আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সঙ্ঘাত কেন ও কত দূর?

নাগোরনো-কারাবাখে যুদ্ধবিরতির আহ্বান উপেক্ষা করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। সর্বশেষ, আজারবাইজান তাদের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর গাঞ্জেতে আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনী হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। নাগোরনো-কারাবাখের সীমান্তবর্তী তাদের আরো দু’টি শহরে গোলা বর্ষণের অভিযোগ করেছেন আজেরি প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এতে দুই দেশের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে মোড় নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এর আগে বিতর্কিত অঞ্চলটির একটি শহর ও সাতটি গ্রাম দখলে নেয়ার দাবি করে আজারবাইজান। অন্য দিকে, নাগোরনো-কারাবাখে বসবাসরত আর্মেনয়ীয়দের নিরাপত্তায় ‘সব ধরনের উপায়’ ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছে আর্মেনিয়া। তুরস্ক এই সঙ্ঘাতে সরাসরি আজারবাইজানের পক্ষ নিয়েছে। নৈতিক সমর্থন দেয়ার পাশাপাশি আঙ্কারা আজারবাইজানকে সামরিক সহযোগিতা দেয়ার কথাও ঘোষণা করেছে।

নাগোরনো-কারাবাখ বিরোধ
নাগোরনো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। এই অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা, মাঝে মধ্যে উত্তেজনা তৈরির পাশাপাশি সামরিক সংঘর্ষও হয়েছে।

এই বিরোধ মেটাতে ‘মিনস্ক গ্রুপ’ নামে একটি মধ্যস্থতাকারী দল কয়েক বছর ধরে আলোচনা চালিয়ে আসছে, যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতাবিষয়ক সংস্থা ওএসসিই। কিন্তু সঙ্কট যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে।

তুরস্কের বক্তব্য হচ্ছে, এত বছরের কূটনৈতিক চেষ্টা ও রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার পরেও এই সঙ্কটের কোনো সমাধান হয়নি। জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব অনুসারে নাগোরনো-কারাবাখ থেকে আর্মেনীয় বাহিনীকে বিদায় করে আজারবাইজান ওই অঞ্চলের পুনর্দখল করার মাধ্যমে সেখানে স্থিতি ও শান্তি ফিরে আসবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরো সময়ে এই অঞ্চল ছিল আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত। সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর এই অঞ্চল আজারবাইজানের অংশ হিসাবেই স্বীকৃত হয়। আর্মেনিয়ার সেনাবাহিনী ১৯৯২ সালে জাতিগত আর্মেনীয়দের সহায়তায় আজারবাইজানের নিয়ন্ত্রণ থেকে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল দখল করে নেয়। এটি দখলের পর জাতিগত আর্মেনীয়রা এটিকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আজারবাইজান এটি মেনে নেয়নি। আর্মেনিয়াও এলাকাটিকে তাদের দেশের অংশ বলে দাবি করে।

সঙ্ঘাতের ইতিহাস
৪,৪০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নাগোরনো-কারাবাখের মোট জনসংখ্যা দেড় লাখের মতো। এটি দক্ষিণ ককেশাসের একটি স্থলবেষ্টিত অঞ্চল, কারবাক পাহাড়ি পরিসীমার মধ্যে, নিম্ন কারবাখ এবং জংজুরের মধ্যে অবস্থিত এবং ক্ষুদ্রতর ককেশাস পর্বতমালার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পরিসীমাকে আচ্ছাদন করে রেখেছে। এই অঞ্চলের বেশির ভাগই পাহাড় এবং বনভূমি। নাগোরনো-কারাবাখের পরিবেশ ওক, হর্নিম, এবং বীচবৃক্ষের ঘন বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে কুরার নিম্নভূমির প্রান্তর থেকে আলাদা হয়েছে। এই অঞ্চলে প্রচুর খনিজ ঝরনা এবং দস্তা, কয়লা, সিসা, সোনা, মার্বেল এবং চুনাপাথরের মজুদ রয়েছে। আঙ্গুর-খেত, বাগান এবং রেশম পোকার জন্য তুঁত গাছগুলো উপত্যকায় গজিয়ে উঠেছে।

