আমার এক শিক্ষক এবং পিতৃতুল্য শিক্ষকেরা

সাম্প্রতিককালে, প্রত্যেক সপ্তাহের বুধবার নয়া দিগন্তেআমার কলাম বের হয়। সুতরাং তিন দিন বা দুই দিন বা অন্ততপে পত্রিকা মুদ্রিত হওয়ার ৩৬ ঘণ্টা আগে লিখিত কলামটি পত্রিকা অফিসে পৌঁছাতে হয়। সাধারণত আমি কম্পিউটারের সামনে বসে ডিকটেশন দিই অথবা দূরে থাকলে মোবাইল ফোনে ডিকটেশন দিই। আমার দীর্ঘ দিনের গবেষণা সহকারী ও সহকর্মী রাব্বুল ইসলাম খান শ্র“তিলিখনের মতোই শ্র“তি কম্পোজ করে ফেলেন। একটা কলাম লিখতে কোনো দিন চার ঘণ্টা লাগে, কোনো দিন ছয় ঘণ্টা লাগে, কোনো দিন এক ঘণ্টা লাগে। অর্থাৎ বিষয়বস্তুর গভীরতার ওপর নির্ভর করে কলামের জন্য সময় ব্যয় করতে হয়। বিষয়বস্তুর অভাব কোনো দিনই হয়নি। বরং পাঠক-সমাজের কাছ থেকে যত বিষয় লেখার জন্য অনুরোধ বা প্রস্তাব পাই, তার দশ ভাগের এক ভাগকেও উপস্থাপনের সুযোগ হয় না। তবে আজকে লিখব একটি ব্যতিক্রমী বিষয় নিয়ে। আমার তথা আমাদের একজন মরহুম শিককে নিয়ে। ওই মরহুম শিকের নাম আব্দুর রহমান ভূঁইয়া, সংেেপ তাকে আমরা এ আর ভূঁইয়া নামে জানতাম। পরিণত বয়সের অবসর জীবনে লেখালেখির সময় তিনি নিজেকে মুহসিন আব্দুর রহমান নামে পরিচিত করে তুলেছিলেন। তিনি আমার এবং আমাদের অত্যন্ত প্রিয় শিক ছিলেন। সব শিকই প্রিয় ছিলেন; কিন্তু অতি স্বাভাবিক মানবীয় প্রবণতায়, কোনো না কোনো ব্যক্তিত্ব অধিকতর প্রিয় হয়ে ওঠেন নিজ নিজ গুণে বা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে। জনাব মুহসিন আব্দুর রহমানের সাথে আমার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ প্রায়ই হতো। সর্বশেষ হয়েছে মাস দুয়েক আগে। ঢাকা মহানগরের একটি হাসপাতালে ৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখের জোহরের নামাজের জামাতের কিছু পরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একই দিন সন্ধায়, বনানী সামরিক কবরস্থানে, তারই মরহুম জ্যেষ্ঠ ছেলে সাবেক বাংলাদেশ নৌবাহিনী লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ইনামুস সালামের কবরেই তাকে দাফন করা হয়।
ঢাকা মহানগর থেকে প্রকাশিত একটি বিশেষায়িত ইংরেজিত পত্রিকার নাম দি ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস। ওই পত্রিকায় মঙ্গলবার ৮ এপ্রিল ২০১৪ তারিখের সংখ্যায় ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় একটি কলাম বা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড রাজ্যের (স্টেইট) ককেইসভিল নামক স্থানে বসবাসরত, ক্যাডেট কলেজের একজন সাবেক ছাত্র, যার নাম মাসউদ আলম খান, ওই নিবন্ধটি লিখেছেন। মঙ্গলবারের আগের দিন সোমবার দিবাগত রাত্রি ১১:৫০ মিনিটে আমার ফেসবুকে আমি অন্যের দেয়া স্ট্যাটাস পেয়েছিলাম এই কলাম সম্পর্কে। সাথে সাথে পড়ে ফেলেছিলাম। পরদিন আমার ফেসবুকের নিজের টাইমলাইনে সেটা কপিও করেছি, লিংকও