ। কিন্তু অফিসফেরত মানুষ ছিল হাজার হাজার। এই মানুষেরা যদি বিক্ষুব্ধ হতো, তাহলে এই হাজার হাজার মানুষের স্রোতটাই তো চলমান মিছিলে পরিণত হতে পারত। এটা আমরা অতীতে হতে দেখেছি।
১৯৭১ সালের যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্থগিত ঘোষণা করেন, তখন ঢাকায় ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল স্টেডিয়ামে। খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো গ্যালারি মিছিলে পরিণত হয়, রাস্তায় নেমে আসে, পুরো ঢাকা শহরের সব রাজপথ রূপ নেয় মিছিলসমুদ্রে। ১৯৯০ সালে এরশাদ সাহেবের শেষ দিনগুলোয় মিছিল-সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কারফিউ জারি করা হয়েছে। শুধু শুক্রবার দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেওয়া হলো জুমার নামাজ যাতে মানুষ পড়তে পারে। দলে দলে মানুষ টুপি মাথায় দিয়ে বায়তুল মোকাররমে চলে গেল, কোনো নেতা সেদিন নির্দেশ দেননি। নামাজ শেষে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ল মিছিল নিয়ে। বিজয়নগরের মোড়ে আর্মি কনভয়গুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেষে পুলিশ গুলি করল কাকরাইলের মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে। বেগম জিয়ার মতো বড় নেতাকে নিজের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, মির্জা ফখরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এর পরও যখন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে না, তখন বুঝতে হবে, বিএনপির পক্ষে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভব হবে না।
এবং সেটা একটা বিপজ্জনক লক্ষণও। এমনিতেই এই সরকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা সরকার। তার আচার-আচরণের মধ্যে ড্যাম কেয়ার ভাব স্পষ্ট। ক্ষমতার প্রবণতাই হলো নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠা। বিরোধী দলের সমালোচনা, সংবাদমাধ্যম, স্বাধীন বিচার বিভাগ, মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো ক্ষমতাকে নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখার জন্য সক্রিয় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব সংগঠন ভোঁতা হয়ে আসছে। সরকারের আচরণও দমনমূলক ও অগণতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। সেটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়, জনগণের জন্য তো নয়ই।
আর বিরোধী কণ্ঠ উচ্চারিত হওয়ার পরিসর বন্ধ করে দেওয়া হলে তা চোরাগোপ্তা পথ খুঁজবে, দেশ হয়ে উঠবে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের লালনক্ষেত্র। কাজেই সরকারের উচিত গণতান্ত্রিক রীতিনীতির চর্চা করা। বিরোধী দলের সঙ্গে একটা আলোচনার সূত্র খুঁজে বের করা। দমন–পীড়নের মাধ্যমে অজনপ্রিয় হওয়ার কৌশল না নিয়ে বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট থাকা। দেশের মানুষ যদি খেতে পায়, পরতে পায়, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পায়, মানুষের যদি আয়-উন্নতি হতে থাকে, তাহলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে। জনপ্রিয় সরকারের মানুষকে ভয় পাওয়ার দরকার পড়ে না, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার ফন্দি খুঁজতে হয় না।
মনে রাখতে হবে, ভিন্নমত যদি একজনেরও থাকে, সেটা প্রকাশ করতে দেওয়ার নামই গণতন্ত্র, এবং ওই একজনের কথাকেও গ্রাহ্যতার মধ্যে নিতে পারার মধ্যেই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি নিহিত। বিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়াকে গণতন্ত্র বলে না। তা কারও জন্য কল্যাণও বয়ে আনে না।
ফেনীর ওই স্কুলছাত্রের রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মুখের ভাষা কি আমরা পড়তে পারব না? আমাদের শান্তি দিন। আর শান্তি দেওয়ার কৌশলটি হোক শান্তিপূর্ণ! যে রাজনীতি শিশুর রক্তে হাত রঞ্জিত করে, তার অবসান চাই।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

You Might Also Like