নাগোরনো-কারাবাখ আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮৮ সালে কারাবাখ আন্দোলনের সূচনা হওয়ার পর থেকে আজারবাইজান এই অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান সরকারের প্রতিনিধিরা এই অঞ্চলের বিতর্কিত অবস্থান সম্পর্কে ওএসসিই মিনস্ক গ্রুপের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা করছে।

সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময়ে, পারস্যে মুসলিম বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলটি মুসলিম আরবদের দ্বারা জয়লাভ করেছিল। পরবর্তীকালে এটি খিলাফত কর্তৃক অনুমোদিত স্থানীয় গভর্নরদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল। সোভিয়েত যুগে নাগোরনো-কারাবাখ ছিল স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে কারাবাখ ট্রান্সককেশীয় গণতান্ত্রিক ফেডারেটিভ রিপাবলিকের অংশ হয়েছিল। পরের দু’বছর (১৯১৮-১৯২০), কারাবাখসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলজুড়ে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে একাধিক সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ হয়।
১৯১৮ সালের জুলাইয়ে, নাগোরনো-কারাবাখে প্রথমে আর্মেনীয়রা একটি জাতীয় কাউন্সিল এবং সরকার গঠন করে। পরে অটোম্যান সেনাবাহিনী কারাবাখে প্রবেশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্যের পরাজয়ের পরে ব্রিটিশ সেনারা কারাবাখ দখল করে নেয়। ১৯২০ সালে বলশেভিকরা আজারবাইজানকে দখল করে। ১৯২১ সালে আর্মেনিয়া এবং জর্জিয়াও বলশেভিকরা দখল করে নেয়। নাগোরনো-কারাবাখ স্বায়ত্তশাসিত এলাকা ৭ জুলাই ১৯২৩ সালে আজারবাইজান সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কারাবাখকে আর্মেনীয়রা আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের সাথে একীকরণের পক্ষে বিক্ষোভ শুরু করে। ১৯৮৯ সালের ২৯ নভেম্বর নাগোরনো-কারাবাখে প্রত্যক্ষ শাসনের অবসান ঘটে এবং অঞ্চলটি আজারবাইজানের প্রশাসনে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৮৯ সালে নাগোরনো-কারাবাখের জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার। তখনকার জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশ আর্মেনীয় ও রাশিয়ান এবং কুর্দি সংখ্যালঘুসহ ২৩ শতাংশ আজারবাইজানি। ১৯৯১ সালের ২৬ নভেম্বর আজারবাইজান নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলটি প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। তবে ১৯৯১ সালের ১০ ডিসেম্বর নাগোরনো-কারাবাখের আর্মেনীয়রা একটি ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ গঠনের কথা ঘোষণা করে। পরবর্তীকালে আর্মেনিয়া থেকে সমর্থন পেয়ে আজারবাইজান এবং নাগোরনো-কারাবাখের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে এই সঙ্ঘাতে হাজার হাজার হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং উভয় পক্ষে কয়েক লাখ শরণার্থী তৈরি হয়। ১৯৯৪ সালের মে অবধি আর্মেনিয়ানরা আজারবাইজানের ১৪% অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং রাশিয়ার আলোচনার মাধ্যমে ১৯৯৪ সালের ১২ মে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছে।

২০০৭ সালের ১৫-১৭ মে ইসলামী সম্মেলন সংগঠনের (ওআইসি) পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী কাউন্সিলের ৩৪তম অধিবেশনে রেজোলিউশন ৭/৩৪-পি গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবে আজারবাইজানি অঞ্চল দখলকে আর্মেনিয়ার আগ্রাসন হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং আজারবাইজানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ১৪ই মার্চ জাতিসঙ্ঘের গৃহীত সাধারণ অধিবেশন রেজোলিউশন ৬২/২৪৩ এ ‘আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রের সমস্ত দখলকৃত অঞ্চল থেকে সমস্ত আর্মেনিয়ান বাহিনীকে তাৎক্ষণিক, সম্পূর্ণ এবং শর্তহীন’ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

