আমরা কি অন্ধকার যুগে প্রবেশ করতে চলেছি?

হায়দার আকবর খান রনো
ক্রমবর্ধমান হারে নারীর প্রতি সহিংসতা ও উৎকট পুরুষতান্ত্রিকতা, জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি—এই তিনটি মিলিয়ে দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে আমরা সত্যিই এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করতে চলেছি।

নারীর প্রতি সহিংসতার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হলো সোহাগী জাহান তনু হত্যা। মেধাবী ছাত্রী তনু। একই সঙ্গে ভালো আবৃত্তি করতেন। সাংস্কৃতিককর্মী। নিম্নবিত্ত কর্মচারীর মেয়ে। নিজে দুটি টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাতেন। সেই তনু খুন হলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে। রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে এলাকাটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তার চাদর দিয়ে ঘেরা। সেনানিবাস তো এমনই হওয়ার কথা। ওই এলাকায় ছোট চাকরি করতেন তাঁর বাবা। তনু এ এলাকায়ই বড় হয়েছেন। তাঁর পরিচিত এলাকা। কিন্তু সেখানেই তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। কেন? কিভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব কঠিন। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় যদি নিরাপত্তার অভাব থাকে, অথবা ক্যান্টনমেন্টে নিহত হওয়ার পরও যদি খুনের কোনো হদিস না পাওয়া যায়, তাহলে তো আমাদের জন্য তা আরো উদ্বেগের কথা। আমাদের রাষ্ট্রটাই কি এতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে?
জনমনে সন্দেহ, তদন্ত ঠিকমতো হচ্ছে না। দু-দুবার ময়নাতদন্তের পরও কিছুই বের হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ কি অপরাধীকে আড়াল করতে চাইছে? এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘জজ মিয়ার মতো নাটক যেন না হয়।’ বিএনপির শাসনামলে ২১ আগস্টের মর্মান্তিক ও ভয়ংকর গ্রেনেড হামলায় তদানীন্তন সরকার বা পুলিশ প্রশাসন আসল আসামিদের আড়াল করার জন্য জজ মিয়া নামে এক নিরীহ মানুষকে ভুয়া আসামি বানিয়েছিল। তেমন ভুয়া কারবার যেন না হয়, সে জন্য মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান কিছু পরামর্শ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি পর্যন্ত দিয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি এখনো নির্বিকার? গত ২০ মার্চ তনুর লাশ পাওয়া গেল। দুবার ময়নাতদন্তের পরও তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। একটা রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ধর্ষণের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু মাথার পেছনে আঘাত, মুখ থেঁতলে যাওয়া ও অন্যান্য আঘাতের চিহ্নের কথা বলা হয়েছে। ধর্ষণ যদি না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু হত্যা কেন? এই যে তরুণীকে খুন করা হলো, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা কারোরই ছিল না। প্রশ্নটি খুবই জটিল। সরকারকে অবশ্যই জবাব দিতে হবে। নীরব বা নির্বিকার থাকলে আমরা সরকারকেই দোষী সাব্যস্ত করব।
তনুর ব্যাপারে কী হয়েছে, আমরা এখনো জানি না। কিন্তু তনু হত্যার যে বিচার হচ্ছে না, এটা দেশব্যাপী দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সরকার সেটা দেখেও দেখছে না। কারণ আমাদের প্রশাসন যে সঠিক বিচারপ্রক্রিয়া চায় না, এ কথা স্বয়ং প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাও বলেছেন, যা গত ৩ এপ্রিল বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি গত বছর আগস্ট মাসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না।’ (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৪ আগস্ট ২০১৫)। তনু হত্যার তদন্তে গাফিলতি তো মানবাধিকার চেয়ারম্যানের কথার সত্যতাই প্রমাণ করে।
আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে যে শিশু হত্যা বেড়ে গেছে, এ কথাও তিনি গত বছর বলেছিলেন। সারা দেশে মানুষ যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে, তা খবরের কাগজ পড়লেই জানা যায়। এসব তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে খুন, গুম, অপহরণ, সন্ত্রাস। অবশ্যই সরকারকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এ ছাড়া আছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ক্রসফায়ার নামে একটা কথা এখন আর কারো অজানা নয়। ক্রসফায়ার যে বানোয়াট গল্প, তা কে না জানে। সবাই জানে যে ক্রসফায়ার মানে গ্রেপ্তার করে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে ফেলা। র‍্যাব-পুলিশের কোনো কোনো অসৎ সদস্য এই অঘোষিত সরকারি নীতির সুযোগ নিয়ে নিজেরাই ভাড়াটিয়া খুনিতে পরিণত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর এ তথ্যটিও প্রকাশিত হয়েছিল। সামরিক শাসক এরশাদ অত্যাচারী শাসক ছিলেন। ট্রাকচাপা দিয়ে ছাত্র হত্যা করেছিলেন। কিন্তু ক্রসফায়ারের মিথ্যা নাটক তার আমলে শুরু হয়নি। নব্বই-পরবর্তীকালে প্রথম শুরু হলো খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে, যখন তিনি ক্লিনহার্ট অপারেশনের নামে বিনা বিচারে বন্দি অবস্থায় হত্যা অনুমোদন করেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি পার্লামেন্টে আইন করে হত্যাকারী বা নির্যাতনকারীদের দায়মুক্তি দিয়েছিলেন। আজ তাঁরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলেন, তখন তা কী করে বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে?
