আমাদের অর্জন কি আমরা ধরে রাখতে পারব?

ঈদের পর বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন বেগম জিয়া। ঈদের আগে বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে তিনি আন্দোলনের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরে সবাইকে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। তার এই আহ্বানে বারবারই জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, যেখানে বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হচ্ছে বাংলাদেশ কি এই অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে পারবে এখন? যখন বিরোধী দল আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে, সেখানে অগ্রগতির ধারা রক্ষিত হবে তো?
গত ২৪ জুলাই জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৪ সালের মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করেছে। বেশ কিছু বছর ধরে ইউএনডিপি এই সূচক প্রকাশ করে আসছে। এতে করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সেক্টরে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়। এবার মোট ১৮৭ দেশের অগ্রগতি আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২ নম্বরে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। জাতিসংঘ ‘দ্রুত এগিয়ে চলা’ যে ১৮ দেশের কথা উল্লেখ করেছিল বাংলাদেশ এর মধ্যে একটি। বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয় বাংলাদেশ তার অবস্থানকে আরো উন্নত করেছে। গেলবার (২০১৩) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৩। এবার এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে গড় আয়ু বৃদ্ধি, সাক্ষরতা, শিক্ষা ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। ইউএনডিপি নিজস্ব গবেষকদের দ্বারাই এই সূচক প্রণয়ন করে। এখানে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা থাকে না। অর্থাৎ সূচক প্রণয়নে বাংলাদেশ সরকারের কোনো ভূমিকা নেই।
সামগ্রিক বিচারে বিভিন্ন সোস্যাল সেক্টরে বাংলাদেশ যে অগ্রগতি সাধন করেছে, তা বিবেচনায় নিতে হবে।

কেননা রাজনৈতিক অস্থিরতা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এবং উপজেলা নির্বাচন নিয়ে সহিংসতার পরও বাংলাদেশ সোস্যাল সেক্টরে তার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। পরিসংখ্যানে দেখা যায় মানুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ বছর, জনপ্রতি গড়ে ৫ দশমিক ৮ বছরে শিক্ষাগ্রহণ, কিংবা মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ৭১৩ ডলারে উন্নীত হওয়া একটি বড় অগ্রগতির পরিচয় বহন করে।
নিঃসন্দেহে এই যে অগ্রগতি তা আমাদের আশার কথা বলে। কিন্তু আন্দোলনের যে ধ্বনি আমরা শুনতে পাচ্ছি তা আমাদের এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা এখন জানি না, বিএনপির আন্দোলনের ফলে পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেবে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে আমাদের মনে শঙ্কা আরো বেড়েছে। যেখানে বিএনপি আরো একটি নির্বাচনের কথা বলেছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, আগাম নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি পরোক্ষভাবে বিএনপির আন্দোলন প্রতিহতেরও ঘোষণা দিয়েছেন। বলেছেন বিএনপির আন্দোলন মাঠেই প্রতিহত করবে আওয়ামী লীগ। এর প্রতিধ্বনি করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও। বলেছেন, ‘দেখব কার কত হিম্মত আছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঠে থাকবে।’ এর আগে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সংকট নিরসনে আলোচনার আহ্বানে সাড়া না দিলে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ শুরু করা হবে।’ পরস্পরবিরোধী এই যে বক্তব্য, এই বক্তব্য আমাদের মনে একটা বড় ভয় ধরিয়ে দেয়-রাজনৈতিক সংকট বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশে-এ ধরনের একটি অভিমত দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সাময়িকী জেনস। জেনস সাময়িকীতে অতি সম্প্রতি বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জোরালো হবে বিরোধী আন্দোলন। এটা প্রত্যাশিত ছিল যে দুই পক্ষ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা সমঝোতা হবে। কিন্তু সেই সমঝোতার কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। আসলে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দাতাগোষ্ঠী বারে বারে এই সমঝোতার কথা বলে আসলেও কোনো জট খুলছে না। সমঝোতাও হচ্ছে না। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ৬ দফার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের হাউস অব কমনসও একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাপারে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সুনির্দিষ্টভাবে ৬টি বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। এগুলো হচ্ছে : ১. রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সরাসরি ও সত্যিকার অর্থে সংলাপ, ২. রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ, ৩. শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পথ সুগম করা, ৪. নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ৫. জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকোর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন, ৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্থা বন্ধ ও গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দেয়া। সিনেটে গৃহীত এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সিনেটর মেনডেজ কর্তৃক দুই নেত্রীকে লেখা চিঠির কথাও আমরা এখানে উল্লেখ করতে পারি। উক্ত চিঠিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, সহিংসতা বন্ধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছিল। সিনেটর রবার্ট মেনডেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান। সিনেটর মেনডেন কিংবা মার্কিন সিনেটে গৃহীত সিদ্ধান্তকে হালকাভাবে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমি জানি না সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন কি না? এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যে খুব ভালো তা বলা যাবে না। ড. ইউনূস ইস্যুতে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল। তা আর ভালো হয়নি। তৈরি পোশাক শিল্প নিয়েও কথা আছে। জিএসপি সুবিধা স্থগিত হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব শর্ত পূরণ করলেও জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ ফিরে পায়নি। এমনকি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নিজে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেও জিএসপি সুবিধা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে মার্কিন বাণিজ্য কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করতে পারেননি। মার্কিন সিনেটের পাশাপাশি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ব্রিটেনের হাউজ অব কমনসের সিদ্ধান্তটিও ছিল আমাদের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য-এই তিনটি দেশের তথা সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। এদের বাংলাদেশে যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। সুতরাং এই দুটি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত
হয়েছে তা বিবেচনায় নেয়া আমাদের জন্য মঙ্গল। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো গুরুত্বই দেয়নি।