২ জানুয়ারি ২০১৬, ইউরোপ কাউন্সিলের সংসদীয় সংসদ (পেইস) কর্তৃক রেজোলিউশন ২০৮৫ গৃহীত হয়। এতে বলা হয়, নাগোরনো-কারাবাখ এবং আজারবাইজানের সংলগ্ন অঞ্চলে আর্মেনিয়ার দখল আজারবাইজানের নাগরিকদের জন্য মানবিক ও পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আজারবাইজানিদের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে আর্মেনিয়ান সশস্ত্র বাহিনী অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হয় প্রস্তাবে।

তুরস্কের সম্পৃক্ততা
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে আজারবাইজান তুরস্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুরস্ক বিভিন্ন সময়ে আজারবাইজানকে নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। নব্বই-এর দশকের শুরুর দিকে যুদ্ধের সময় আজারবাইজানে অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছিল তুরস্ক। ২০১০ সালে দুই দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তিতে সই করেছে।

এবারের সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর আজারবাইজানের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন প্রকাশ করেছে তুরস্ক। তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, আজারবাইজানকে তারা ‘সব ধরনের’ সহায়তা দেবেন। আর্মেনিয়াকে তিনি ওই অঞ্চলে শান্তির জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে সারা বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়েছেন আর্মেনিয়ার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।

তুরস্কের একজন বিশ্লেষক ইলহান উজগেল বলেছেন, ‘তুর্কি সৈন্যরা ফ্রন্ট লাইনে থাকবে না। আজেরি বাহিনীর তাদের প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে, আঙ্কারা সবসময়ই বাকুর সামরিক মিত্র। আজারবাইজানের সামরিক বাহিনীকে তারা আগে থেকেই সমর্থন দিচ্ছে। প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেয়া ছাড়াও তারা বাকুর কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে।’

বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধে তুরস্ক কতটা অগ্রসর হবে সেটা নির্ভর করে রাশিয়ার অবস্থানের ওপর। কারণ দক্ষিণ ককেশাসে আধিপত্য বিস্তার করে রাশিয়া। সে কারণে আঙ্কারা চাইবে না মস্কোর সাথে সরাসরি সামরিক সঙ্ঘাতে জড়াতে। এর পরেও তুরস্কের আজারবাইজানের পক্ষ নেয়ার অন্যতম কারণ হলো জ্বালানি স্বার্থ।

ককেশাসের ওই অঞ্চল জ্বালানির উৎস এবং সরবরাহ ব্যবস্থা- এই দুই কারণেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরের মে মাসে তুরস্ক তার এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস আমদানি করেছে আজারবাইজানের কাছ থেকে। কাস্পিয়ান সাগরে পাওয়া তেলও আজারবাইজান তুরস্কের কাছে বিক্রি করে থাকে। আজারবাইজানের কারণে গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর তুরস্কের নির্ভরশীলতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্রাস পেয়েছে।

রাশিয়ার সাথে তুরস্কের জ্বালানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালে। আঙ্কারার পরিকল্পনা হচ্ছে, এরপর তারা ট্রান্স আনাতোলিয়ান গ্যাস পাইপলাইন দিয়ে আজারবাইজান থেকে গ্যাস এনে চাহিদা পূরণ করবে।
এ বছরের জুলাই মাসে আজারবাইজানের তভুজ অঞ্চলে আর্মেনিয়ার সাথে যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ হয়েছিল তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে আঙ্কারা। যে পাইপলাইনের সাহায্যে তুরস্কে গ্যাস সরবরাহ করা হয় তার খুব কাছেই ওই এলাকা। আজারবাইজানের গ্যাস ইউরোপে পাঠাতে হলেও সেটা তুরস্কের ভেতর দিয়ে ট্রান্স আনাতোলিয়ান গ্যাস পাইপলাইনের সাহায্যে পাঠাতে হবে।

