আতঙ্কে ওদের আহার-নিদ্রা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান হঠাৎ করে সাধারণ নির্বাচন ডাকেন ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। ফিট স্ট্রিটের যেসব সাংবাদিক মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সমর্থন দিয়েছেন, তাদের কয়েকজন বিবিসির অফিসে আমাকে টেলিফোন করেন। বাংলাদেশ সংসদের মেয়াদ তখনো প্রায় অর্ধেক বাকি। তিন-চারজন বাদ দিয়ে সব সদস্যই আওয়ামী লীগ দলের। সুতরাং সরকারের গরিষ্ঠতা নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে না। এ অবস্থায় মুজিব কেন নির্বাচনের প্রয়োজন বোধ করলেন? তারচেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয়া কি বেশি প্রয়োজনীয় ছিল না? মূলত সেটাই ছিল তাদের প্রশ্ন। সেদিন বিবিসির সকালবেলার সম্পাদকীয় বৈঠকেরও প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল সেটাই। যত দূর মনে পড়ে, সেদিনের দু-একটি সংবাদভাষ্যেও এ প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল।

নির্বাচন উপলক্ষে আমি বাংলাদেশে গিয়েছিলাম। আর গিয়েছিলেন আমার সহকর্মী মার্ক টালি (বর্তমানে স্যার মার্ক টালি)। একাত্তরে বাংলাদেশ বিষয়ে তার সংবাদ, প্রতিবেদন ও সংবাদভাষ্য শোনার জন্য বাঙালিমাত্রই আকুল হয়ে থাকতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তার নাম উচ্চারণ করতেন ‘আমার বন্ধু মার্ক’ বলে। মার্ক টালিকে তিনি শিল্পী মুবিনুল আজিমের একখানি চমৎকার পেইন্টিং উপহার দিয়েছিলেন। মার্ককে সে উপহার নিয়ে গর্ব করতে বহুবার শুনেছি।

স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাই ছিল প্রথম নির্বাচন এবং নির্বাচনে সহিংসতার শুরুও তখন থেকে। আওয়ামী লীগ ছাড়া উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল ছিল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর মস্কোপন্থী ন্যাপ প্রথমে কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল এবং সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার কথা ভাবছিল। রক্ষীবাহিনী আগে থেকেই জাসদসহ সরকারের বিরোধী ও সমালোচকদের নিধনের কাজ চালাচ্ছিল। আওয়ামী লীগের কর্মীদের হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে অল্প কয়েকজন জাসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস প্রেসিডেন্ট, যুক্তফ্রন্ট সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী এবং পরে আওয়ামী লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান প্রার্থী হয়েছিলেন ধামরাই নির্বাচনী এলাকা থেকে।

আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাকে ছিনতাই করে এবং কয়েক দিন গুম করে রাখে। শেষে তার পরিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের (আওয়ামী লীগে আতাউর রহমানের জুনিয়র নেতা এবং যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ সরকারে তার জুনিয়র মন্ত্রী) কাছে এসে কান্নাকাটি করেন। তার পরই খান সাহেব মুক্তি পান। আমার নিজের প্রতিবেদনের উল্লেখ করছি না। মার্ক টালি তার খবর ও প্রতিবেদনে সে নির্বাচনে ‘ব্যাপক সহিংসতার’ উল্লেখ করেছেন এবং বলেছিলেন যে, তিনি সঠিক জানেন অন্তত চারটি আসন আওয়ামী লীগ দখল করেছে সহিংসতা ও অন্যান্য অসাধু উপায়ে।

ফলাফল প্রকাশিত হয় ৮ মার্চ রাতে। টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রী মুজিব মার্ক টালিকে এবং আমাকে পরদিন সকালে তার অফিসে ডাকেন। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে হেঁটেই আমরা মিন্টো রোডে তার অফিসে গেলাম। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেডক্রসের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফা, ঢাকা কলেজের একজন লেকচারার এবং রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত তোফায়েল আহমেদ। আমাদের বসতে বলে মুজিব ভাই গোড়াতেই প্রশ্ন করলেন : ‘নির্বাচন করলাম, নির্বাচনে জিতলাম, এখন বল্্ কী করি?’ আমি তাকে পরামর্শ দিলাম সেদিন সন্ধ্যাবেলায় তার উচিত রেডিও-টেলিভিশনে যুগপৎ ভাষণ দেয়া। আমি আরো বললাম, তিনি হুকুম দিলে আমি নিজেই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে একটা খসড়া লিখে তার অনুমোদনের জন্য নিয়ে আসতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন, সে খসড়ায় আমি কী লিখব। বললাম, লিখব যে, নির্বাচন গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। কিন্তু স্বভাবতই নির্বাচন বিভাজক প্রক্রিয়া। এখন নির্বাচন হয়ে গেছে, গণতন্ত্রের প্রয়োজনও মিটেছে; এখন সবার উচিত ভেদাভেদ ভুলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ও অর্থনীতির পুনর্নির্মাণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা। আমার বক্তব্য শেষ না হতেই পাশ থেকে গাজী গোলাম মোস্তফা বলে উঠলেন : ‘না, অইবো না।’

