হোম » ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’

‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’

admin- বুধবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০১৭

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’।
এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকান্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।
এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ‘এখন সময়’এ’ ধারাবাহিকভাবে ছাপ হচ্ছে।
আজকের পর্বে থাকবে ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’

একজন মন্ত্রী, রাজনীতিক নেতা কিংবা ব্যবসায়ী হিসাবে নয়, ব্যক্তিজীবনে প্রতিদিন আমি কী করি, এ সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান। অনেকের কৌতূহল আবার সীমাহীন। জবাবে তাঁদের বলি, আমি একেবারে সহজ-সরল এবং খুব সাধারণ জীবনযাপন করি। লোকজন মনে করেন, আমি সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক টাকার মালিক। আসলে তা নয়, আমি আমার আয়ের অধিকাংশ অর্থ দান করে দিই জনকল্যাণে। আমি অন্যায় পথে কোন সম্পদ অর্জন করিনি। কোন অন্যায় পথে অর্থ ব্যয়ও করিনা। কোন অপচয় করিনা। আর্তমানবতার সেবায় অর্থ ব্যয় করি।

মাছে ভাতে বাঙালি। ভাত তো প্রিয়ই, মাছের মধ্যে ইলিশ আমার প্রিয় মাছ। ছাত্রজীবনে বাড়ি যাওয়ার পথে ফেরিঘাটে ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খেতাম। কী স্বাদ ছিল সে মাছের! গান-শোনা আমার প্রিয় একটি শখ। পুরনো দিনের প্রায় সবগুলো গান আমার ক্যাসেটে বন্দি ছিল। রবীন্দ্রসংগীত আমার খুব প্রিয়। নজরুলগীতিও শুনি। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় থাকার সময় অবসর পেলে গান শুনতাম। এখন আগের মতো সময় পাই না, তবু গান শুনি কাজের ফাঁকে, যখনই সময় পাই। গান মানুষের মনকে শৈল্পিক চিত্রণে আবেশিত করে রাখে। মনে আনে নান্দনিক অনুভূতি।

মনুষ্যজীবন দুর্লভ ও মহীয়ান হলেও খুব ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে কাজের মাধ্যমে চিরন্তন মুগ্ধতায় দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা যায়। এটি করতে হলে আমাদেরকে সংকীর্ণ লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সহজ-সরল জীবন পরিচালনা করতে হবে।

আমি প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে অফিসে পৌঁছাই। সাধারণত চিন্তাগুলো আমি সকালের দিকেই করি। সারাদিন কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকি। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন, সকালের নামাজ দিয়ে শুরু হয় আমার দিন। তাই সবাইকে আমি বলি : খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন। এটা খুব কঠিন কাজ নয়, যদি এটা অভ্যাসে পরিণত করা যায়। Early rising is also essential to the good government of a family. A late breakfast deranges the whole business of the day, and throws a portion of it on the next, which opens the door for confusion to enter.

অতএব প্রত্যেকের উচিত ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। ভোরে ঘুম থেকে উঠলে দিনটা অনেক বড় হয়, বড় দিন মানে কাজের জন্য প্রচুর সময়। আপনি যদি বেশি কাজ করতে চান, পৃথিবীর সৌন্দর্য অধিক উপভোগ করতে চান, তাহলে ভোরে শয্যা ত্যাগ করতে হবে।
সকালে নামাজের পর আমি আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নাস্তা করি। তারপর, আমার কিছু শখ আছে সেগুলোর অনুশীলন করি। হাঁটতে যাই, মাঝে মাঝে লংড্রাইভে যাই। প্রকৃতি আমাকে আনন্দ দেয়। তাই প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করি। অনেক সময় সবুজ ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটি, সবুজ ঘাস আর মুক্তার মতো শিশিরমাখা মাটি আমাকে বিমোহিত করে। মনকে প্রশান্তিময় উদারতায় ভরিয়ে তোলে। এ এক মনোরম অনুভব!