মোটা দাগে এই তিনটি প্রস্তাব যদি বিশ্লেষণ করি, তাতে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমরা অদ্ভুত একটি মিল খুঁজে পাই। এগুলো হচ্ছে, ১. অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন, ২. অবিলম্বে স্থগিত হয়ে যাওয়া সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু করা, ৩. সহিংসতা বন্ধ। এখানে সবাই একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বললেও বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার কথা কেউ বলেনি। তবে যে ভাষা তারা ব্যবহার করেছেন, তাতে ধারণা করা হয় এটা স্বাভাবিক যে দশম সংসদ গঠন প্রক্রিয়ায় এরা খুশি নন। সব দলের অংশগ্রহণ এতে হয়নি, এমন অভিমতও দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। এ ক্ষেত্রে ব্রিটেনের হাউজ অব কমনস-এ গৃহীত সিদ্ধান্তে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছিল, যা অন্য কেউ বলেনি। এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘সন্ত্রাসে জড়িত দল নিষিদ্ধ করা উচিত’ বলে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল তাও গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দেশকে বোঝানো হয়নি। তবে এটা তো ঠিক সহিংস ঘটনাবলির জন্য জামায়াত ও হেফাজত ইসলাম অভিযুক্ত হয়েছিল। সাধারণ মানুষের মনে একটা প্রশ্ন উকি দেবে-ইউ’র ওই সিদ্ধান্ত কী জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? সরকার কি সিদ্ধান্তটি নেবে? সরকারের হাতে একাধিক ‘অপসন’ আছে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার। কি করবে সরকার এখন যদিও তা স্পষ্ট নয়। সরকার জামায়াতের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় যাচ্ছে, এ ধরনের একটি গুজব বেশ কিছুদিন ধরেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা যখন এ ধরনের অভিযোগ আনেন, তখন সাধারণ মানুষ এ ধরনের গুজবকে গুরুত্ব দেয় বৈকী। জামায়াত নেতাদের, যারা যুদ্ধাপরাধী, তাদের চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন করার প্রশ্নে ইতোমধ্যে গণজাগরণের মঞ্চ ভেঙেও গেছে। তবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সরকারের জন্য কঠিন কিছু নয়। বিশেষ করে আমাদের সংবিধানের ৩৮ (গ) ও (খ), রিপ্রেজেনটেশন অব পিপলস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭২, দ্যা পলিটিক্যাল পার্টিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮ এর ধারা, উপধারা বলে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ, কিংবা উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলার ফয়সালা করে সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে পারে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। আগামী নির্বাচনের জামায়াত নামে কোনো দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আইনগত ও সাংবিধানিকভাবেই হওয়াই উচিত। সংলাপের পূর্বশত আরোপ করা উচিত নয়। তবে এটা তো ঠিক বিএনপির নেতৃস্থানীয়দের কারো কারো মধ্যে এই উপলব্ধিবোধ এসেছে যে, বিএনপির জামায়াতকে পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু আমার ভাবনা অন্য জায়গায়। যদি সংলাপ হয়ও তাতে কি কোনো ‘ফল’ পাওয়া যাবে? সংলাপে মূল আলোচ্য বিষয় কি? একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন? তাতে সরকার এখন রাজি হবে না। কিংবা নির্বাচনটা হবে কোন সরকারের অধীনে? অন্তর্র্বতীকালীন সরকার? সংবিধানে তো সে ভাবেই লেখা আছে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই তো নির্বাচন হওয়ার কথা! বিএনপি তা কি মানবে? যদি এটা বিএনপিকে মানতেই হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিল না কেন? আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি-সংবিধানে বর্ণিত অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের ফর্মুলা বাদ দিয়ে (যেখানে শেখ হাসিনাই থেকে যাবেন সরকার প্রধান হিসেবে) অন্য যে কোনো ফর্মুলায় বিএনপি রাজি হবে। ফলে সংলাপ হলেও তা কোনো ফল দেবে না-আমার আশঙ্কা এখানেই। সরকার এখন চাইবে দশম সংসদকে পাঁচ বছর টেনে নিয়ে যেতে। এতে সরকার কতটুকু সফল হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কতটুকু সংগঠিত করতে পারবে, তার ওপর। সম্ভবত বিএনপি তথা ২০ দলের স্ট্র্যাটেজি সঠিক ছিল না। এটা সত্য নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তবে বাস্তবতা হচ্ছে একটি সরকার গঠিত হয়েছে। একটি সংসদও আছে। তথাকথিত একটি বিরোধী দলও আছে। মানুষ ভোট দিক আর না দিক সংসদ গঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিএনপি এই প্রক্রিয়ার বাইরে। অর্থাৎ বড় দল হিসেবে বিএনপিকে প্রয়োজন ছিল। আমাদের আস্থার জায়গটা বারবার নষ্ট হয়ে যায়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে ও বিদেশে হাজারটা প্রশ্ন থাকলেও এক সময় মনে করা হতো সরকার যেহেতু ‘নিয়ম রক্ষার্থে’ এই নির্বাচন আয়োজন করেছিল, সেহেতু সরকার অতি দ্রুত এটি মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে। কিন্তু ছয় মাস পার হয়ে যাওয়ার পর সরকার প্রধান এবং অমান্য নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সরকার ২০১৯ সালের আগে আর নির্বাচনের কথা ভাবছে না। শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো দায়িত্ব নেয়ার পর ইতোমধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করেছেন। জাপান, চীন ও ব্রিটেন। ধারণা করছি আগামী জানুয়ারিতে তিনি ভারত সফরে যাবেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এই চারটি দেশই আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মধ্যে দিয়ে সরকার প্রধান চেষ্টা করছেন বহির্বিশ্বে এক ধরনের ‘লেজিটেম্যাসি’ তৈরি করতে। তিনি পুরোপুরিভাবে এ ক্ষেত্রে সফল, তা বলা যাবে না। সর্বশেষ ব্রিটেন সফর নিয়েও একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রিটেন সফরের পর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন ‘ব্রিটেন মনে করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এক অতীত।’ কিন্তু পরে জানা গেল দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্রিটেন এ ধরনের কোনো মনোভাব দেখায়নি। বরং বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নতুন করে আরেকটি নির্বাচনের কথা বলেননি বটে, কিন্তু একটি ‘মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার’ পক্ষে কথা বলেছিলেন।