 

বেয়াদবির সঠিক সংজ্ঞা কী?

আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন অইবো না গাজী সাহেব? তিনি বললেন, ‘অরা বেয়াদবি করছে। কনটেস্ট করছিল ক্যান? উনি (প্রধানমন্ত্রী) ভিক্টোরি মার্চে যাইবো।’ এতক্ষণ মুজিব ভাইয়ের বাঁ-হাত ছিল আমার কাঁধের ওপর। তিনি সে হাত নামিয়ে নিয়ে আগ্রহসহকারে ডান দিকে মোড় ঘুরে গাজী গোলাম মোস্তফার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘গাজী, তোরা তো ভিক্টোরি মার্চ করবি, কোন রুটে যাবি, সিকিউরিটির কী হবে?’ মার্ক টালির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম হতাশা মূর্ত হয়ে উঠেছে সে মুখে। চোখ ঠেরে তিনি ইশারা করলেন আমাকে। মুজিব ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। পুরনো গণভবন থেকে বেরিয়ে এসে মার্ক বললেন, ‘সিরাজ, মাই হার্ট ব্লিডস ফর দিস ম্যান’Ñ সিরাজ, এই লোকটার জন্য আমার হৃদয়ের রক্ত ঝরছে।

ভারাক্রান্ত মনে প্রায় নীরবে হাঁটতে হাঁটতে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। নির্বাচনে প্রায় সম্পূর্ণ বিজয় হয়েছে তার, বলতে গেলে একদলীয় সংসদ নির্বাচিত হয়েছে। তারপরও বিজয় মিছিল করে নামমাত্র বিরোধীদের নাকমুখ মাটিতে ঘষে দেয়ার কী প্রয়োজন ছিল? আমার মনে পড়ল, ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটরা সুন্দরবনে বাঘ শিকার করতেন। তারপর মরা বাঘের গায়ের ওপর বুট পরা পা তুলে চাকর-বাকর ও পাইক-পেয়াদাসহ ছবি তোলাতেন। আরো মনে হলো, আতাউর রহমান খান মুজিবের গুরু এবং রাজনৈতিক পিতা না হলেও চাচা ছিলেন অন্তত। তাকে ছিনতাই করে গুম করে রাখা বেয়াদবি মনে হয়নি। অন্য দিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকারÑ যে গণতন্ত্রের কথা মুজিব সারা জীবন বলে এসেছেন এবং যে গণতন্ত্রের গ্যারান্টি নতুন স্বাধীন দেশের সংবিধানে দেয়া হয়েছে। সে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বেয়াদবি বলায় মুজিব প্রতিবাদ করলেন না, বরং খুশি হলেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আমার বহু সাক্ষাৎকার ও আলোচনার মধ্যে এ বৈঠকটার কথা আমার বিশেষ করে মনে পড়েছিল, ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লে: জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথে একান্ত বৈঠকের পরে। জিয়ার কথায় আমার প্রতীতি হয়েছিল যে, ঐক্যবদ্ধ জাতির সাহায্য-সমর্থন নিয়েই তিনি দেশের সমস্যাগুলোর সমাধান করতে চান। অথচ ১৯৭৩ সালের ৯ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে ভাষণ দিতে অস্বীকার করেছিলেন।