দিয়েছি। সাথে একটি অনুরোধ করেছিলাম যে, যদি বলায় বা লেখায় পরিশীলিত রসবোধ আছে এমন কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যিনি অনুবাদ কর্মে ভালো, তিনি মাসউদ আলম খানের কলামটিকে অনুবাদ করে ফেসবুকে দেন তাহলে আমরা সবাই উপকৃত হবো। আমার এ কলামের মূল প্রতিপাদ্য আমার এবং আমাদের শ্রদ্ধেয় শিকদের প্রতি সম্মান প্রদান, শিকতা পেশার প্রতি সম্মান প্রদান।

২০১১ সালের ফেব্র“য়ারির বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল আমার নিজের লেখা বা সম্পাদিত ১১তম বই যার নাম ‘মিশ্রকথন’। প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা দীর্ঘ ওই গ্রন্থে দ্বিতীয় অধ্যায়ের নামই হচ্ছে ‘জীবনের ভিত্তি ক্যাডেট কলেজ : অতঃপর বিশ্ববিদ্যায়’। পৃষ্ঠা নম্বর ৩৭ থেকে ৭৬ পর্যন্ত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের কথা বলা আছে। গ্রন্থটি এমএসওয়ার্ড ভার্সনে আমার ব্যক্তিগত বা নিজস্ব ওয়েব সাইটে সকলে পড়ার জন্য উন্মুক্ত আছে। কথাটি বললাম এ জন্য যে, ক্যাডেট কলেজের কথা ব্যতীত কোনো ক্যাডেটের সফল জীবনের গল্প ভারসাম্যপূর্ণ হবে না বলে আমি মনে করি।

এখন ক্যাডেট কলেজের শিকগণের চাকরি প্রাপ্তির প্রক্রিয়া, বেতনভাতা প্রদান, বাসাবাড়ি প্রদান, অবসর জীবনের সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি অনেকটা আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে সুনিয়ন্ত্রিত। চট্টগ্রাম মহানগরে, চট্টগ্রাম বন্দরের সন্নিকটে, চট্টগ্রাম বন্দর উত্তর আবাসিক এলাকা বা পোর্ট নর্থ কলোনিতে আমার বাবা সপরিবারে থাকতেন। ওই আবাসিক এলাকার ভেতরেই অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করি এবং এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর হাই স্কুলে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর প্রথম ছয় মাস পড়ি। পরীার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে অষ্টম শ্রেণী পরিত্যাগ করে, ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই তারিখে আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে প্রবেশ করি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে। ওই আমলে শিকদের জন্য এত কিছু বিধিবিধান স্পষ্ট ছিল না। একটা জিনিস স্পষ্ট ছিল, ক্যাডেট কলেজে শিক হওয়া সম্মান এবং গৌরবের বিষয় এবং যারা শিক হতেন তারা নিজ আগ্রহেই শিক হতেন, সব ধরনের অসুবিধার কথা জেনেই। ক্যাডেট কলেজের ছাত্রত্ব যেমন আবাসিক, তেমনই শিকগণও আবাসিক। ফৌজদারহাটে দেখেছিলাম সব শিকই বাসা পেতেন। এখনো বাসা পান, ব্যাচেলর হলে সবাই মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মেস করে থাকতে হয়। ছাত্রদের যেমন দৈনন্দিন জীবন সকালবেলা সাড়ে পাঁচটা থেকে পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত এবং বর্ণিত, তেমনই শিকদের দৈনন্দিন জীবনও। শিকগণের ভূমিকা তিন আঙ্গিকে ক্যাডেটদের জীবনকে স্পর্শ করত। প্রথম আঙ্গিক হলো সকালবেলা এবং সন্ধ্যার পর শ্রেণিক,ে দ্বিতীয় আঙ্গিক হলো সপ্তাহের নিয়মিত দিনে বিকেলবেলা বা ছুটির দিনগুলোতে খেলার মাঠে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং তৃতীয় আঙ্গিক হলো আবাসিক ভবন বা হাউজগুলোতে শুধু হাউজ মাস্টার ও হাউজ টিউটরদের প্রসঙ্গে। কোনো কোনো শিক সব আঙ্গিকেই জড়িত থাকতেন।

শ্রেণিকে বসে পড়াশোনা করা বা মনোযোগসহকারে শিকের পাঠদান অনুসরণ করা একটি কঠিন কাজ। কিশোর বয়সে আমরা দু’টি কাজ একসাথে করতাম। প্রথম কাজ হলো, প্রকাশ্যে মনোযোগ দেয়ার ভান করা এবং দ্বিতীয় কাজ হলো অপ্রকাশ্যে পারস্পরিক দুষ্টামি করা; কিন্তু ক্যাডেট কলেজের স্যারেরা আমাদের মতো কিশোরদের মনোভাব অতি শিগগিরই বুঝে ফেলতে পারতেন। অতঃপর কিশোর মনকে লেখাপড়ামুখী করার জন্য যা যা করণীয় তাই করতেন। এ কাজ অতি সুন্দরভাবে করতেন জনাব আব্দুর রহমান ভূঁইয়া। আমাদের আমলে, আমাদের ক্যাডেট কলেজে দু’জন শিক ছিলেন যাদের নামের শেষে ছিল উপাধি ‘ভূঁইয়া’। একজনের নাম ছিল আব্দুল কুদ্দুস ভূঁইয়া যিনি আংশিকভাবে ছিলেন কলেজের সদর দফতরে ‘বার্সার’ বা হিসাব বিভাগের প্রধান এবং আংশিকভাবে ছিলেন শিক। আরেকজন ছিলেন জনাব আব্দুর রহমান ভূঁইয়া। জনাব আব্দুল কুদ্দুস ভূঁইয়াকে ছাত্ররা দুষ্টামি করে নিজেদের মধ্যে একটি ডাকনামে অভিহিত করত এবং জনাব আব্দুর রহমান ভূঁইয়াকে ‘আর্ট ভূঁইয়া’ নামে অভিহিত করত। আর্ট ভূঁইয়া বলার অর্থ হলো, তিনি আমাদের কলেজের আর্ট শিক ছিলেন। তিনি আর্টিস্ট বা শিল্পী হিসেবে দারুণ ছিলেন। রসকসবিহীন ছাত্রদেরও আর্টের দিকে মনোযোগী করার জন্য উনার কৌশলী স্নেহময়ী ভূমিকা যথেষ্ট ছিল; কিন্তু আর্টের শিক হলেও, তিনি আংশিকভাবে আমাদের বাংলা শিকও ছিলেন। ওই আমলে যেমন এই আমলেও, ফৌজদারহাটে চারটি আবাসিক ভবন আছে। তখনকার আমলে তিনটি হাউজের নাম ছিল তিনজন মোগল সম্রাটের নামে যথা বাবর হাউজ, আকবর হাউজ ও শাহজাহান হাউজ এবং চতুর্থটির নাম ছিল ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে যার স্বপ্ন ও অবদান জড়িত ছিল সেই প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নামে, আইয়ুব হাউজ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর হাউজের নামগুলো বদলে গেছে। আমাদের প্রিয় স্যার ‘আর্ট ভূঁইয়া’ একটি হাউজের হাউজ টিউটর ছিলেন, পরে হাউজ মাস্টার হয়েছিলেন। আমরা চলে আসার পর ক্রমান্বয়ে জ্যেষ্ঠ হতে হতে তিনি দীর্ঘ দিন হাউজ মাস্টার ছিলেন।

