আত্মসমর্পিত বুদ্ধিজীবী সমাজের জন্য বিপজ্জনক

প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী :

সম্প্রতি দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ শীর্ষক একটি গ্রন্থের ওপর এক আলোচনার খবর পত্রিকার পাতায় দেখতে পেলাম। বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আলোচনায় অংশ নেন। প্রফেসর চৌধুরীর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছিল বলে জেনেছি। খবরটি আগে জানলে হয়তোবা আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার চেষ্টা করতাম। কারণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখার প্রতি আমার আগ্রহ ও আকর্ষণ প্রবল এবং দীর্ঘ দিনের। তার অনেক লেখাই আমি পড়েছি; কিন্তু উল্লিখিত গ্রন্থটি আমার এখনো হাতে পাইনি। আশা করি শিগগিরই গ্রন্থটি সংগ্রহ করে পাঠ করব।
তবে আলোচকদের মধ্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের একটি বক্তব্য আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি বর্তমান বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে বলেন, ‘আজকের এই অবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী লেখক, শিক ও বুদ্ধিজীবী-বিদ্যোৎসাহী। তাদের কোনো আওয়াজ দেখছি না। যে সমাজে এমন আত্মসমর্পিত বিদ্যোৎসাহী থাকে, সেই সমাজ বিপজ্জনক। ভরসার বিষয় হচ্ছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এখনো স্বাধীন ও সক্রিয় মস্তিষ্ক নিয়ে এবং মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন মেরুদণ্ডসম্পন্ন লোক আরো দরকার।’
(প্রথম আলো ৩০-০৭-২০১৬)
অবস্থাদৃষ্টে আমার বহুবার মনে হয়েছে যে, আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের এক বিরাট অংশ আজ শাসক এবং শোষক শ্রেণীর পদলেহনে ব্যস্ত। নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থের জন্য তারা শুধু আত্মসমর্পণই করেননি, আত্মবিক্রি করেছেন। সত্যের সন্ধান করা, সত্য কথা বলা দূরে থাক, মিথ্যা বলা ও চাটুকারিতাই তাদের প্রধান কাজ। শাসকের মনোরঞ্জন এবং শোষকের সন্তুষ্টিবিধান করেই তারা তৃপ্ত হন। অবশ্য এটা তাদের শ্রেণী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ।
সমাজে দু’টি মৌলিক শ্রেণী থাকেÑ একটি উৎপাদনের উপায়ের মালিক শ্রেণী; যারা শাসক, শোষক এবং নিপীড়ক। আরেকটি উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা থেকে বঞ্চিত শ্রেণীÑ যারা প্রধানত উৎপাদন সংগঠনে শ্রম দিয়ে থাকে; তারা শাসিত, শোষিত ও নির্যাতিত। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের দু’টি মৌলিক শ্রেণী হলো : ০১. পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া শ্রেণীÑ এরা শাসক এবং শোষক শ্রেণী এবং ২. শ্রমিক শ্রেণী বা সর্বহারা শ্রেণীÑ এরা শাসিত এবং শোষিত শ্রেণী।
এ দুই মৌলিক শ্রেণীর বাইরে অমৌলিক শ্রেণীর অবস্থান। বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী তথা বুদ্ধিজীবী একটি অমৌলিক শ্রেণী। এরা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্গত; আর মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে সুবিধাবাদী এবং সুবিধাভোগী শ্রেণী তা এক প্রমাণিত সত্য। পুঁজিবাদী সমাজে তারা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণীর সহযোগী। শাসক শ্রেণীর সব রকমের শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনের সহযোগী শক্তি হিসেবে এরা কাজ করে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শাসকদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এরা অনেক বেশি সক্রিয়, সোচ্চার এবং অন্যায়-অবিচারের শাসন কায়েমের ক্ষেত্রে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।