মাঝে মাঝে আমি বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাই। দুপুরে খাওয়ার জন্য অফিস থেকে বাসায় যাই এবং আমার সহধর্মিনীর সঙ্গে খাই। কখনও কখনও নিকটবর্তী কোনো রেস্তোরাঁয় যাই। মাঝে মাঝে সাধারণ নাগরিকদের পরিদর্শনে যাই। তাদের সঙ্গে কথা বলি। মাঝে মাঝে এলাকাতেও যাই। আমার দিন চলে খুব সাধারণভাবে। আর এতেই আমি সুখী ও আনন্দিত। আসলে জীবনযাত্রা যত সহজ হয়-শান্তি ও সুখ তত অবারিত হয়। জটিল জীবনে সুখও জটিল হয়ে ওঠে।

মনুষ্যজীবন দুর্লভ ও মহীয়ান হলেও খুব ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে কাজের মাধ্যমে চিরন্তন মুগ্ধতায় দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা যায়। এটি করতে হলে আমাদেরকে সংকীর্ণ লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সহজ-সরল জীবন পরিচালনা করতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরলতা প্রকৃতিপ্রদত্ত সহজাত একটি গুণ। এটা মানুষের মনে শান্তি ও সুখ এনে দেয়। আমি একেবারেই পছন্দ করি না জটিল ও দুর্বোধ্য জিনিস; যাঁরা আমার নিকটজন, তাঁরা এটা খুব ভালো করে জানেন। সবার সঙ্গে আমি যতটুকু সম্ভব খোলামনে আন্তরিকতার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করি। এমনকি যারা আমার অকল্যাণ কামনা করেন, তাদেরকেও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করি, সবার মঙ্গল কামনা করি। কোনো বিলাসিতা আমার পছন্দ নয়। অতি সাধারণ আমার ব্যক্তিগত জীবন।

শহর ও নগরের প্রচুর উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তারপরও ভালো লাগে গ্রামীণ পরিবেশ। এখানে আছে সারল্য, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা। সাগর ও পানি দেখতে ভালো লাগে। আকাশের চাঁদ, বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি, সবুজ ঘাসের প্রান্তর, বন্ধুবান্ধবদের জড়ো হওয়া এবং একের প্রতি অপরের ভালবাসা- এসবে জীবনের অনন্ত সৌন্দর্য নিহিত। আমি মাঝে মাঝে গাড়ি চালাতে পছন্দ করি। আমাকে প্রতিনিয়ত আলোড়িত করে মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালার কিছু বাণী। পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধটা আমার একটু বেশি এবং আমি সেভাবে নিজেকে পরিচালিত করি। ইসলাম ধর্মে সাধারণ জীবনযাত্রাও একটি ইবাদত।

পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। তারপরও কিছু মানুষ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা নিয়ে এবং অন্যের বোঝা ও বিরাগভাজন হয়ে জীবনযাপন করেন। হতাশায় থাকেন। আমি মনে করি, ইচ্ছা থাকলে খুব সহজে জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। জীবনকে ভরিয়ে তোলা যায় মায়ের স্নেহে, শিশুর হাসিতে, বন্ধুর সাহচর্যে এবং স্ত্রীর ভালবাসায়। এজন্য যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে সরলতা এবং অহংবোধ ত্যাগ করে সাধারণ্যে বিলীন হওয়া।

আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহামানব; মহান নেতা এবং সহজ-সরল জীবনযাপনের প্রতীক। তিনি ছিলেন মানবতার ধ্বজা, ব্যক্তিত্বের সীমাহীন লাস্যে ভরপুর একজন সাহসী রসুল। তিনি সবসময় হাসিখুশি, প্রফুল্ল ও খোশমেজাজে থাকতেন। সাধারণ লোকদের সঙ্গে আহারে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি জীবনের সৌন্দর্যকে ভালবাসতেন। ব্যস্ত সময়সূচি এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করতেন এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন।

আমাকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার কি রাগ নেই? আমি বলি : আছে।

আবার প্রশ্ন আসে, তা হলে রাগেন না কেন? কত নগণ্য লোক আপনার বিরুদ্ধে অযথা মিথ্যা প্রচার করে আপনাকে হেয় করেছে। ইচ্ছা করলে তাদের সমুচিত শিক্ষা ও জবাব দিতে পারতেন, কেন দেননি?