সরকার স্পষ্টতই শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা থাকুক, আর না থাকুক সরকার এটা নিয়ে আর ভাবছে না। সরকারের প্রায়োরিটি এখন দাতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং খুব সঙ্গতকারণেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা সরকারের নীতিনির্ধারকদের মাথায় নেই। তাহলে? সরকার কি তাহলে দমন-নিপীড়ন চালিয়ে বিএনপির আন্দোলন স্তব্ধ করে দেবে? অতীতে বিএনপি তথা তৎকালীন ১৯ দল ঢাকা অবরোধ ডেকেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সরকার কঠোর হয়েছিল। সরকার আবারো সেদিকেই যাচ্ছে। ফলে একটা শঙ্কা, একটা ভয় থাকলই-কি হবে আগামী দিনে? আন্দোলন করে সরকারকে বাধ্য করা যাবে কি মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে? এসব প্রশ্ন এখন বার বার আলোচিত হবে। অনেক ‘কিন্তু’ এবং ‘যদি’র মধ্যে ভবিষ্যৎ রাজনীতি আবর্তিত হবে। তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এটা দিব্যি দিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের যে ‘অর্জন’ তা বাধাগ্রস্ত হবে। আমরা ২০১৫ সালের মধ্যে এমডিজির (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস) যে লক্ষ্যমাত্রা, তাতে পৌঁছতে পারব না। ইউএনডিপির রিপোর্টে যে সাফল্যের কথা বলা হয়েছে তা ধরে রাখতে হলে সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক ধরনের ‘সমঝোতা’, ‘ঐক্য’ ও আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যত দ্রুত সরকারের নীতিনির্ধারকরা এটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন, ততই আমাদের মঙ্গল।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়
ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

You Might Also Like