এ ছাড়া আজারবাইজানের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। দুটো দেশ নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘এক জাতি, দুই দেশ’ এই নীতিতে বিশ্বাসী। শুধু রাষ্ট্রীয় বা সরকারি পর্যায়ে নয়; তুরস্ক ও আজারবাইজানের সাধারণ জনগণও তাদেরকে ‘একই জাতি’ বলে মনে করে। তুর্কি ও আজেরিরা বিশ্বাস করে যে, তাদের উৎস এক এবং তারা একই রক্ত, ইতিহাস ও সংস্কৃতির উত্তরসূরী।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের একেবারে শেষের দিকেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ছিল। ১৯১৮ সালে আজারবাইজান আর্মেনিয়া ও রাশিয়ার দিক থেকে আক্রমণের মুখে পড়লে বাকুকে রক্ষার জন্য অটোম্যান সাম্রাজ্য তাদের সামরিক সহযোগিতা দিয়েছিল। তারাই আজারবাইজানকে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রথম স্বীকৃতিও দিয়েছিল।

সে সময় আজারবাইজান ও অটোম্যান শাসকদের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে উল্লেখ ছিল যে, নতুন রাষ্ট্রটি যখনই হুমকির মুখে পড়বে তখনই তারা অটোম্যান সাম্রাজ্যের কাছে সামরিক সহযোগিতা চাইতে পারবে। তার পরপরই বাকুকে রক্ষার জন্য সেখানে অটোম্যান বাহিনী পাঠানো হয়েছিল।

পরে ১৯২০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে আজারবাইজানের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আজারবাইজান আবার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন এই দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে এবারও তুরস্ক বিলম্ব করেনি। তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক সবসময় একই রকমের উষ্ণ রয়ে গেছে।

আজারবাইজানকে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এমনকি সামরিক- যেকোনো ধরনের সমর্থন দেয়ার জন্য তুরস্কের রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকেও সরকারের ওপর চাপ রয়েছে। বর্তমানে এরদোগানের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ প্রধান বিরোধী দলও তুর্কি জাতীয়তাবাদী। উভয়েই আজারবাইজানের পক্ষে। বাকুকে সমর্থন দেয়ার পক্ষে তুর্কি জনগণও। এ বছরের জুন মাসে তুরস্কের কাদির হেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশেরও বেশি তুর্কি মনে করে যে, আজারবাইজান তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

কত দূর যাবে তুরস্ক
এই যুদ্ধে তুরস্ক কতখানি অগ্রসর হবে সেটা পরিষ্কার নয়। ফ্রান্স আঙ্কারাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, তুরস্কের ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাব গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মধ্যেও কথা হয়েছে এবং তারা দু’জনেই অনতিবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ওই অঞ্চলে নতুন শক্তি হিসেবে তুরস্কের আবির্ভাব ঘটুক সেটি রাশিয়া না-ও চাইতে পারে। তুর্কি বিশ্লেষক উজগেল বলেন, ‘তুরস্কের জন্য এটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ককেশাস মূলত রাশিয়ার প্রভাবাধীন অঞ্চল। তারা হয়তো আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে তুর্কি-আজেরি সামরিক অভিযান সহ্য করবে না। তারা যদি সেখানে বড় ধরনের সামরিক সাফল্য আশা করে তাহলে মস্কোর সাথে আঙ্কারার সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রয়েছে। সেদেশে রয়েছে তাদের সামরিক ঘাঁটিও। আজারবাইজানের সাথেও মস্কোর সম্পর্ক ভালো এবং দুই দেশের কাছেই তারা অস্ত্র বিক্রি করে থাকে। ওই অঞ্চলে রাশিয়ার নীতি হচ্ছে- শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা।