সবিনয়ে তাঁদের বলেছি : আমি প্রায় প্রতিদিন নানা কারণে রাগি, কিন্তু আমি শিখেছি কীভাবে এ রাগকে গোপন রাখতে হয়, সংবরণ করতে হয়। এখনও আমি মনে করি, রাগকে যত গোপন রাখা যায়, ততই অন্যের ওপর আমার প্রভাব ও আমার ওপর তাদের শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। রাগ একপ্রকার পাশবতা। এটি ভুলের উৎস। এজন্য মানুষকে চরমভাবে অনুতপ্ত হতে হয়। তাই রাগ যত সংযত রাখা যায় ততই মঙ্গল। আর একটা বিষয় আমি খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি- সেটি হচ্ছে সময় ব্যবস্থাপনা। জীবনে সময় কম, তাই সময়ের সদ্ব্যবহার অনিবার্য কিন্তু তাই বলে তাড়াহুড়া কখনও নয়। তাড়াহুড়ো প্রায়শ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে তাড়াহুড়ো করে সে লক্ষ্য হতে ছিটকে যেতে পারে। অতএব, সাবধান- কোনো অবস্থাতে তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধীরস্থির মনোভাব নিয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে অগ্রসর হউন। সাফল্য আসবেই।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় বাংলাদেশ একটি নরকে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মানবাধিকারের বালাই ছিল না। তবু আমি আশা ছাড়িনি। কারণ আমি জানি, পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারও ছোট্ট একটি মোমবাতির আলোকে ঢেকে রাখার সামর্থ্য রাখে না। এসময় আমাকে অনেকে বিপদে ফেলার জন্য চেষ্টা করেছে। এমন অনেকে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, যাদের আমি একদিন উপকার করেছিলাম। আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি জানি, শত্রুকে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তাদের বন্ধু করে নেওয়া। ওয়ান-ইলেভেনে যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল, তাদের সবাইকে আমি জানি। আমি প্রতিশোধ নেব না। প্রতিশোধ নেইনি। প্রতিশোধ এক প্রকার বন্য বিচার। তবে আমি ভালবাসার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব। এমন প্রতিশোধের পরিণতি খুবই মধুর হয়। শত্রুতা কখনও শেষ হয় না। কারও জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য একজন শত্রুই যথেষ্ট। তবে শত্রু এমন একটা শক্তি যে, এটাকে শত্রুতা দিয়ে কোনোদিন শেষ করা যায় না। আগুন দিয়ে কি আগুন নেভানো যায়? যায় না।

যদি ‘চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত’ নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

উন্নয়নের জন্য, শিল্পায়নের জন্য, গণতন্ত্রের সুফল পরিপূর্ণভাবে পরিব্যাপ্ত করার জন্য রাজনীতিক সহনশীলতা অত্যাবশ্যক। রাজনীতি থাকবে রাজনীতির স্থানে। সমাজ বিনির্মাণে রাজনীতির কৌশল প্রতিফলিত হবে, তবে তা হবে দলমতের ঊর্ধ্বে। যদি ‘চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত’ নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

সন্ত্রাসী জনপদ হতে সুশীল সন্তান পাওয়া যায় না। তাই আমি, আমার এলাকায় আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয়গুলোকে সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত রেখে পরিচালনা করছি। আমি বিশ্বাস করি, সহনশীল রাজনীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। শিশুদের সহনশীল মনোভাব, উদার চেতনা ও সহানুভূতিশীল প্রত্যয়ে গড়ে তোলা গেলে জাতির আর কিছুর প্রয়োজন হবে না। ভবিষ্যতে শিশুরাই হয়ে উঠবে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি হাসিমুখে থাকি, হাসিমুখে থাকা ভালো। হাসি খুশী মানুষের চিন্তা, কর্ম আর বিবেককে শালীন রাখে। একটি হাসিমাখা মুখ মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণ জ্যোৎস্নার চেয়েও মনোরম। কথা মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু আবার সবচেয়ে বড় শত্রু। কথা দিয়ে মানুষকে জয় করা যায় আবার এ কথাই বন্ধুকেও শত্রুতে পরিণত করতে পারে। জিহ্বা কথার বাহন, স্বাদেরও বাহন বটে। তাই জিহ্বাকে যে যত সংযতভাবে ব্যবহার করতে পারে সে তত মহৎ হয়ে ওঠে। বেশি কথা বলা যেমন ভালো নয়, তেমনি ভালো নয় কম কথা বলা। কথায় আছে, “কথা ব্যক্তিত্বের একটি উপাদান। সবার সাথে তাল মিলিয়ে যে কথা বলে সে ব্যক্তিত্বহীন।” কথা এমনভাবে বলতে হবে- যেন আপনার চারপাশ আপনাতে মুগ্ধ হয়ে ওঠার প্রেরণা খুঁজে পায়। আপনার ব্যক্তিত্বে আকর্ষনবোধ করে। (চলবে)

আগামী আকর্শন : ‘আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ’