হোম » আমার দুবাই দেখা

আমার দুবাই দেখা

admin- Tuesday, August 16th, 2016

আবু এন এম ওয়াহিদ :

দুবাইয়ের কথা আমি প্রথম শুনেছি ঊনিশ শ’সত্তর দশকের গোড়ার দিকে। তখন বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ মাত্র দুবাই যেতে শুরু করেছে। যেতে যেতে এক সময় এমন হল, চারদিক থেকে শুধু রব শুনা যেত, ‘দুবাইত যাইতাম, দুবাইত যাইতাম।’(অর্থাৎ, দুবাই যাব, দুবাই যাব) তখন আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিষয়টা শহর থেকে তেমন একটা বোঝা যেত না। ছুটিতে যখন বাড়ি যেতাম, তখন ঘরে-বাইরে, হাট-বাজারে, সবার মুখে মুখে খালি দুবাইয়ের কথা শুনতাম। কেউ গেছেন, কেউ যাবেন, কারো পাসপোর্ট হয়েছে, কারো আকামা এসেছে, কেউ টাকার জন্য হালের বলদ, চালার টিন, ক্ষেতের জমি বেচার ধান্ধায় হন্যে হয়ে খরিদদার খুঁজছেন। কেউ শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য বৌকে নির্যাতন করছেন, কেউ দালাল কিংবা আদমব্যাপারির কাছে সর্বস্ব হারিয়ে হায় হায় করছেন! পঞ্চায়েতে সালিশ-বিচার বসাবার পাঁয়তারা করছেন। তৎকালীন গ্রামবাংলার এটা ছিল এক স্বাভাবিক ও নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র।
প্রথম দিকে গ্রামের বেকার ও আধা-বেকার যুবকরাই দুবাই যাচ্ছিলেন। তাঁদেরকে পাঠাবার আঞ্জাম দিতে গিয়ে অভিভাবকদের বিশেষ অসুবিধার মুখোমুখি হতে হত, কারণ তখন গ্রামে জমি-জিরাত কেনার মত লোকের অভাব ছিল খুব বেশি। বছর দু’ একের মধ্যেই দেখলাম অবস্থাটা পাল্টে গেল। অর্থাৎ দুবাইযাওয়া কর্মীবাহিনী বাড়িতে টাকা পাঠাতে শুরু করেছেন। তাঁদের বাপ-চাচারা জমি-বিক্রেতা থেকে রাতারাতি ক্রেতায় পরিণত হলেন। জমির দাম বাড়তে শুরু করল। তখন নতুন দুবাই যাওয়ার লোকদের আর জমি বেচে টাকা জোগাড় করতে তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না। দু’বছর আগে যেখানে দু’বিঘা বেচে ছেলেকে দুবাই পাঠাতে হত, তখন এক বিঘাতেই সে কাজ হয়ে যাচ্ছিল। এ যেন ‘কৈ-এর তেলে কৈ ভাজা!’ মানে দুবাইয়ের টাকায়ই ব্যাপক হারে মানুষ দুবাই যেতে লাগল।
এই ডামাডোলের মাঝে, ভেতরে ভেতরে নিরবে ঘটে গেল আরেক অঘটন। এক সময় দেখলাম দুবাইয়ের লু হাওয়া, বাড়িঘর, হাটবাজার থেকে গিয়ে লাগল গ্রামবাংলার স্কুল কলেজের দুয়ারে দুয়ারে। অর্থাৎ ছাত্ররাও লেখাপড়া ছেড়ে দুবাই যাওয়ার উৎসবে মেতে উঠল। এ প্রক্রিয়া যখন তুঙ্গে তখন এক ছুটিতে আমি গেলাম আমার প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড়লেখা পিসি হাইস্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা করতে। এক শিক্ষকের সাথে গেলাম ক্লাস টেনে। ক্লাসে বসে এক সময় স্যারকে জিজ্ঞেস করলাম, আজকালকার ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় কেমন? তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘লেখাপড়া কী আর করবে! তারা আছে বাংলাদেশে, কিন্তু তাদের মন তো অলরেডি চলে গেছে দুবাইতে। যাচাই করে দেখ, এই ক্লাসের অর্ধেক ছাত্রেরই পাসপোর্ট হয়ে গেছে। আকামা আসবে আর উড়াল দেবে। এমন মনের অবস্থায় কি পড়ালেখা হয়?’ বুঝলাম, আলামতটা ভাল নয়। আরো বুঝলাম, আমাদের মাত্রাজ্ঞানের বড়ই অভাব। ভাল কাজটাও যখন করি, শুরু করি ভালভাবেই, কিন্তু কখন, কোথায় থামতে হয়, সেটা জানি না।
