হোম » `আমরা স্বাধীন হয়েও স্বাধীন নই মানুষ হয়েও মানুষ নই’

`আমরা স্বাধীন হয়েও স্বাধীন নই মানুষ হয়েও মানুষ নই’

admin- শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০১৫

দেশে শুধু যে জনজীবনে নৈরাজ্য চলছে তা-ই নয়, সমানতালে প্রশাসনেও চলছে বিশৃঙ্খলা। যেভাবে প্রতিদিন খুন-খারাবি ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে তাতে দুঃখের সাথে প্রশ্ন করতে হয়, আমরা কি মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছি, না নিষ্ঠুরভাবে মৃত্যুর স্বাধীনতা চেয়েছি। গত সোমবার পত্রপত্রিকায় বড় ছবিসহ ছাপা হয়েছে ১৩ বছরের একটি গরিব শিশু সামিউল আলম রাজনকে চুরির অভিযোগে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার পাশে ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে কয়েকজন মিলে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। কেউ বাধা দিতে এগিয়ে আসেনি। যে দেশে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেও বড় বড় মর্যাদার আসনে বসে থাকা যায় এবং যাদের উচ্চকণ্ঠে বলতে অসুবিধা হয় না যে জনগণ তাদের সাথেই আছে, সে দেশে সামান্য চুরির সন্দেহে যদি নিরীহ একটি শিশুকে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন দিতে হয় তাহলে বুঝতে হবে শুধু জাতীয় মানমর্যাদা রক্ষার ব্যাপারই নয়, মানবিক চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রেও আমরা বড় ধরনের অসুস্থতায় ভুগছি।

অনেকে হয়তো বলবেন যে, খুন-খারাবি ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা তো নতুন কিছু নয়। সব ধরনের নিষ্ঠুরতা ও অন্যায় যে অসহায়ভাবে সহ্য করে যাচ্ছি তাও তো অস্বীকার করার মতো নয়। আমাদের অসুস্থ রাজনীতির কারণে দেশে যে অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে সেটাও অস্বীকার করা যাবে না। যারা রাজনকে ভিডিও ধারণসহ সোল্লাসে হত্যা করেছে তাদের সাহসের উৎস খুঁজতে হবে। সঠিক সত্য জানা হয়তো কঠিন হবে।

দেশের বিচারব্যবস্থার ত্রুটির কারণেও অপরাধীদের রক্ষা পাওয়া সহজ হচ্ছে। পুলিশকে দিয়ে রাজনৈতিক মামলা করানো হচ্ছে বলে পুলিশের পক্ষে সৎ ও নিরপরাধ থাকা সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশ ও সরকারি দলের লোকদের একযোগে অপরাধ করার বিষয়টি গোপন কিছু নয়। মামলার মাধ্যমে যে সত্যিকারের অপরাধীদের বিচার হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই যখন মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিচারে বিলম্ব হতে দেবেন না বলেন, তখন সুবিচারের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তা ভেবে দেখা জরুরি হয়ে পড়ে। বিচার দ্রুত করা খুবই সহজ। সুবিচার দিতে হলে সমস্যার শেষ নেই। পুলিশের সততা ও স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলতে হবে। একের অপরাধ অপরের কাঁধে চাপিয়ে দিলে তো অপরাধীরা সাহস পাবেই। শত শত মামলা দিয়ে সরকার মামলার রাজনীতি করছে, দ্রুত বিচার হলে বিরোধী রাজনীতিবিদদের শাস্তি পাওয়াও দ্রুত হবে। অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেই খুন-খারাবির মতো জঘন্য অপরাধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। পুলিশ নিজেরাও সুযোগের সদ্ব্যাবহার করছে। তাই মাননীয় প্রধান বিচারপতিকে সুবিচার পাওয়ার পথে যে বাধাগুলো রয়েছে তা দূরীকরণের কথাও ভাবতে হবে। দেশ শাসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতায় যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।

ভিন্ন দেশের সহযোগিতা নিয়ে শুধু বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে তা কিন্তু নয়। স্বাধীনতা লাভের ৪৪ বছর পরও আমাদের দেশে সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় আমরা কতটা স্বাধীন সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। দেশের দ্রুত উন্নয়নের প্রয়োজনে সবার সাথে বন্ধুত্ব করতে অসুবিধা হবে কেন? অথচ আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে মানমর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারছি না।