প্রিয় স্যার আর্ট ভূঁইয়া বাংলার শিক হিসেবে অত্যন্ত সফল ছিলেন। নিচের তলার ১৭ নম্বর রুমে অথবা ফিজিক্স গ্যালারিতে অথবা দোতলায় কেমিস্ট্রি গ্যালারিতে যখন উনি পুরো কাসের জন্য বাংলা কাস নিতেন, তখন তিনি আমাদেরকে বিখ্যাত উপন্যাস গল্প বা উপন্যাস পড়ে শোনাতেন অতঃপর ওগুলোর ওপর আলোচনা করাতেন। শরৎচন্দ্রের একাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস যেখানে কিশোরদের ভূমিকা আছে, ওই রূপ উপন্যাস তিনি আমাদের পড়ে পড়ে শুনিয়েছেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা ছোটগল্পও পড়ে পড়ে শোনাতেন। ছয় বছরে, কত দিন যে তিনি পড়েছেন সেটা আর আমাদের এখন মনে নেই। তার পড়ার স্টাইলটাও ছিল দারুণ হৃদয়গ্রাহী। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে নজর রাখতেন আমরা কী করছি এবং কেউ দুষ্টামিতে মন দিলে তখনই তিনি ধরে ফেলতেন। ছয় বছরে কোনো দিন কাসের কাউকে কঠোরভাবে বকা দেননি; কিন্তু ভুলত্র“টি ঠিকই সংশোধন করে দিয়েছেন। খেলার মাঠে অংশ নিয়েছেন। হাউজ টিমের পে উৎসাহ দিয়েছেন। ফুলের বাগান করিয়েছেন। সন্ধ্যার পরে প্রিপারেশন কাস (সংেেপ প্রেপ কাস) চলার সময় ঘুরে যেতেন। পরীার আগের রাত্রিগুলোতে ঘুরে ঘুরে সাহস জোগাতেন। হাউজের হস্তলিখিত ওয়াল ম্যাগাজিন করিয়েছেন, ডিবেইটিং শিখিয়েছেন, আরো যে কত কিছু করিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়েছি, এখন ২০১৪ সালে সব কিছু হুবহু মনে নেই।

চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে তিনি যখন পাস করেন, তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন তাদের প্রত্যে শিক। আব্দুর রহমান ভূঁইয়া নিজ ব্যাচে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। স্যারের লেখা বই হঠাৎ কতিপয়-এর ১৬০ নম্বর পৃষ্ঠায় স্যার নিজেই তার অনেক বন্ধুর নাম লিখেছেন : শিল্পীবৃন্দ আমিনুল ইসলাম, কাইউম চৌধুরী, মুর্তুজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, বাসেত, রাজ্জাক, জাহ্ঙ্গাীর, বিজন, ইমদাদ, নিতুন কুণ্ডু, হামিদুর রহমান, সাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, কণ্ঠশিল্পী আলতাফ মাহমুদ..। আর্টের শিক বলেই হোক বা যেকোনো কারণেই হোক, আমাদের প্রিয় শিক জনাব মুহসিন আব্দুর রহমানের হাতের লেখা বা হস্তার অতি সুন্দর ছিল। আমার লেখা এগারোতম বই ‘মিশ্র কথন’ প্রকাশের পর, তাকে শ্রদ্ধার সাথে একটা কপি উপহার দিয়েছিলাম। তিনি পড়ে আমাকে এক পৃষ্ঠার চিঠি লিখেছিলেন। এ-৪ সাইজের সাদা কাগজে এক পৃষ্ঠা পুরো এবং পরের পৃষ্ঠায় কয়েক লাইন। ইনভেলাপ খোলার পর প্রথম দর্শনে আমি মনে করেছিলাম এটা ছাপাখানা থেকে মুদ্রিত একটা পৃষ্ঠা। পরে গভীর মনোযোগের পর নিশ্চিত হলাম এটা হাতে লেখা। এত সুন্দর হাতে লেখা আজ অবধি আমার জীবনে আমি কোথাও দেখিনি। ওই পত্রের সাথেই তিনি আমাকে তার নিজের লেখা বইয়ের একটি কপি উপহারস্বরূপ পাঠান, বইয়ের নাম ‘নিরানব্বইতে এক শ আট’। এই বইয়ের বক্তব্য বা আলোচনায় কিছু পরিবর্তন করে, বইটির নামও বদলিয়ে, এপ্রিল ২০১৪-তে অথাৎ অতি সম্প্রতি আবার নতুন বই হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছেÑ নাম ছাইভস্ম। আমি বইটি পড়েছি। অনেক প্রিয় এবং অপ্রিয় স্মৃতি এবং প্রিয় বা অপ্রিয় বিষয়ে মতামত সাবলীল হৃদয়গ্রাহী ভাষায় এই আত্মজীবনীমূলক বইয়ে তিনি উপস্থাপন করেন। সামাজিক ও পরোভাবে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিষয়ে তার পর্যবেণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। জনাব রহমানের দ্বিতীয় বই, বইয়ের নাম হঠাৎ কতিপয়। এটাও আত্মজীবনীমূলক; কিন্তু অনেক বৃহৎ পরিসরে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, অন্যান্য ক্যাডেট কলেজ, ফৌজদারহাট ক্যডেট কলেজ, ক্যাডেট কলেজের শিাব্যবস্থা এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এই পুস্তকে আছে। এক দিকে বইটি পড়ার সময় আমি একটি পৃষ্ঠায় একটি মন্তব্য লিখেছিলামÑ ‘বইয়ের একটি পৃষ্ঠা পড়ে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়, আরেকটি পৃষ্ঠা পড়ে অশ্র“ধারা সংবরণ করা যায় না!!!’ বইটিতে এত শিণীয় জিনিস আছে যে, সেটার ওপরে আরেকটি সম্পূর্ণ বই লেখা যায়।

বাবা হিসেবে সন্তানের লাশ কাঁধে নেয়ার মতো কষ্ট খুব কমই আছে। আমার বাবাকে দেখেছি, ১৯৮১ সালে আমার তিন বছরের ছোট ভাইটি মারা যাওয়ার সময় কেমন করেছেন। জনাব ভূঁইয়ার জীবদ্দশাতেই প্রথমে উনার স্ত্রী মারা যান, তার কিছু দিন পর তার কনিষ্ঠ সন্তান ‘মুইন’ মারা যান এবং তারও পরে উনার জ্যেষ্ঠ সন্তান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ‘ইনামুস সালাম’ মারা যান। তার মানসিক কষ্টের দিনে ‘হীরা’ নামের একজন উদ্যমী সাহসী মহিলা তাকে বিয়ে করেন। ম্যাডাম হীরা আমাদের স্যার থেকে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন; কিন্তু স্যারকে দারুণ পছন্দ করতেন। সংসারের বাইরে, আত্মীয়স্বজনের সাথে এবং হাজার হাজার ছাত্রের মধ্য থেকে যাদের সাথে সম্ভব, তাদের সাথে আমাদের স্যার যোগাযোগ রাখতেন, অনেকের সাথেই ম্যাডাম হীরাও কথা বলতেন। জনাব মুহসিন আব্দুর রহমান তার সব গুণমুগ্ধ ছাত্রকে এবং গুণমুগ্ধ আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাক্সীগণকে, শোকসাগরে ভাসিয়ে ৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে ৮২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। পিতৃতুল্য স্নেহ যিনি আমাদেরকে দিয়েছিলেন, বাবার জন্য যেমন তেমনই তার আত্মার মাগফিরাতের জন্যও আমরা দোয়া করি। বিগত শুক্রবার বাদ আসর, বনানীতে অবস্থিত ডিওএইচএসের কমিউনিটি সেন্টারে তার জন্য দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুরসংখ্যক সাবেক ছাত্র, উপস্থিত হয়ে তার জন্য দোয়ায় অংশীদার হয়েছেন।

আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছিল চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার উত্তর বুড়িশ্চর গ্রামে অবস্থিত রশিদিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে। ওই স্কুলের সব শিক ইন্তেকাল করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর প্রাইমারি স্কুলের সব শিক যাদেরকে আমি পেয়েছিলাম তারা ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর হাইস্কুলের শিক যাদেরকে আমি পেয়েছিলাম, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই ইন্তেকাল করেছেন। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রিন্সিপ্যাল কর্নেল মরিস ব্রাউন, আমার প্রথম হাউজ মাস্টার ডক্টর বদরুল মিল্লাত, অঙ্কের স্যার জনাব আব্দুল মান্নান, অর্থনীতির স্যার জনাব জাকের উল্লাহ, ভূগোলের স্যার জনাব আবুল কাশেম, ইংরেজির স্যার জনাব সলিমুল্লাহ, কেমিস্ট্রির স্যার জনাব কাজী আজিজুর রহমান এবং আরো কয়েকজন ইন্তেকাল করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অনার্স বিষয় ছিল ‘অর্থনীতি’ এবং সাবসিডিয়ারি ছিল ‘পলিটিক্যাল সায়েন্স’ ও ‘হিস্ট্রি’। আমি ছিলাম তৎকালীন জিন্না হল (বর্তমানে সূূর্যসেন হল) এর আবাসিক ছাত্র। এসব বিষয়ে যারা আমার প্রত্য শিক ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ ১৯৭১ সালে শত্র“র হাতে শহীদ হয়েছেন। অন্য কেউ পরে স্বাভাবিক সময়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কয়েকজন বেঁচে আছেন। যেসব শিক ইন্তেকাল করেছেন, তাদের কথা অবশ্যই ভোলা যায় না। যারা এখনো জীবিত তাদের কথা এই কলামে লিখছি না; কিন্তু অন্তর হতে নির্গত অবিরত শ্রদ্ধা নীরবেই বহমান।

আমার সেনাবাহিনীর চাকরি জীবনে আমি দুই কিস্তিতে শিকতা করেছি। মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত সামরিক বাহিনীর ‘স্টাফ কলেজে’ ১৯৮৪-৮৬ সালে, মোট ৩৬ মাসে, তিনটি বছরের তিনটি ব্যাচ আমি পেয়েছিলাম। স্টাফ কলেজের প্রশিকদের ‘ডাইরেক্টিং স্টাফ’ বা ডিএস বলা হয়। ছাত্ররা ডিএস অরগুলোর কৌতুক-অর্থ করে বলত ‘দরিদ্র শিক’। স্টাফ কলেজে ডিএসগণ, পিতৃতুল্য নয়, জ্যেষ্ঠ সহকর্মী, বন্ধু। মে ১৯৯৩ থেকে ডিসেম্বর ১৯৯৫ দুই বছর সাত মাস আমি চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ছিলাম। কমান্ড্যান্ট শব্দের হুবহু বাংলা প্রতিশব্দ নেই, নিকটতম বাংলা প্রতিশব্দ আবাসিক অধ্য। ২৮ বিএমএ লং কোর্স থেকে ৩৬ বিএমএ লং কোর্সের ক্যাডেটরা আমার ছাত্র ছিলেন, কেউ পূর্ণ সময় দুই বছর অথবা কেউ আংশিক সময়। ভাটিয়ারিতে কমান্ড্যান্ট পিতৃতুল্য। আমার ছাত্ররা যখন তাদের পেশাগত জীবনে উন্নতি পায়, তখন মনের ভেতরে ও বাইরে আনন্দিত হই। আমাদের শিকেরাও আমাদের পেশাগত উন্নতিতে সব সময় খুশি হতেন। মুহসিন আব্দুর রহমান সেটি সুন্দরভাবে প্রকাশও করতেন। ৪ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে আমরা বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ঘোষণা করার কয়েক দিন পর, স্যার আমাকে ফোন করেছিলেন। অনেক কথার মধ্যে তিনি বললেন : ‘ইবরাহিম, কবি কুসুম কুমারী দেবীর নাম শুনেছ?’ আমি বলেছিলাম না, শুনলেও মনে নেই। তখন স্যার বললেন, ‘এখন নামও মনে রাখবা এবং লাইনগুলোও মনে রাখবা… আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ স্যার শেষ করছিলেন এই বলে, ‘রাজনীতি যখন করো তখন কথাও বলতে হবে নিশ্চই; কিন্তু কাজেও যেন বড় হও সে দোয়া করি’।

শিকমাত্রই সাধারণত পিতৃতুল্য। ১৯৬২ সালে জুলাইতে যখন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে যোগদান করি, তখন আমার বয়স ১২ বছর ৯ মাস ৩ দিন। ওই দিন যারা একাদশ বা দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়তেন তাদের বয়স ১৬-১৭ বছর ছিল। আমাদের অনেক শিকেরই বয়স তখন ৩০ বছরের নিচে, অনেকেই সদ্য বিবাহিত। তার পরও তারা একবিংশ শব্দাতীতে পৃথিবীর অন্যত্র তো বটেই, বাংলাদেশেও এই নীতিবাক্যটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। শিকের বয়স বড় কথা নয়, শিকের আন্তরিকতা ও মানসিকতাই বড় কথা। এ প্রসঙ্গে জনাব মুহসিন আব্দুর রহমান তার লেখা বই হঠাৎ কতিপয়-এর ১৭৭ নম্বর পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন, সেখান থেকে ৯টি লাইন আমি উদ্ধৃত করছি : ‘কলেজটা আবাসিক। নির্ধারিত দিনে নির্ধারিত সময় ছাড়া ক্যডেটদের মা-বাপ বা অভিভাবকদের সাথে দেখা করা নিষিদ্ধ। কাজেই একটা ছেলেকে দেখাশোনার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব এসে পড়ে শিকদের ওপর এবং এভাবেই ক্যডেট কলেজের শিকেরা পাঠদান ছাড়াও যুগপৎ মা-বাবার ভূমিকাও পালন করে থাকেন। আর এ জন্যই অন্যন্য শিাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিকের মধ্যে যে সাধারণ সম্পর্ক, তার চেয়েও অনেক গভীর, অনেক আন্তরিক ও আপনজনের সম্পর্ক ক্যডেট ও অধ্যাপকদের মধ্যে। তারা শুধু ছাত্র ও শিকই নন, একে অপরের পরম আত্মীয়বিশেষ। প্রাক্তন ছাত্রদের কাছে ক্যাডেট কলেজ যেমন র্তীর্থস্থানের মতোই, তেমনই এর অধ্যাপকেরা তাদের অন্তরে শ্রদ্ধার এক স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত।’

অনেক পত্রিকায় যেহেতু চোখ বুলাই, শিক সম্প্রদায়কে নিয়ে ভালো বা মন্দ সংবাদ অবশ্যই চোখে পড়তে থাকে। সব পেশার মান অবনতিশীল যদি হয়ও, শিকতা পেশার মান অবনতিশীল হতে দেয়া যাবে না। পাশ্চাত্য নয়, বরং এশীয় বা প্রাচ্য সভ্যতায় শিকতা এখনো পেশা হিসেবে সম্মানের স্থানে আছে। আমাদের সবাইকে চেষ্টা করতে হবে, এটা ধরে রাখতে। আমি যেহেতু রাজনীতি করি এবং আমার দলের স্লোগান যেহেতু ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’, সেহেতু আমি এই মর্মে সচেতন থাকতে অবশ্যই অঙ্গীকারবদ্ধ। এ কলামের মাধ্যমে সব শিকের প্রতি শ্রদ্ধা।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

You Might Also Like