অভিভাবকরা এটা বুঝলেন না, স্কুলকলেজ ছেড়ে যে ছেলেটা দুবাই গেল, সে তো ফিরে এসে আর লেখাপড়ায় ফিরতে পারবে না। বিদ্যাশিক্ষা তো আর ছেলেখেলা নয়। বয়সের জ্ঞান, বয়সেই শিখে নিতে হয়। ছেলেটা যদি মূর্খই বনে যায়, তাহলে টাকা দিয়ে করবেটা কী? এ প্রশ্ন অভিভাবকদের কাউকে তেমন ভাবালো না! দুবাইয়ের আকর্ষণে তখন দেশ ও দেশের মানুষ কীভাবে দেওয়ানা হয়ে গিয়েছিল, সেকথা একটা সামান্য উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট বুঝতে পারবেন। সেই সময় দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, ‘বিচিত্রা’ বছরের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র হিসেবে ‘দুবাইওয়ালা’কে নিয়ে করেছিল এক বছরের প্রচ্ছদগল্প, এবং সময়টা ছিল ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি কোনো এক বছর।
দুবাইয়ের কথা শুনতে শুনতে আর দুবাইওয়ালা দেখতে দেখতে একদিন সত্যি সত্যি আমারও দুবাই দেখার সুযোগ এসে গেল। ঊনিশ শ’ ঊনআশি সাল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে আমার শিক্ষকতার মাত্র এক বছর হয়েছে। কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম। ঠিক করলাম, চাকরিতে ছুটি নিয়ে পড়তে যাব। যাওয়ার আগে বিয়ে করলাম, আগষ্ট মাসের মাঝামাঝি। তারপর ভর্তি, ভিসা, টিকেট ইত্যাদির প্রয়োজন। চিরায়ত বাংলার নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের চিরকালীন টানাপড়েন – টাকাটা আসবে কোত্থোকে? মামা, বড়ভাই ও শ্বশুরের সহায়তায় প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন হল। এই সুযোগে, আমার জীবনে এই তিনজনের অবদানের কথা আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করছি ও তাঁদের জন্য আল্লাহ্র দরবারে দোয়া চাইছি। জীবনে প্রথমবারের মত বিদ্যা হাসিল করতে বিদেশ যাব, কানাডার উইনিপেগে। রওয়ানা দিয়েছি ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে লন্ডন, তারপর নিউইয়র্কে বড়ভাইয়ের সাথে একরাত থেকে টরোন্টো হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যে।
পয়লা যাত্রাবিরতিতে যে দেশের মাটিতে আমি পা রাখলাম সে হল দুবাইয়ের উত্তপ্ত বালুরাশি। সেই সময়ে দেখে মনে হয়েছিল, দুবাই এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে খুব একটা তফাৎ নেই। দুবাই শহর তখনো ‘দুবাই’-এ পরিণত হয়নি। অবকাঠামো মাত্র গড়ে উঠতে শুরু করেছে। সে বার বিমান থেকে দুবাই এয়ারপোর্টে আমাদের নামতে দিয়েছিল কিনা সে কথা আজ আর মনে নেই। এরপর দেশে এলাম ১৯৮৩ সালে। লন্ডন-ঢাকা ফøাইটে আবারো থেমেছিলাম দুবাইয়ে। বিমান বিকল হয়ে যাওয়ায় দুবাই এয়াপোর্টে আটকা পড়ে গেলাম প্রায় ১৫/১৬ ঘন্টা। একটা চিকেন স্যান্ডউইচ আর এক গ্লাস কমলার রস খেয়ে সারারাত ট্র্যানজিট লাউঞ্জে শুয়ে-বসে কাটাতে হয়েছিল। তখনো দুবাইয়ের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন চোখে ধরা পড়েনি। প্রায় দুই যুগ পরে, আরো কয়েকবার দুবাই হয়ে যাওয়া-আসা করেছি। ট্র্যানজিট প্যাসেঞ্জার হিসেবে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে কাছে হোটেলেও রাত কাটিয়েছি। এয়ারপোর্টের চাকচিক্য দেখে বুঝে গেছি যে, ততদিনে দুবাই, ‘দুবাই’ হয়ে গেছে! তথাপি, দুবাই শহরের উন্নয়ন, তার মাটি, মানুষ, দেশ ও দেশের অবকাঠামো কোনো কিছুই আমার ভাল করে দেখার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয়নি।