রুশ সাহায্য নিয়ে যে ভিয়েতনাম আমেরিকার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর তিক্ত যুদ্ধ করেছে সেই ভিয়েতনাম আজ তার উন্নয়ন ও প্রগতির জন্য আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। ভিয়েতনামের মুক্তির লড়াইয়ে রাশিয়া আদর্শিক কারণে সাহায্য দিয়েছে, কিন্তু তাই বলে দেশটি রাশিয়ার উপগ্রহে পরিণত হয়নি। ভিয়েতনামকে রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রমাণ করার জন্য কখনো নতজানু থাকতে হয়নি, অথবা যেকোনো মূল্যে হোক রাশিয়াকে খুশি রাখতে হবে বা পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে রাশিয়ার ওপর এককভাবে নির্ভরশীল থাকতে হবে এমন অনুদার মানসিকতা দেখানো হয়নি। বশ্যতা যে স্বাধীনতা নয়, এ কথা রাশিয়া এবং ভিয়েতনাম দু’টি রাষ্ট্রই উপলব্ধি করেছে। রাশিয়ার সাথে আমেরিকার আদর্শিক শত্রুতার কথা ভিয়েতনামের অজানা নয়, কিন্তু তাই বলে ভিয়েতনাম কেন আমেরিকার সাথে সুন্দর ও অর্থবহ সম্পর্ক গড়তে পারবে না। এমন প্রশ্ন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়নি।

চলতি সপ্তাহে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান নগুয়েন পো ট্রংকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানালেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এটা কেবল দু’দেশের মধ্যকার শুভেচ্ছার নিদর্শন ছিল না, ছিল একে অপরকে সাহায্যের অঙ্গীকার।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পাতায় বড় শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে দেখানো হয় কিভাবে দু’টি দেশের বিশিষ্ট যোদ্ধারা সমঝোতা প্রতিষ্ঠার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জনাব তিয়েনকে উদ্ধৃত করে দৈনিকটি বলেছে, ‘অতীতে আমরা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।’ এ কথা বলার সময় এই বিশিষ্ট ভিয়েতনামী যোদ্ধা তিয়েন আমেরিকান যোদ্ধাদের সাথে বসেই তার অভিমত দিচ্ছিলেন। আজ ভিয়েতনামের বীর যোদ্ধারা কঠিন লড়াই করে জেতা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। আজ তারা শান্তিতে বসবাস করার জন্য উদ্বিগ্ন। সমৃদ্ধির জন্য তারা আজ ঘরে-বাইরে শান্তির প্রত্যাশী।

ভিয়েতনামের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত লাভ কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য প্রতিহিংসায় বশবর্তী হয়ে শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছেন না। তারা জাতির সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তায় অতীতকে ভুলে যেতে চাইছেন এবং একদিন যে আমেরিকা তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল সেই আমেরিকা আজ তার উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করতে নিরাপদ বোধ করছে। যারা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের জন্য যুদ্ধে অংশ নেয় তারা তো মুক্তিযোদ্ধা নয় সাধারণ যোদ্ধা হতে পারেন।

ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। ভাড়াটিয়া যোদ্ধা আর মুক্তিযোদ্ধা এই দুইকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধারা নিষ্ক্রিয়। অপর দিকে একশ্রেণীর মুক্তিযোদ্ধা নামধারী মুক্তিযুদ্ধের নীতি ও আদর্শকেই অস্বীকার করে চলেছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর পরাজয়ে এবং আমাদের বিজয় অর্জনে ভারত যে নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছিল, এ কথা তো কেউ অস্বীকার করছে না। কিন্তু একশ্রেণীর অতি উৎসাহী মুক্তিযোদ্ধার আচার-আচরণ দেখলে মনে হয় বাংলাদেশে একমাত্র তারাই ভারতের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অন্য দেশের বিশেষ করে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব রীতিমতো দোষনীয়।