যে বাংলাদেশে এবং যে সমাজে আমার জন্ম হয়েছিল, ‘আদব-কায়দা’ কথা দুটো সে সমাজের মূলমন্ত্র ছিল বলা চলে। সবাইকে, বিশেষ করে বয়সে ও গুণে যারা বড় তাদের সম্মান করে চলতেই হবেÑ এ শিক্ষা শৈশব থেকে সবাই দিয়েছেন আমাদের। কিন্তু বাংলাদেশে এখন যারা বড় হচ্ছে, কী ঐতিহ্য নিয়ে তারা গড়ে উঠবে? সকাল-সন্ধ্যা তারা টেলিভিশনে মন্ত্রী ও নেতাদের মুখে শুনছে গালাগালি, খিস্তিখেউর। জিয়া আর বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংসদে, জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে যেসব গালিগালাজ করছেন, সেগুলো প্রচার করতে মিডিয়া বাধ্য হচ্ছে। আর অবুঝ শিশুরা সর্বক্ষণ শুনছে সেসব কথা। তারা নিশ্চয়ই ধরে নিচ্ছে, বড় হতে গেলে এ ভাষাতেই কথা বলতে হবে।

 

গালাগালির কোরাস

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও নেতাদের মুখে এসব গালিগালাজের কিছু কারণ বুঝতে পারি। দুর্বল শরীরের মতো দুর্বল এবং শোকাতুর মানসেও কল্পনা প্রবল হয়। প্রায় ছয় বছর দিল্লিতে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাদের হেফাজতে থেকেছেন শেখ হাসিনা। ওখান থেকেই তিনি দেখেছেন জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য, সবার সমন্বয়ে দেশের বহুবিধ সমস্যা সমাধানের জন্য অকান্ত পরিশ্রম করছেন আর সেজন্য সবাই তার প্রশংসা করছে। অন্য দিকে তার পিতার সাড়ে তিন বছরের শাসনের সমালোচনা হয়েছিল সর্বত্র। তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের যে ভাষ্যটি তখনকার ঘনিষ্ঠ মহল শিখিয়েছে, সেটিকে দেববাক্যবৎ বিশ্বাস করে তিনি মনে মনে সঙ্কল্প করছিলেন যে, জিয়াউর রহমানের সুনাম নষ্ট করার জন্য দেশে ফিরে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করবেন। তার দেশে ফেরার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জিয়া শহীদ হয়েছেন। গোড়া থেকেই জিয়ার চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে বিশেষ ফল হয়নি এবং হচ্ছে না। এখন জিয়ার সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনের অভাবই দেশের মানুষ বোধ করছে। ক্ষমতাসীনদের আক্রোশ তাতে বেড়ে যাচ্ছে।

শৈশবে যদি কেউ শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের ভাষা শিখেও থাকেন, আক্রোশ ও প্রতিশোধ বাসনার উদগ্রতার কারণে সেসব তিনি ভুলেন। যাকে তুষ্ট করতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব মন্ত্রী ও নেতারাও অশোভন ভাষা রপ্ত করেছেন। নেতানেত্রী যদি বলেন হুক্কা, ভক্তরা সমস্বরে হুয়া-হুয়া বলে প্রতিধ্বনি তোলেন। মাহবুব-উল আলম হানিফ প্রমুখ, যারা এককালে আওয়ামী লীগের নিচের কাতারে থেকে খেটেছেন, তারা নেতৃতোষণ করে যথেষ্ট প্রতিপত্তি অর্জন করেছেন এবং অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে শোনা যায়। তারা যখন তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানেও দেশের মানুষের অবিসংবাদিত নেত্রী খালেদা জিয়া সম্বন্ধে অপমানকর ভাষা ব্যবহার করেন, তখন বিস্মিত হওয়ার কারণ ঘটে না।

সম্প্রতি কোরাসে তারেক রহমানকে গালাগাল শুরু করেছেন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা। সকাল-সন্ধ্যা তাদের মুখে ‘তারেক-বন্দনা’। তার পরিবর্তে সে সময়টা তারা যদি একসাথে বসে আল্লাহ-রাসূলের নামোচ্চারণ করতেন, দুটো দোয়া-দরুদ পড়তেন তাহলে তাদের কিছু আধ্যাত্মিক ও পারত্রিক কল্যাণ হতে পারত। স্বভাব-বাচাল মন্ত্রী কামরুল ইসলাম হঠাৎ করে সিগমুন্ড-ফ্রয়েডের সাগরেদ হয়ে গেছেন; বলেছেন, তারেক রহমান মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভুগছেন। ওবায়দুল কাদের সাধারণত প্রগলভ নন। তিনিও বলেছেন, ‘দেশ তারেক রহমানের হাতে পড়লে সর্বনাশ হয়ে যাবে’Ñ যেন দেশের সর্বনাশ হতে কিছু বাকি রেখেছে এই সরকার। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সম্ভ্রান্ত পরিবার সম্বন্ধে আমি অবগত। হয়তো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার গরজে তিনিও নিন্দার কোরাসে যোগ দিয়েছেন। বলেছেন, ‘তারেক রহমান চরম বেয়াদব ছেলে।’