২০১৬ সালে একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিতে নিজ শহর ন্যাসভিল থেকে দুবাই গেলাম। এবার দুবাইয়ে ছিলাম তিনদিন। কিছুটা হলেও দুবাই দেখার সুযোগ হল। কী দেখলাম, কী জানলাম, কী বুঝলাম, সে বয়ান নিয়েই আজকে হাজির হয়েছি আপনাদের সামনে। রওয়ানা দিয়েছি এপ্রিলের ১৫ তারিখ। যাত্রাপথ, ন্যাসভিল-শিকাগো-দোহা-দুবাই। শিকাগো, দুনিয়ার ব্যস্ততম বিমান বন্দরের অন্যতম। শুরুতেই শিকাগোতে গিয়ে পড়লাম এক ঝামেলায়। ইন্টারন্যাশনাল টার্মিন্যালে উঠেই দেখি অত্যধিক মানুষের ভীড়। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, যেন সব জাতেরই লোক সমাগম হয়েছে শিকাগোতে। যাত্রীরা বেহুঁশ হয়ে ছুটছেন যাঁর যাঁর মত করে। সবাই যে সঠিক পথে ঠিক জায়গায় যাচ্ছেন তাও নয়। অহরহ ভুল করছেন, ফিরে আসছেন, ইনফরম্যাশন ডেস্কে যাচ্ছেন, কেউ ডিরেকশন বুঝছেন, কেউ না বুঝেই দৌড়ছেন, ঘুরপাক খাচ্ছেন। প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে পেরেশানি ও দুশ্চিন্তার আলামত স্পষ্ট। নারী-পুরুষ এমনভাবে দৌড়ছেন, শুধু সামনের দিকেই তাঁদের খেয়াল, অন্য দিকে মামুলি দৃষ্টি ফেলারও কোনো সময় নেই। আপন ছেলেমেয়েদের প্রতিও নজর রাখতে পারছেন না, বাচ্চারা মা-বাবার সাথে দৌড়ে পেরে উঠছে না, কাঁদছে আর হাঁটছে। স্ট্রলারে বসা শিশুর হাত থেকে দুধের বোতল ছিটকে পড়ছে। কার খবর কে রাখে! ঘাড়ের গাট্টি-বোঁচকার দিকেও খেয়াল নেই, জুতো স্যান্ডেল পা থেকে ফস্কে যাচ্ছে, তাতেও হুঁশ ফিরছে না। এরাইভ্যাল এরিয়াতে কারো প্রিয়জন আসছেন, তাঁরা খুশিতে আটখানা। ডিপার্চার এরিয়াতে বাজছে বিদায়ের করুণ সুর। রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘যেতে নাহি দিব….তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়…!’ আমার কাছে মনে হল যেন কেয়ামতের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছি। তবে একটা পার্থক্যও ধরা পড়ল। এখানে হাজারো মানুষ, হাজারো পাসপোর্ট হাতে, হাজারো গন্তব্যে ধাবমান, কিন্তু কেয়ামতের দিনে মানুষ যতই হোক না কেন, হাতের পাসপোর্ট মাত্র দু’ধরণের এবং ঠিকানাও দু’টো – মাত্র দু’টো।
এত সব ভেবে ভেবে সিকিউরিটি লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। যথারীতি পুলসেরাত পার হয়ে আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বিমানে গিয়ে উঠলাম। বোয়িং ৭৭৭ এয়ারক্রাফ্ট। ক্যাবিন ভর্তি প্যাসেঞ্জার। ২০/২২ জন ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টের মাঝে মাত্র দু’একজন বাদে বাকি সবাই দেখলাম ফিলিপিনো নারী। তাঁদের সুপাভাইজারও সেদেশি। কাতার এয়ারলাইন্সে এটা আমার প্রথম উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা। খাবার দাবার এবং সেবাযত্ন খুব ভালই লাগলো। বিমানে একটা মজার ঘটনাও ঘটল। প্রায় আধাপথ ওড়ার পর ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টদের সুপারভাইজার আমাকে এসে বললেন, ÔAre you alright? If you need anything, please go to the kitchen area and ask for.Õ একটু পরে আমি সেখানে গিয়ে এক ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্টের কাছে একটা আপেল চেয়েই বুঝতে পারলাম কাতার এয়ারলাইন্স যাত্রীসেবার ব্যাপারে কতখানি যত্নবান এবং দিলদরাজ! তিনি আমাকে বড় বড় দু’টো চিকেন স্যান্ডউইচ, একটা আপেল ও একটা কলা দিলেন। মনে পড়ল, ক্লাস টেনে থাকতে ভাব সম্প্রসারণ করেছিলাম,
‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই,
যাহা পাই তাহা চাই না!’
