‘আমার চোখের পানির দাম নাই’

এই শিশুটি ছবিতেই খুঁজছে বাবাকেবয়স হলে চোখের পানি কি শুকাতে থাকে? আমি জানি না অন্য কারও হয় কি না। কিন্তু আমার হয়।

গত ৩০ আগস্ট মৌলিক অধিকার রক্ষা কমিটি গুমের শিকার মানুষদের স্বজনদের নিয়ে একটি বিশাল অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে তাঁরা একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিচ্ছেন। শুনে চোখের পানি ধরে রাখা অসম্ভব। তাকিয়ে দেখি, ড. কামাল হোসেনের দুচোখভরা পানি। যতবার তাকাই, দেখি চোখে অশ্র“ তাঁর। আমার তবু চোখে পানি আসে না। শুধু রাগে-দুঃখে শরীর গনগনে হয়ে ওঠে। এত সস্তা মানুষের জীবন, এত অবলীলায় প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে উধাও করে দেওয়া যায় এ দেশে?
মঞ্চে একসময় মাইকের সামনে আসে চৌধুরী আলমের ছোট মেয়ে। বিএনপির এই নগর কমিটির নেতাকে দিয়েই আওয়ামী লীগের আমলে হাইপ্রোফাইল গুমের শুরু, আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে। চৌধুরী আলমের পরিবার এরপর বহু জায়গায় ঘুরেছে, চৌধুরী আলম কিংবা তাঁর মৃতদেহ খুঁজেছে, আর বারবার হয়রানির শিকার হয়েছে। সামান্য আশ্বাস আগে পেত, কখনো বা
খোঁজখবর নিত কেউ কেউ। এখন কোনো আশ্বাস নেই, তাদের খোঁজও নেয় না কেউ! চৌধুরী আলমের ছোট মেয়ে এসব বলতে বলতে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই বোঝে, লাভ নেই এই কান্নায়! একসময় ভেঙেচুরে যায় তার অসহায় কণ্ঠ: ‘আমার চোখের পানির দাম নেই।’

কান্নাকাটি করে কিছু হবে না। কেউ ফিরিয়ে দেবে না তার বাবাকে! এই কিশোরী এখনি জেনে গেছে তা। কান্নায় ভাঙচুর মুখে আরও কিছু কথা বলে সে। কিছু বোঝা যায়, কিছু কান্নায় দ্রবীভূত হয়ে যায়। আমার কানে শুধু অবিনশ্বর হয়ে থাকে একটি বাক্য। ‘আমার চোখের পানির দাম নেই।’ মূল্যহীন চোখের জলে একসময় ভেসে যায় আমারও দুচোখ।
প্রথম আলো তার পরদিন শিরোনাম করেছে: ‘তারা কাঁদলেন, কাঁদালেন!’ হ্যাঁ, সেদিন আমার সবাই কেঁদেছি সেখানে। অবাক হয়ে এ-ও লক্ষ করেছি, কিছু মানুষ তাঁর স্বজনের হত্যাকাণ্ড বা গুমের বিচার পর্যন্ত চাইছেন না। তাঁরা শুধু জানতে চাইছেন, মেরে ফেলা হলে কোথায় পুঁতে (লক্ষ করুন, কবর নয়, একাত্তরের মতো পুঁতে রাখার জায়গা!) রাখা হয়েছে তাঁদের বাবা বা সন্তানকে! পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে শুধু দোয়া পড়তে চান তাঁরা! শুধু এটুকুর জন্য তাঁদের হৃদয়ছোঁয়া আকুতি জানাতে হচ্ছে দেশের সবচেয়ে পরাক্রমশালী মানুষটির কাছে!

