‘আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন’

বিষণ্ণতায় আক্রান্ত এই নারী ঘুমালেই শুনতে পান তার মেয়ের চিৎকার, আর্তনাদ। মনে হয় এই বুঝি মেয়ের আশেপাশে বোমা বর্ষিত হচ্ছে।

১৯৮৬ সালের মে মাসে জ্যাকি সালেহর তিন কন্যাকে অপহরণ করে ইয়েমেনে নিয়ে যায় তারই স্বামী। এখন যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে ততই তিনি তার কনিষ্ঠ কন্যাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। খবর বিবিসির।

অথচ তার জীবনের সুখ স্মৃতি বলতে মেয়েদের ছোটো বেলায় ঘরের আঙ্গিনায় তাদের সাথে খেলা করার মূহুর্তগুলো। ‘তারা অনেক দুষ্টুমি করতো। ফ্রিজ থেকে মিষ্টি চুরি করে খেয়ে ফেলতো। কিংবা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে পড়তো মায়ের সাথে ঘুমাবে বলে’।

পাঁচ বছর বয়সী রাহান্নাহ ছিলো বেশ স্মার্ট আর তার এক বছরের ছোটো ছিলো নাদিয়া। আর সাফিয়া ছিলো মাত্র আঠার মাস বয়সী।

একটি সুখী ভালোবাসায় পূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই জন্ম হয়েছিলো এই তিনটি চমৎকার মেয়ের। তাদের বাবার সাথে জ্যাকি সালেহর পরিচয় হয়েছিলো সত্তরের দশকের শেষের দিকে একটি ডিস্কোতে।

সে তার বাবার সাথে কার্ডিফে বাস করতো আর এসেছিলো ইয়েমেনের তিয়াজ থেকে। এরপর প্রেমে পড়া, ভালোবাসা, বিয়ে আর সন্তান। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করলো যখন জ্যাকির স্বামী অতিরিক্ত মদ্যপান, জুয়ায় আসক্ত হলো এবং কাজ করা ছেড়ে দিলো।

তার অতিরিক্ত শাসনের কারণে বাচ্চারা ভয় পেতে শুরু করলো। এসবের জের ধরে বিয়ের ছয় বছরের মাথায় ডিভোর্স চাইলেন জ্যাকি সালেহ এবং ১৯৮৬ সালের মেতে জীবনের এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

‘এসময় আমি ফ্লুতে আক্রান্ত হলাম। সে বললো কাছেই তার বাবার বাসায় সে বাচ্চাদের নিয়ে যাচ্ছে এক রাতের জন্য। কিন্তু পরদিন তারা ফিরে না আসায় আমি জ্ঞান হারাই। এক পর্যায়ে পুলিশ আসলো’।

পরে পুলিশ তাকে জানালো যে বাচ্চাদের নিয়ে প্রথমে লন্ডন ও পরে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে একটি বিমানে চেপেছে তাদের বাবা।

এরপর দীর্ঘদিন ধরে দুঃসহ সময় কাটাতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে সন্তানদের অভাবে তার জীবন হয়ে উঠেছিলো বিভীষিকাময়।

ইন্টারপোল সাদেক (জ্যাকির স্বামী)কে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে খুঁজলো কিন্তু আর খোঁজ পাওয়া গেলোনা। তার বিশ্বাস ছিলো যেহেতু তার সন্তানরা ব্রিটিশ নাগরিক ছিলো ও তাদের ব্রিটিশ পাসপোর্ট তাই কেউ না কেউ সহায়তা করবেই।

‘অনেক মিস করতাম। স্কুল বা খেলার দিন এসবে খুব কষ্ট হতো। কিন্তু এভাবেই দিন কাটতে লাগলো’। পনের বছর পর যোগাযোগ হলো যেভাবে ২০০১ সালে হঠাৎ করেই আমার বাড়ির দরজায় আরবিতে লেখা একটি চিঠি আসলো।

‘আমার হৃদপিণ্ড কেপে উঠলো। অনুবাদ করে দেখলাম চিঠিটি ছিলো বড় মেয়ে রাহান্নাহর’। এরপর যোগাযোগ করে আমি ওই বছর মে মাসেই ইয়েমেনে যাই। ততদিনে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।

রাহান্নার বয়স একুশ। নাদিয়ার ১৯। ‘তারা মুসলিম। নেকাব পড়তো। কিন্তু যখন মুখগুলো দেখলাম তখন তারা একেবারেই আমার মতো। অল্প ইংরেজিতে তারা জানালো তাদের জীবন ভালো নেই। রাহান্না জানায় সে কখনোই আমাকে ভুলেনি এবং আমাকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা কখনো বন্ধ করেনি’।

‘আর ছোটো সাফিয়া। অন্য এক নারীকে তার মা বলে বলা হয়েছিলো। আর সত্য সম্পর্কে তার কোনো ধারনাই ছিলোনা। তাই আমি একদিন তার স্কুলে গেলাম। তাকে বললাম যে আমি তার মা। ব্রিটিশ বার্থ সার্টিফিকেট দেখালাম। এক পর্যায়ে যে ফ্লোরে বসে কাঁদতে লাগলো’।

কিছুদিন পর আবার ব্রিটেনে ফিরে আসেন জ্যাকি আর মেয়েরা ইয়েমেনেই। রাহান্নার দুটি সন্তান। তবে ২০০৭ সালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলো নাদিয়া। একই বছর তাদের অপহরণকারী বাবাও মারা গেলো।

রাহান্নার সাথে যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হলেও সাফিয়ার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয় জ্যাকির। হোদেইদা শহরে চার সন্তান নিয়ে বাস করে সাফিয়া যেখানে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করছে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী।

লড়াই ক্রমশ বাড়ছে আর সাফিয়ার স্বাস্থ্যও ভালো নয়। তার বাচ্চাও অসুস্থ। ভিডিওতে কথা বলার সময় প্রতিবারই কান্না করে সে।

‘সে ব্রিটিশ নাগরিক যাকে অবৈধভাবে তার জন্ম দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেজন্য আমি ব্রিটিশ সরকারের কাছে অনুরোধ করছি। তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনুন। চোখ বন্ধ করলেই আমি তার চিৎকার শুনতে পাই’।

You Might Also Like