এবার বলতে ইচ্ছে হল,
যাহা চাই তাহা কম করে চাই,
পেয়ে গেলে ভাবি,
আরো বেশি কেন চাই না!
খাবারের সাথে ফøাইট ক্রু আমাকে কাতার এয়ারলাইন্সের ফ্রিকোয়েন্ট ফøায়ার ক্লাবের মেম্বারশিপ ফর্ম দিলেন। আমি খাবারগুলো কিচেন কাউন্টারে রেখে ফর্ম ফিলআপ করতে লাগলাম। নাম দস্তখত লিখে ফর্ম ফেরৎ দিয়ে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নিজ সিটে ফিরে আসব, এমন সময় দেখি আমার পাশ থেকে একটা স্যান্ডউইচ চুরি হয়ে গেছে! বিমানের ভেতর এমন চুরিদারির শিকার কি কেউ কখনো হয়েছেন?
১৬ তারিখ সন্ধ্যার আগে আগে গিয়ে পৌঁছালাম দোহা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। দোহাতে প্রায় তিন ঘন্টার লে-অভার। হাঁটাহাঁটি, ঘোরাঘুরি এবং কর্মরত কয়েকজন কর্মচারির সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, তা সংক্ষেপে এ রকম। টার্মিন্যাল বিল্ডিং-এ কাগজ-কলম নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা প্রায় সবাই ফিলিপিনো, দু’একজন পাকিস্তানি চোখে পড়ল। যাঁরা দোকনাদারি করছেন অথবা দোকান-র্যাস্তোরাঁয় কাজ করছেন তার একটা বড় অংশ ভারতীয়, যাঁরা দু’হাতে হুইল চেয়ার ঠেলছেন অথবা ট্রলি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিচ্ছেন, তাঁরা সবাই শ্রীলঙ্কান। টার্মিন্যাল বিল্ডিং-এ সংখ্যায় যাঁরা সবচেয়ে বেশি তাঁরা বাংলাদেশি তরুণ। দু’একজনের সাথে কথা বলে জানলাম, শুধু এয়ারপোর্টেই এক হাজার বাংলাদেশি ছেলে কাজ করেন, এবং এঁরা সবাই ক্লিনিংএর কাজে ব্যস্ত। আলাপ করে আরো জানলাম, এঁদের মধ্যে বিএ, এমএ, এমন কী এমবিএ ডিগ্রিধারীও আছেন। বুঝলাম, আমরা আমাদের শ্রমশক্তিকে বিদেশে পাঠিয়েছি বটে, কিন্তু সঠিক লোকটিকে সঠিক জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। তাঁদের সাথে কথা বলে আরো জানলাম, কাতারে আসা বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের লাঞ্ছনার করুণ সব কাহিনি। দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলতে ইচ্ছে করে, আমার মা-বোনেরা দেশে ভিক্ষে করুক, তবু ভাল, বিদেশে গিয়ে মানসম্ভ্রম খোয়াবে কেন? এ সব হযবরল অবস্থার জন্য কি কারো কোনো দায়-দায়িত্ব নেই?