আমি জানি, আওয়ামী লীগের অনুগতরা এটুকু পড়ে ভাবতে শুরু করেছেন, বিএনপির আমলে কি হত্যাকাণ্ড হয়নি? তখন গুম হয়নি? হ্যাঁ হয়েছে! হয়েছে বলেই তার তীব্র নিন্দা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। আওয়ামী লীগ তখন বহুবার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল র‌্যাবকে বিলুপ্ত করার ও হত্যাকাণ্ডের বিচার করার। দলটির নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার।
এবারের নির্বাচনে এসব প্রতিশ্র“তির ধারেকাছেও আর যায়নি আওয়ামী লীগ। বরং নির্বাচনের মাধ্যমে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার যে অধিকার ছিল বাংলাদেশের মানুষের, তা এড়িয়েছে ৫ জানুয়ারির বিদঘুটে নাটক সাজিয়ে। এই নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য ঘটেছে অনেক গুমের ঘটনা, হয়তো ঘটবে আরও। সমালোচনার মুখে র‌্যাব সাময়িক বিরতি দিলে উদ্যোগী করা হবে হয়তো অন্য কোনো বাহিনীকে।

দুই.
র‌্যাব এখন কিছুটা নিরস্ত। পুলিশকে দিয়ে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল কাজ। পুলিশের তাতে হয়েছে পোয়াবারো। সন্ত্রাসীর সাহস বেড়েছে কয়েক গুণ। গুম কমেছে, বেড়েছে খুন। নদীতে ভেসে এসেছে লাশের পর লাশ! কার লাশ, কোথাকার লাশ, জানার উপায় নেই কারও।

এসব দেখে অতিষ্ঠ হয়ে আমাদেরই কেউ কেউ একদিন বলবেন, র‌্যাব সক্রিয় থাকলে এত খারাপ হতো না পরিস্থিতি। র‌্যাবের কর্তাব্যক্তিরা জানেন এসব। সে সময় আসা পর্যন্ত তাঁরা তাই বলে চুপচাপ বসে থাকেন না। বাঘা বাঘা জঙ্গি গ্রেপ্তার করেন! সারা দেশে বনজঙ্গল চষে ফেলে তাঁরা উদ্ধার করেন মারাত্মক সব অস্ত্রশস্ত্র! একবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে, এবার ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিবের সফরের ঠিক আগের দিন।
এ দেশে এমন রহস্যময় ঘটনাই ঘটছে। এবার অবশ্য কিছু বেরসিক পত্রিকা প্রশ্ন তুলেছে র‌্যাবের অস্ত্র উদ্ধারের সত্যতা নিয়ে। কেউ কিছু টের পেল না, কোথাও কোনো উদ্ধার অভিযানের আলামত নেই, কীভাবে হঠাৎ এত অস্ত্র উদ্ধার হলো দেশে! আর ভারতের কর্তাব্যক্তিদের সফরের আগে আগেই কেন বারবার অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে?

র‌্যাবের অবশ্য ভয় নেই। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না তাদের। এমনকি এসব প্রশ্ন শুনতেও হবে না ভবিষ্যতে আর। কারণ, এসব নিয়ে কথা বলার ক্ষমতা বেশি দিন থাকবে না গণমাধ্যমের। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, সম্প্রচার নীতিমালা, মানহানি আর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অভিনব সম্প্রসারণ আরও বেশি কণ্ঠরুদ্ধ করবে গণমাধ্যমের। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে র‌্যাবের কর্তারা ধরা পড়েছেন, র‌্যাবের সে ভয়ও কাটবে দ্রুত। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর তিরস্কার শুনেছেন হাইকোর্ট, অভিশংসনের

ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শাসিত সংসদের হাতে চলে এলে তিরস্কারের প্রয়োজনও ফুরাবে।
এরপর এমন এক সময় আসবে, হয়তো দেশে খুন বা গুম হলে জানতে পারব না আমরা। জানলে র‌্যাব, পুলিশ বা সরকারের ভাষ্য প্রচার করতে হবে গণমাধ্যমে। বেছে বেছে টক শোর এমন আলোচক আনা হবে, যাঁরা সম্প্রচার নীতিমালা অনুসারে ‘অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক’ কিছু না বলে সরকারের ভাষ্যের পুনরাবৃত্তি করবেন। আরও চালাকেরা বিএনপি আমলের তুলনায় এসব ঘটনা কম ঘটছে, এটি বারবার বলবেন। গুমের বড় ধরনের ঘটনা ঘটলে বিশাল অস্ত্র উদ্ধার বা ভয়াবহ জঙ্গি গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটবে, সন্ত্রাস দমনে ‘আঞ্চলিক’ সহযোগিতা জোরদারের জন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ‘দ্বিপক্ষীয়’ আলোচনা জোরদার হবে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের সাফল্যের প্রবল প্রচারণায় তলিয়ে যাবে গুম বা খুনের খবর।
গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা এখন ঘরের বাইরে এসে চোখের পানি ফেলছেন। তখন হয়তো তাঁদের চোখের পানি ফেলতে হবে লুকিয়ে। যে পানির দাম নেই, তা দেশের ও নেত্রীর ইমেজের জন্য ক্ষতিকর! এমন ক্ষতি না করতে দিতে মরিয়া হয়ে থাকবে রাষ্ট্রযন্ত্র!