এ কথা সত্য যে, সমাজে এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী; এক কথায় যাদের বলা হয় বুদ্ধিজীবী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমানে আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছে এবং তাদের স্বার্থে কাজ করার মধ্য দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করে চলছে। হীনস্বার্থ চরিতার্থের জন্য এরা তাদের প্রভুর পদলেহনে মত্ত। শাসকের মনোরঞ্জন ও স্তূতিতে এরা দক্ষ ও পটু। পদ-পদবির লোভে তারা নানাভাবে ক্ষমতাবান ও শক্তিধরকে তুষ্ট রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দালালি ও পদলেহনের প্রতিযোগিতায় যারা অগ্রগামী থাকেন; তারা শাসক-শোষকের নৈকট্য, বড় বড় পদ-পদবি ও পুরস্কার লাভ করেন। এ প্রতিযোগিতায় যারা পেছনে থাকেন তারাও ছিটেফোঁটা হালুয়া-রুটি ও ছোটখাটো আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হন না।
এরূপ পরিস্থিতিতেও ন্যায় ও সত্যের পূজারী স্বল্পসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে এর বিপক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। শত নিপীড়ন ও নির্যাতন উপেক্ষা করে তারা তাদের বিশ্বাসে অবিচল থাকেন। সর্বকালে সর্বসমাজে এ ধরনের উদাহরণ দেখা যায়। মানব ইতিহাসে চাটুকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের অনৈতিক কার্যকলাপের যেমন প্রমাণ পাওয়া যায় তেমনি নির্লোভ, ত্যাগী বুদ্ধিজীবীদের ন্যায় ও শুভশক্তির পক্ষে অবস্থানের কাহিনীও লিপিবদ্ধ আছে। যুগে যুগে দেশে দেশে সমাজ বদলের আন্দোলন সংগ্রামে বুদ্ধিজীবীদের অংশ নেয়ার বহু উদাহরণ আছে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো বুদ্ধিজীবীরা অমৌলিক শ্রেণীর ওই ক্ষুদ্র অংশের অন্তর্গত যারা সচেতনভাবে শোষিত, বঞ্চিত তথা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে কথা বলেন এবং তাদের সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে উৎসাহ দেন, অনুপ্রেরণা জোগান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার অনেক লেখায় পুঁজিবাদী শোষণের সমালোচনা করেছেন এবং এর থেকে পরিত্রাণের পথ নির্দেশের চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন আলোচনা সভায়ও তিনি এরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। তিনি মার্কসবাদী কিনা অথবা মার্কসের অনুসারী কিনা, তা আমি জানি না। তবে তার মতো মুক্তবুদ্ধির এবং আদর্শবাদী মানুষ এখনো আমাদের সমাজে খুঁজে পাওয়া যায় এটা আশার কথা। তার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি এবং একসাথে কাজ করার সুবাদে তার জীবন দর্শনের সাথে পরিচিত হয়েছি। ব্যক্তি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমাদের কাছে গৌণ হতে পারেন, কিন্তু বৃহত্তর সমাজের কল্যাণের জন্য তার মতো ব্যক্তিরা যে অপরিহার্য তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অপরিহার্য এ জন্য যে, তারা সমষ্টির স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কলম ধরেছেন আর বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু শ্রেণীচ্যুত বুদ্ধিজীবী যারা শোষিত মানুষের তথা সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির মহান লক্ষ্য অর্জনে বিপ্লবী আদর্শকে ধারণ করেছেন এবং শ্রেণীস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণীর সাথে একাত্ম হয়ে শ্রেণীসংগ্রামকে এর যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন তাদের সংখ্যা বিরল।