দোহা থেকে দুবাই পৌঁছালাম স্থানীয় সময় রাত এগারোটায়। আমার জানা ছিল না যে, দুবাইতে দু’টো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর – দুবাই ইন্টারন্যাশন্যাল এবং আল-মাখ্তুম ইন্টারন্যাশন্যাল। আমি নামলাম আল-মাখ্তুম ইন্টারন্যাশন্যাল-এ, যেটা দুবাই থেকে খানিকটা দূরে। একজন বাংলদেশি ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে নিয়ে এলেন আমার হোটেলে, যেটা দুবাই ইন্টারন্যাশন্যাল-এর একেবারেই কাছে। হোটেল থেকে এয়ারপোর্টের রানওয়ে দেখা যায়। প্রথম রাতেই যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জানালা দিয়ে দেখেছি কিছুক্ষণ পর পর একটি বি-৭৭৭ আকাশে পাখা মেলছে। ঘড়ি ধরে বিস্ময়ে অবলোকন করলাম, প্রতি আড়াই মিনিটে একটা প্লেন টেক অফ্ করছে! সে রাতে, আল-মাখ্তুম-এ নামায় আমার একটা সুবিধা হয়েছিল। দুবাইয়ের স্কাইলাইন এবং রাতের আলো-ঝলমল দুবাই দেখার সুযোগ হয়েছিল। পরে একদিন দিনের বেলা দুবাই মেট্্েরারেল চড়ে অনুজপ্রতিম অস্ট্রেলিয়ান এক বন্ধুর সাথে যখন পামজুমায়রা দেখতে যাই, তখন দুবাই সম্বন্ধে আমার ধারণা আরেকটু পাকাপোক্ত হয়। দুবাইয়ের স্কাইলাইন দেখে অভিভূত না হয়ে পারিনি, কারণ এত অল্প পরিসরে এত উঁচু উঁচু ইমারত, হংকং এবং নিউ ইয়র্কের পরে দুনিয়ার আর কোথাও নেই। দুবাই-আবুধাবি হাইওয়ে অথবা শেখ জায়েদ রোড-এর দু’ধারে শত শত স্কাইস্ক্র্যাপার দেখে মনে পড়ল অনেক পুরনো দিনের কথা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকতে একবার পিকনিকে গিয়েছিলাম মধুপুর গড়ে। সে বার দেখেছিলাম মধুপুরের বনে কিভাবে ঘন ঘন গজারি আর শাল গাছ সারি সারি বেড়ে উঠেছিল। ঠিক সেভাবেই যেন দুবাইয়ের হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আসমান ছুঁতে চাচ্ছে, তবে এ দু’য়ের মধ্যে একটা তফাৎও ধরা পড়ল। মধুপুরের শাল-গজারি চ্যাপ্টা সবুজ পাতায় ঢাকা, আর দুবাইয়ের উঁচু উঁচু দালানগুলো দিনের বেলা যেমন তেমন, কিন্তু রাতের আঁধারে বর্ণিল আলোয় ঝলমল করে। গুগুল ঘাঁটাঘাঁটি করে জানলাম, এসব তাবৎ সম্পত্তির মালিকানা প্রধানত দুবাইয়ের তিনটি কোম্পানির হাতে সীমাবদ্ধ – নাখিল প্রপার্টিজ, এমা’র প্রপার্টিজ এবং আল্ মাখ্তুম গ্রুপ।
অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে দুবাইয়ের কিছু কাজকারবার আমার চোখে ধরা পড়ল যা কিছুটা হলেও আলোচনার দাবি রাখে বলে মনে করি। শুরু করি একটু ইতিহাস দিয়ে। ঊনিশ শ’ তিরিশ সালে দুবাইয়ের স্থানীয় আরব ভাষাভাষি লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ হাজার। তখন সেখানে বিদেশিরা খুব একটা আসতও না, থাকতও না, থাকার কোনো কারণও ছিল না। ওই সময় দুবাইয়ের উপকূলে মাছধরা এবং মুক্তো কুড়ানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কোনো সুযোগও ছিল না। বর্তমানে সেই ৩০ হাজার মানুষ বেড়ে হয়েছে ৪ লাখের একটু কম। এরা সবাই দুবাইয়ের নাগরিক। এ ছাড়া সেখানে আছে আরো ৪/৫ লাখ ইরানী বংশোদ্ভূত লোক। দুবাইয়ে তাঁদের ষোল আনা নাগরিক অধিকার আছে কিনা এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি, তবে তাঁরা প্রায় সবাই ব্যবসায়ী। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দুবাইয়ে ইরানীয়দের বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি ডলার। সেখানে ভারতীয়দেরও বড় বিনিয়োগ আছে। শুধু আবাসন খাতেই তাঁরা লগ্নী করেছে ৬ শ’ কোটি ডলার। দুবাইয়ে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানীরা খাটাচ্ছে তাঁদের তাগড়া তাগড়া পুঁজি। পুঁজিপতি বাদেও রুজিরুটির সন্ধানে কী পরিমাণ লোক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে দুবাইয়ে এসে যে জড়ো হয়েছে তা জানলে যে কেউ অবাক না হয়ে পারবেন না! আজকাল দুবাইয়ে রাতের বেলা থাকেন ২৫ লাখ লোক এবং দিনে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ। অর্থাৎ আশপাশ আমিরাত থেকে প্রতিদিন ১০/১৫ লাখ লোক দোকানদারি এবং চাকরি-বাকরির জন্য এসে ভিড় করেন দুবাই শহরে। দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশই বিদেশি তার মাঝে সিংহভাগই ভারতীয়, পাকিস্তানী, ফিলিপিনো, বাংলাদেশি এবং শ্রীলঙ্কান। অবশিষ্ট মাত্র কয়েক লাখ লোক পশ্চিমা ও অন্যান্য দেশের। তাঁরা বেশিরভাগই পেশাজীবী এবং বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী।
সম্প্রতি দুবাই কয়েকটি চোখ জুড়ানো ও মন মাতানো আইকনিক স্থাপনা তৈরি করে বিশ্বকে রীতিমত চমকে দিয়েছে। যেমন, বুর্জ খলিফা – পৃথিবীর সর্বোচ্চ টাওয়ার, বন্দর জেবেল আলীতে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কৃত্রিম পোতাশ্রয়, পাম জুমায়রা দুনিয়ার বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দ্বীপ, দুবাই মল – যখন তৈরি হয় তখন পৃথিবীর কোথাও এত বড় শপিং সেন্টার ছিল না। দুবাইয়ের সোনার বাজার আকারে এবং ব্যবসার লেনদেনে আজ অবধি বিশ্বে অতুলনীয়। এমিরেটস এয়ারলাইন্স-এর বোয়িং ৭৭৭ ফ্লিটের মত এত বড় বহর অন্য কোনো এয়ারলাইন্সের নেই। দুবাই মেরিনা, দুবাই ওয়াটার ফ্রন্ট, দুবাই বিজনেস ব্যে – এগুলোও আধুনিক দুবাইয়ের বিশেষ বিশেষ আকর্ষণ। তা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দুবাইয়ের কয়েকটি বিশেষায়ীত শিল্পের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ফ্রি জোন – দুবাই ইন্টারনেট সিটি, দুবাই মিডিয়া সিটি, দুবাই এজুকেশন সিটি, দুবাই হেল্থকেয়ার সিটি, দুবাই টেকনোলজি সিটি, দুবাই সায়েন্স পার্ক, দুবাই বিজনেস পার্ক, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
কী উন্নত কী উন্নয়নশীল, সব দেশই নিজ দেশে বিদেশি পুঁজি ও বিদেশি বিনিয়োগ ডেকে আনে আপন দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য, অথচ দুবাই করেছে তার ঠিক উল্টোটা। দুবাইয়ের শেখ নিজ দেশে বিশাল অঙ্কের দেশি পুঁজি বিনিয়োগ করে লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন, তবে দুবাইয়ানদের জন্য নয়, বিদেশিদের জন্য। এবং এর সবচেয়ে বড় উৎস দুবাইয়ের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি। অত্যন্ত সাদামাটাভাবে এর সূচনা হয় ১৯৩৭ সালে যখন এম্পায়ার এয়ারলাইন্স-এর ১০/১২ সিটের একটি ছোট্ট বিমান অবতরণ করে ছোট্ট দুবাই