 

তাসের ঘর খসে পড়েছে

কারণটাও কারো জানতে বাকি নেই। আওয়ামী লীগের দাবি কতকগুলো অসত্যের ওপর স্থাপিত একটা তাসের ঘর ছাড়া আর কিছু নয়। এতকাল জেনে-শুনেও অনেকে মুখ বন্ধ করে থেকেছেন। তারা স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান দিতে চেয়েছেন। ভেবেছেন রাজনীতির বর্তমান উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে মুজিবের ভাবমূর্তিকে আবার মর্যাদার আসনে স্থাপন করা যাবে। কিন্তু ‘সুখে থাকলে ভূতে কিলায়’। দিনরাত দলনেত্রী এবং তার অনুকরণে আওয়ামী লীগের ছোট-বড়-পাতিনেতারা শহীদ জিয়া ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করে চলেছেন। তারা আশা করছেন, জিয়া পরিবারকে ঠেলে নিচে নামানো গেলে শেখ পরিবারের মাথা উঁচু দেখা যাবে। তারা বুঝতে পারছেন না, ঢিল ছুড়লে পাটকেলটি খেতে হয়। সত্যটি বেরিয়ে গেলে পরিণতি হবে তাদের আশার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেটাই ঘটছে এখন। তারেক রহমান হয়তো আর চুপ করে থাকা বাঞ্ছনীয় বিবেচনা করছেন না। তিনি সত্য উদঘাটন করতে শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগে এবং তাদের অবৈধ সরকারের আঁতে এখন মারাত্মক ঘা লেগেছে। মন্ত্রীদের চোপাবাজি সেজন্য।

গায়ের জোরে আওয়ামী লীগ দাবি করছিল যে, জিয়াউর রহমান নন, মুজিবই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অনেকেই সে দাবি বিশ্বাস করেননি। অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে তারেক সে দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এর জের ধরে ওয়াকিবহালরাও এখন মুখ খুলছেন। মরহুম তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমীন আহমদ তার তথ্যবহুল বইতে লিখেছেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া লিখে এবং সে ঘোষণা বাণীবদ্ধ করার জন্য টেপ রেকর্ডার নিয়ে মুজিবের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানিরা বিরক্ত হবে, ভবিষ্যতে সে রেকর্ডিং তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবেÑ এই অজুহাত দেখিয়ে মুজিব সে ঘোষণা রেকর্ড করতে অস্বীকার করেছিলেন। তাজউদ্দীন আরো বলেছিলেন, মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে তিনি অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলেন। শারমীন আহমদের বইয়ের জের ধরে মুজিবের আমলের সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহও এখন বলছেন, জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং সে ঘোষণায় তিনি নিজেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বলেও উল্লেখ করেছিলেন। অথচ তারেক রহমান সম্প্রতি ঠিক এ কথাগুলোই বলেছিলেন বলে তার বিরুদ্ধে বিষোদগারের তোপ দাগা শুরু হলো। কিন্তু তাতে আর কোনো লাভ হবে না। তথ্যাভিজ্ঞরা যখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন তখন আরো মুখ খুলে যাবে এবং থলে থেকে আরো বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

জিয়ার শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে লন্ডনের এক সভায় তারেক আরো কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসন ছিল ব্যর্থ শাসন। সে কথা সারা দুনিয়ার মানুষ দেখেছে, শুনেছে। বহু সাংবাদিক ও ভাষ্যকার লিখেছেন এবং ঢাকার যেকোনো চায়ের দোকানে অজস্রবার আলোচিত হয়েছে, দুর্নীতি, অশাসন-কুশাসনে যখন বাংলাদেশ তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্রোতের মতো স্তাবক ও চাটুকার এসেছে পুরনো গণভবনে। তারা তাকে ফুলের মালা দিয়েছে, স্তবস্তুতি আর কবিতা শুনিয়েছে। আমি নিজেও বিবিসি থেকে সে সময়কার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট আর কলাপাতায় জড়িয়ে লাশ দাফনের প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ প্রচার করেছি। সেসবের কিছু কিছু আমার ‘ইতিহাস কথা কয় ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ’ বইতে (প্রকাশক শিকড়, বাংলাবাজার, ঢাকা) সঙ্কলিত হয়েছে। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে যে ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল, সেটা কোনো কল্পকথা নয়, সৌভাগ্যবশত বহু প্রত্যক্ষদর্শী আজো জীবিত আছেন।