শুরু করেছিলাম নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয় নিয়ে। তনুই একমাত্র ঘটনা নয়। আমাদের সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা এত প্রকটভাবে আছে যে নারী নানাভাবে নির্যাতিত, এমনকি নিহত পর্যন্ত হচ্ছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য থেকে নারীর প্রতি সহিংসতার যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা ভয়াবহ। সে হিসাবমতে, এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ—তিন মাসে ৩৭০ জন নারী ও শিশু নির্যাতিত হয়েছে। তার মধ্যে ১৫২ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। বখাটে ছেলেদের উৎপাত ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৮৯ জন। ১০ জন নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ করা হয়েছে। সালিস-ফতোয়াবাজির মাধ্যমে নির্যাতিত হয়েছেন দুজন নারী। গৃহপরিচারিকা হিসেবে নির্যাতিত হয়েছে ১৮ জন। যৌতুককে কেন্দ্র করে নির্যাতিত হয়েছে ৬৬ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ১০৩ জন। ধর্ষিত হয়েছে ১৬১ জন।
মাত্র তিন মাসের হিসাব। তাও আবার এ সংখ্যাগুলো সংগৃহীত হয়েছে খবরের কাগজের রিপোর্ট থেকে। খবরের কাগজে আসে না—এমন সংখ্যা আরো বেশি। ওপরের সংখ্যা থেকে দুই ধরনের নির্যাতনের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। এক. পুরুষের যৌন লালসার শিকার হচ্ছেন নারীরা। একই সঙ্গে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও আছে। আরেক ধরনের নির্যাতন হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিকতার কারণে। যৌতুকের কারণে, পারিবারিক কারণে নির্যাতন, এমনকি হত্যা এই তালিকার মধ্যে পড়ে। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকদের দ্বারা প্রহৃত হওয়া, অমানবিক দৈহিক নির্যাতন বলে দিচ্ছে, আমরা এখনো সভ্য হয়ে উঠিনি।
এর পাশাপাশি ধর্মীয় মৌলবাদী ধ্যান-ধারণা নারীকে আরো নিচে নামিয়ে দেয় এবং তার অসহায়ত্বের কারণে নির্যাতন আরো বেশি হয়। ইসলামের নামে পরিচালিত কোনো সংগঠনের প্রধান শফি সাহেব যখন তেঁতুল তত্ত্ব দেন, অথবা নারীশিক্ষার বিরোধিতা করেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ধর্মীয় মৌলবাদ নারীকে কত নিচে নামিয়ে রাখে। ফতোয়াবাজি, নারীকে পাথর ছুড়ে হত্যা অথবা দোররা (চাবুক) মারার ঘটনা যে দেশে হয়, তাকে কি সভ্য বলা চলে?
ধর্মীয় মৌলবাদ এখন শুধু প্রচার ও ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তাদের একটি অংশ এখন গুপ্ত সন্ত্রাসবাদের পথ বেছে নিয়েছে। ব্লগার হত্যা, শিক্ষক হত্যা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, খ্রিস্টান যাজক হত্যা, শিয়া মুসলমান হত্যা, মন্দিরে জমায়েত হিন্দু নাগরিকদের হত্যা—একটার পর একটা ঘটেই চলেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এত ঘটনা ঘটার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে চলেছেন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব চমৎকার। পরিস্থিতি এতই খারাপ যে বিদেশি রাষ্ট্রও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এ কথাও বলেছেন যে বাংলাদেশ সরকার সব হত্যাকাণ্ডের দায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের কাঁধে চাপাতে চাইলেও ইসলামিক স্টেট বা এ ধরনের আন্তর্জাতিক জঙ্গি গ্রুপের তৎপরতাকে অস্বীকার করা চলে না। আইএস বা আল-কায়েদার মতো কোনো সংগঠন হয়তো বাংলাদেশে সরাসরি কাজ করছে না। কিন্তু ওই ধরনের মৌলবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপ যে কাজ করছে এবং সরকার এখনো তা দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে, এ সহজ সত্য কে অস্বীকার করবে।
এই সন্ত্রাসী গ্রুপের আক্রমণের শিকার কে যে হবে, তা বলা যায় না। এ এক অনিশ্চিত ভয়াবহ পরিস্থিতি, যেখানে আমরা কেউই নিরাপদ নই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী ছিলেন খুবই ধার্মিক ব্যক্তি। ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিল না। সম্পত্তি বা অন্য কোনো বিষয়ে কারোর সঙ্গে বিরোধের কোনো ঘটনা থাকার আশঙ্কাও ছিল না। তবু তিনি ঘাতকের আঘাতে নিহত হলেন। এটাও করেছে মৌলবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপ। শোনা যায়, তাঁর একমাত্র অপরাধ তিনি সংগীতপ্রিয় ছিলেন। গ্রামে গানের স্কুল দিয়েছিলেন। এটাই নাকি ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ ছিল, যার শাস্তি তারা দিল হত্যা করে।
এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে কি আমরা বর্বর অন্ধকার যুগে ফিরে যাব? সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দমন করা খুব কঠিন বলে মনে হয় না। কারণ তারা গণবিচ্ছিন্ন। ধর্মপ্রাণ কোনো মুসলমান তাদের সমর্থন করে না। তাই বেশি উদ্বেগের কারণ হচ্ছে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা। নিহত অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বলেছেন, ‘খুনিদের ধরার ক্ষেত্রে সরকারের ইচ্ছাও নেই, সক্ষমতাও নেই।’ মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের চাপাতির আঘাতে নিহত দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা নেই। আছে শুধু অনাস্থা।’ আমাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সামান্যতম নিশ্চয়তা কি সরকার দিতে পারে না? এইটুকু দাবি করা কি খুব বেশি হয়ে গেল?

You Might Also Like