এয়ারপোর্টে। তখন ওইগুলোকে বলত ফ্লাইয়িংবোট। বর্তমানে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ৪টা বিশাল বিশাল টার্মিন্যাল আছে। সেখানে ১২০টি এয়ারলাইন্স উঠানামা করে এবং বিশ্বের ২৬০টি গন্তব্যে যায়। তার মাঝে দুবাইয়ের ফ্ল্যাগ ক্যারিয়ার এমিরেটস এয়ারলাইন্স অন্যতম। আজকাল দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বছরে ৫ কোটি যাত্রী যাতায়াত করে। ২০২০ সালে, ১০ কোটি যাত্রীর আনাগোনা এবং ৪০ লক্ষ টন কার্গো ওঠানামার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন। টার্গেট হিট করতে পারলে ৪ বছর পরে দুবাইয়ের জাতীয় আয়ের ১/৩ আসবে শুধু এভিয়েশন খাত থেকে। দুবাইয়ের সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে। সারা দুনিয়ার ২/৩ জনগোষ্ঠীর বসবাস দুবাই থেকে মাত্র ৮ উড্ডয়নঘন্টা দূরে।
সবশেষে আমার আরেকটি পর্যবেক্ষণের কথা বলেই আজকের মত শেষ করব। বর্তমানে দুবাইয়ে মাঝারি এবং বড় আকারের ৪ শ’ হোটেল রয়েছে। শুনেছি, এক্সপো ২০২০ কে সামনে রেখে তাঁরা আরো ৭ শ’ হোটেল বানাচ্ছেন। এ ছাড়া দুবাইয়ে রয়েছে শত শত হাইরাইজ বিল্ডিং। এবার আসি আসল কথায়। স্থানীয় কয়েকজন বন্ধু অর্থনীতিবিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, দুবাইয়ের প্রথম ও প্রধান আকর্ষণ – র্বুজ খলিফাসহ প্রায় সব ক’টি বড় বড় দালানের প্রায় অর্ধেক খালি পড়ে আছে। আশ্চর্যের বিষয় এমতাবস্থায়ও দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেটের ভাড়া কিংবা দাম কিছুই কমছে ন! বরং আরো নতুন নতুন দালানকোঠা আস্তে আস্তে মাটি ফেঁড়ে উপরের দিকে উঠছে। কোন অর্থনীতির তত্ত্ববলে এমন হচ্ছে, অনেক ভেবেচিন্তেও আমি তার হদিস পাইনি। না পেয়ে আমার কিছু চৌকশ বন্ধু অর্থনীতিবিদের কাছে আমি সবিনয়ে একটি প্রশ্ন রেখেছিলাম, দুবাই-অর্থনীতির রহস্যটা কী? আমার প্রশ্ন পেয়ে সবাই নিরব ছিলেন। মাত্র একজন অস্ট্রেলিয়া থেকে উত্তর দিল। সে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট বন্ধু। (লেখাটি ঢাকার একটি বাংলা কাগজে ছাপা হতে পারে, তাই বিষয়টি সে কীভাবে নেবে নিশ্চিত নই। এ জন্য এখানে তাঁর নামটা উহ্য রাখলাম।) সে কী বলেছে, শুনলে আপনারা অবাক হবেন কিনা জানি না, তবে একটু থম্কে গিয়ে অন্যভাবে ভাববেন বলেই মনে হয়? বন্ধুটি লিখেছে,
ÔÔSalaam Br. I don’t have an answer either. But here we may find a clue.
One day, Angel Gabriel visited Prophet SAW towards the end of his career in the shape of a man and asked the Prophet among many questions, about the signs of the last days (Akheri Zamana). Among the signs, the Prophet (SAW) said, “those who were barefoot naked needy herdsman, shall build buildings ever higher and higher.” Source: Martin Lings (2006), Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources, p. 347, second US edition by Inner Traditions.
অধ্যাপক: টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর: জার্নাল অব ডেভোলপিং এরিয়াজ;
ইমেল: wahid2569@gmail.com