বোবা আক্রোশ এবং হনুমানের লেজের আগুন

তারেক রহমান লন্ডনের সে সভায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণীর নথি সূত্রে ১৯৭৩ সালের ৬ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি থেকে একটা উদ্ধৃতি দেন। সে বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে দুই হাজার ৩৫টি গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটেছে; দুষ্কৃতকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন চার হাজার ৯২৫ জন।’ তারেকের এ উক্তি যে মিথ্যা ছিল না, সেটা প্রমাণ করা মোটেই কঠিন নয়। তারেক রহমান এর পরে বলেছেন, ‘মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলেও একই ভাবে গুম-খুন-অপহরণ অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এবং সন্ত্রাস যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’ তার এ উক্তিগুলোর সত্যতা প্রমাণ করার জন্য কোনো দলিল-দস্তাবেজের প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের প্রত্যেক নর-নারী-শিশুর চোখের সামনে এখন কিস্তি-বন্দী হত্যাকাণ্ড চলছে। প্রতিদিনই মিডিয়ায় হত্যা ও সহিংসতার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের হত্যাকাণ্ড এটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সরকারের পুলিশ-র‌্যাব অনেক ক্ষেত্রে কন্ট্রাক্ট কিলিং চালাচ্ছে।

এমনিতেই তারেকের ওপর সরকার ও মন্ত্রীরা ক্রুদ্ধ। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে মন্ত্রীদের ক্রোধের মাত্রা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারেক রহমান তথ্যভিত্তিক কথা বলছেন। প্রকৃত তথ্য বাংলাদেশের বর্তমান কোনো মন্ত্রী জানেন বলে আমার মনে হয় না। সেজন্যই তারেকের কথার প্রতিবাদ কথার হিম্মত তাদের নেই। বিপদ হয়েছে সেখানেই। বোবা আর তোতলা কথা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। সে ব্যর্থতা তাকে ক্রোধে অস্থির করে তোলে; সে কান্নায় ফেটে পড়ে। তারেক রহমানের সমালোচনাগুলো মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে মন্ত্রীরা কিছু স্বস্তি পেতেন, তাদের গৃহপালিত মিডিয়া প্রচুর লাফালাফি করতে পারত। সেটা তারা পারছেন না। তারেকের সমালোচনায় সেজন্যই তাদের লেজে আগুন ধরে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, লেজের আগুন বিপজ্জনক হতে পারে। রামায়ণের কাহিনীতে হনুমানের লেজের আগুনে লঙ্কা দ্বীপ জ্বলেপুড়ে গিয়েছিল। সরকারের মন্ত্রীদের হাবভাবে মনে হয়, বিনা বাধায় দুর্নীতি আর নির্যাতন ও হত্যা চালাতে না পারলে লেজের আগুনে দেশটাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিতেও তাদের আপত্তি নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিগত কয়েক দিনে এমন কিছু কথাবার্তা উঠেছে, যাতে রাজনীতির তাপমাত্রা আরো বেড়ে যেতে বাধ্য। দুঃখের বিষয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সেজন্য অনেকখানি দায়ী। রাজনীতিতে এখন জন্মবৃত্তান্তের কথা উঠেছে। এ বৃত্তান্ত নিয়ে বেশি টানাটানি করা হলে আরো কোনো কোনো জন্মের অপ্রীতিকর বৃত্তান্ত বেরিয়ে আসতে পারে। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে প্রধানমন্ত্রী নাকি তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনতেন। কিন্তু জিয়ার ঘাতক ও ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় প্রকাশ পেলে আরো অভিযোগ উঠবে ভবিষ্যতে। অভিযোগ আরো আগের ঘটনাবলি নিয়েও উঠতে পারে। সুতরাং ‘সাধু সাবধান’।

(লন্ডন, ০৩.০৬.১৪)

বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান

serajurrahman34@gmail.com

You Might Also Like