তিন.
সম্প্রচার নীতিমালা অনুসারে বিভ্রান্তিকর ও দেশের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর অনেক কিছু হয়তো বলা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এবার একটু দেশের ইমেজের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলি।
আমার ধারণা, র‌্যাব বা পুলিশের মধ্যে যাঁরা গুম বা খুনের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন যে এ জন্য কোনো দিন তাঁদের বিচার হবে না। র‌্যাব বা পুলিশের ‘সুপারস্টার’ কর্মকর্তারা হয়তো এ-ও ভাবেন যে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির আশঙ্কা সৃষ্টি হলে নিরাপদে মালয়েশিয়া, দুবাই কিংবা কিরিবাতি আইল্যান্ডে গিয়ে আয়েশে বাকি জীবন কাটানোর সামর্থ্য তাঁদের আছে। কাজেই তাঁদের চিন্তার কারণ নেই। আমি তাঁদের বলি, আপনাদের চিন্তার কারণ আছে।

বাংলাদেশ সাড়ে চার বছর আগে (২৩ মার্চ, ২০১০) রোম স্ট্যাটিউট অনুসমর্থন করেছে। এই অনুসমর্থনের মানে হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত করতে পারবেন। তবে যারা বিচার চাইবে, তাদের আগে প্রমাণ করতে হবে যে এই বিচার করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নেই।
রোম স্ট্যাটিউট অনুসারে সিস্টেমেটিক (পরিকল্পিত ব্যবস্থাধীন) ও ওয়াইডস্প্রেড (ব্যাপক) খুন বা গুম মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের সংখ্যা অবশ্যই ব্যাপক। এটি যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের (যেমন: কোনো বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠান বা বিরোধী মহলকে দমানো) জন্য করা হয়, তাহলে তা সিস্টেমেটিক অপরাধ বলা যাবে। গুম বা খুনের অসংখ্য অভিযোগের বিচার যদি বছরের পর বছর না হয় (বিশেষ করে পুলিশ যদি মামলা গ্রহণেই অস্বীকৃতি জানায়), তাহলে রাষ্ট্র এর বিচার করতে অসমর্থ বা অনিচ্ছুক, তা প্রমাণ করাও কষ্টসাধ্য হবে না।
বিচার কখনো হবে না, এই আত্মবিশ্বাসে যারা গুম বা খুন করে, তাদের সাবধান হওয়ার সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে এসব অপরাধের বিচার হলে তা সংশ্লিষ্ট দেশটির জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর ইমেজ বয়ে আনে। আমাদের সতর্কবাণী সে কারণেই।

চার.
গুমের শিকার একটি পরিবারের চোখের পানির দাম হয়তো নেই। কিন্তু এমন অসংখ্য চোখের পানি এক হলে সেই স্রোতে ভেসে যায় সবচেয়ে নির্মম শাসকগোষ্ঠীও। দেশে না হলেও আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয় সেনানায়ক, গোয়েন্দাপ্রধান এমনকি সরকারপ্রধানের। আমাদের বর্তমান সময়েই ঘটছে এসব।
চূড়ান্ত বিচারে কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। এই ইহকালে বিভিন্নভাবে বিচার হয়েছে অসংখ্য পরাক্রমশালী মানুষের। কখনো দেশের মানুষের আদালতে, কখনো সৃষ্টিকর্তার অপঘাতে, কখনো আন্তর্জাতিক বিবেকের মানদণ্ডে।

আমাদের পরাক্রমশালীরা কত দিন অবজ্ঞা করতে পারবেন এসব বাস্তবতা!
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

You Might Also Like