ভারতের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা এবং ভারতের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রক্ষার অর্থ এটা নয় যে, কেবল ভারতই আমাদের বন্ধু থাকবে, স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা আমাদের ভালোর জন্য আর নতুন কোনো বন্ধু খুঁজতে পারব না। এ জন্য ভারত সরকারকে দোষারোপ করা যাচ্ছে না। বস্তুত এ ব্যাপারে দোষ তাদেরই যারা রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো শক্তি না হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাঙিয়ে রাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছে। এ দেশের কোনো নির্বাচনে বামপন্থী দলের একজনও দলীয় পরিচয়ে নির্বাচিত হতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধকে তারা এখন অগণতান্ত্রিক ও নির্বাচন বিমুখ বামপন্থী রাজনীতির বিজয় হিসেবে চাপিয়ে দিচ্ছে। দেশে হিংসা-বিদ্বেষ আর হানাহানির বৈপ্লবিক রাজনীতিতেই তাদের উৎসাহ। এতে প্রতীয়মান হয় তারা ভারতের পরাজিত নকশাল ধারার বামপন্থী রাজনীতির বিশেষ কোনো সংস্করণ।

মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সাহায্যের কথাই তারা সবাইকে শুনাচ্ছেন। ভারতের সবচেয়ে বড় সাহায্য ছিল আমাদের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ। তাই বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহায্য-সহযোগিতার কথা ভুলে যেতে হবে, এমন কথা যুক্তিসঙ্গত নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন আমেরিকাসহ পশ্চিমী দুনিয়া যে বিপুল আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল সে কথা উল্লেখ করা হয় না। শরণার্থীদের সাহায্যে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকলে অনেকেই স্বীকার করেন যে তখন ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বিপুল শরণার্থী মৃত্যুর শিকার হতো।

বামপন্থী রাজনীতির চিরাচরিত আমেরিকা বিরোধী বক্তব্য তো তাদের থাকতে হবে। তারা যেটা বুঝতে চাইছে না তা হলো, আমেরিকা যদি সত্যি সত্যি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হতো, তাহলে ভারত যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে যেত না। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীও আত্মসমর্পণের জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষায় থাকত না। সত্যি কথা বললে বলতেই হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনী এক প্রকার বিনাযুদ্ধেই পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে। সহজলভ্য বিজয়ের কারণে কিছু লোকের কাছে যুদ্ধের বিষয়টি সহজ মনে হচ্ছে। আত্মসমর্পণ করতে বলা মাত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জটিলতা উপলব্ধির জন্য এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, পাকিস্তানি জেনারেলদের নজিরবিহীন পরাজয়ের পর তারা ভারতের বিজয়ী জেনারেলদের ভোজে আপ্যায়িত করেন।

মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান যে গণহত্যা চালিয়েছে আমাদের ইতিহাসের এই অমানবিক ইস্যুটিকে যুদ্ধকালীন প্রধান মিত্র ভারত পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ভারতের বর্তমান শক্তিশালী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান সফরে গিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক নবায়নের ওপর সবিশেষ জোর দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্য রক্ষার প্রশ্নটিই গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। এটাই স্বাভাবিক। আমাদের মধ্যে একটা বিশেষ শ্রেণি মুক্তিযুদ্ধের নামে কারা কাদেরকে উৎখাত করবে, দেশ ছাড়া করবে তা নিয়ে জাতীয় ঐক্য ও শান্তি বিনাশ করে চলছে। সরকার যে ভেঙে পড়ছে, দেশ যে সর্বনাশা নৈরাজ্যের দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কারো কোনো চিন্তা নেই।

জনগণের দুর্ভাগ্য, দেশে এত শিক্ষিত ও যোগ্য লোক থাকতে আমরা স্বাধীনতার মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে দেশ গঠনের যোগ্য নেতৃত্ব বা সরকার পেতে ব্যর্থই থেকে গেলাম। দেশে প্রশ্রয় পাচ্ছে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, মামলাবাজ, জবর-দখলকারীদের দাপট ও জননিরাপত্তাহীনতা। শিশু রাজনের মৃত্যুসহ প্রতিটি নাগরিকের অসহায় মৃত্যু আমাদের প্রত্যেকের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর ও হৃদয়বিদারক। ব্যর্থতা ও নিষ্ঠুরতার গ্লানি নিয়ে কোনো জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করে পথ চলতে পারে না।

মইনুল হোসেন: বার এট সংবিধান বিশেষজ্ঞ

সর্বশেষ সংবাদ