দার্শনিক মার্কসের মতে ÔPhilosophers have hitherto interpreted history, now the task is to change it.Õ ‘দার্শনিকেরা এ যাবৎকাল মানব ইতিহাসের ব্যাখ্যা করেছেন, এখন কাজ হবে একে বদলে দেওয়ার’। দার্শনিক কার্ল মার্কসের এ উক্তির আলোকে একথা স্পষ্টতঃ বলা যায় যে, দার্শনিক তথা লেখক, চিন্তাবিদ, পেশাজীবী এক কথায় বুদ্ধিজীবীদের কাজ শুধু সমাজ বিকাশের ইতিহাস ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা। এখন প্রয়োজন তাদের সমাজের মৌলিক পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করা। বিদ্রোহ বিপ্লবে তথা সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যেমন বুদ্ধিজীবীদের অংশ নেয়ার উদাহরণ মেলে। অন্য দিকে এর বিপরীত স্রোতের বুদ্ধিজীবীদেরও ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে।
১৯৭১-এ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে কাজ করেছিলেন তখনকার বুদ্ধিজীবীদের এক বিরাট অংশ। মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষী কিছু বুদ্ধিজীবী যারা এর বিরোধিতা করেছিলেন তারা নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭১ সালে যারা গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন, আজ আর তারা গণতন্ত্রের কথা বলেন না। তারা বলেন উন্নয়নের কথা। কিন্তু গণতন্ত্র ছাড়া যে উন্নয়ন হয় না, তা তারা বুঝেও বোঝেন না। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খানও এরূপ কথা বলেছিলেন। তিনিও শুনিয়েছিলেন ‘উন্নয়নের এক যুগের কথা’। তখনকার বুদ্ধিজীবীরা এবং জনগণ তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে গণতন্ত্র ও নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আইয়ুব শাহীর নিপীড়ন-নির্যাতন যতই কঠোর হয়েছে, গণ-আন্দোলনে, গণ-অভ্যুত্থানে এবং সর্বোপরি আমাদের মুক্তি সংগ্রামে (এ দেশের) বুদ্ধিজীবীদের বেশির ভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন। বুদ্ধিজীবীদের এ গৌরবময় অতীতের কথা আজকের দিনের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী বেমালুম ভুলে গেছেন। আইয়ুবের এবং এরশাদের অনুগত বুদ্ধিজীবীদের মতোই তারা অন্ধ; দেখেও দেখেন না, শুনেও শুনেন না। লজ্জা, বিবেক সবকিছু বিসর্জন দিয়ে শাসকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গল্প ও গীত রচনা করাই তাদের মুখ্য কর্ম। সম্প্রতি এক তরুণ কলামিস্ট অনেকটা বিদ্রƒপ করেই এদের বুদ্ধিজীবী বলার পরিবর্তে এদের নামকরণ করেছেন ‘বুদ্ধিযুক্ত জিহ্বাধারী’। দার্শনিক মার্কসের সমাজ বদলের মর্মবাণী এদের কর্ণকুহরে কখনো প্রবেশ করেছে কিনা জানি না; আর প্রবেশ করলেও তা তাদের গ্রাহ্য করার কথা নয়। সমাজ বদল নয়; সমাজকে আরো পিছিয়ে দিতে তারা আজ সক্রিয়।
আত্মসমর্পিত বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র মুৎসুদ্দি চরিত্র। এদের জাতীয় চরিত্র নেই বিধায় এদের দেশপ্রেমও নেই। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এরা নানা কৌশলে দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিদেশী শাসক ও শোষক শ্রেণীর এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। ওদের স্বার্থরক্ষাই এদের প্রধান কাজ। বস্তুতপক্ষে, বাংলাদেশে এখনো একটি জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর উত্থান ঘটেনি। এখানকার বুর্জোয়ারা কম্পারেডর বুর্জোয়া অর্থাৎ মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া। এদের অনুসারী তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবীরা দেশের সম্পদ পাচারে কিংবা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এদের মাধ্যমেই শোষণের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতো বুদ্ধিজীবীরা এর ব্যতিক্রম। তারা দেশীয় সম্পদ ও দেশের স্বার্থরক্ষার আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় আছেন। তাদের দেশপ্রেম ও সমাজের প্রতি অঙ্গীকার তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে, সূচিত হবে মৌলিক পরিবর্তনের নবযুগ।
লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী

You Might Also Like