এই যুদ্ধে যদি তুরস্ক জড়িয়ে পড়ে তাহলে সেটা মস্কোর জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই দক্ষিণ ককেশাসে সামরিক অভিযানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তুরস্ক নিশ্চয়ই রাশিয়ার কথা বিবেচনা করবে। অনেকে মনে করেন, এই যুদ্ধে তুরস্ক হস্তক্ষেপ করলে সেটা রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিতে পারে। সিরিয়া ও লিবিয়ার ইস্যুতে তাদের মধ্যে ইতোমধ্যেই কিছু বিরোধ তৈরি হয়ে গেছে। তবে তুরস্কের সাথে রাশিয়ার বড় একটি স্বার্থসম্পৃক্ততা এবং বোঝাপড়াও রয়েছে। কিছু বিরোধ থাকলেও রাশিয়ার সাথে সিরিয়া বা লিবিয়ায় প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাত তৈরি হয়নি আঙ্কারার। দু’পক্ষই সঙ্ঘাত এড়িয়ে গেছে। আর্মেনিয়া-আজারবাইজান ইস্যুতেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে বলে মনে হয় না।

নতুন সমীকরণ
বিরোধপূর্ণ এই অঞ্চলে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আজারবাইজান ‘প্রতিরক্ষা সময়’ শেষ করেছে। তারা আর্মেনিয়ার আক্রমণে জমি হারিয়েছে, গণহত্যার শিকার হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশটি প্রথমবারের মতো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্য দিকে আর্মেনিয়া এবার প্রথমবারের মতো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছে।

বর্তমান সঙ্ঘাতটি আজারবাইজানের জন্য নিজেদের রক্ষা তথা ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’। আর্মেনিয়ায় তারা আক্রমণকারী নয়; আজারবাইজানি ভূখণ্ডে সন্ত্রাসবাদী দখলের অবসানের জন্য তারা লড়াই করছে। ফলে নৈতিক অবস্থান আজারবাইজানের অনেক মজবুত।

নাগোরনো-কারাবাখ ১৯৯২ সাল আর্মেনিয়া দখলে নেয়ার পর থেকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইয়েরেভানকে চারবার এই অঞ্চল থেকে সরে আসার নির্দেশ দেয়, তবে আর্মেনিয়া সরকার তা মানতে অস্বীকার করে।

বাকু বিশ্বাস করে যে, আর্মেনিয়ার প্রায় ৩০ বছরের দখল শেষ করার এবং এর অধিকৃত অঞ্চলগুলো পুনরায় দাবি করার সময় এসেছে। অন্য কথায়, নাগোরনো-কারাবাখ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আজারবাইজান তার সামরিক অভিযান শেষ করবে না। রাশিয়া যদি নীরবতা অবলম্বন করে, বাকুতে সরকার যা চায় তাই পেতে পারে। যদি আজারবাইজান নাগোরনো-কারাবাখকে ফিরিয়ে নিতে পারে এবং এর অঞ্চলগত অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার করে তবে ককেশাসের উত্তেজনার একটি উৎস বন্ধ হতে পারে।

মূল্য দিতে হবে আর্মেনিয়াকে?
এটি ঠিক, আজারবাইজানের তভুজ অঞ্চলে আর্মেনিয়ার হামলার পরে সহিংসতার সূত্রপাত হয়। আগ্রাসনের এই আচরণের জন্য সম্ভবত ইয়েরেভানকে ভারী মূল্য দিতে হবে। আর্থসামাজিক অবস্থা এবং সামরিক শক্তি সম্পর্কে এক তাৎপর্য নিরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, আর্মেনিয়া তার প্রতিবেশীর চেয়ে বেশ দুর্বল। নব্বইয়ের দশক থেকে আজারবাইজান আর্থিক, প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দিক থেকে বড় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। আর্মেনিয়ার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত।

১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত আজারবাইজানের জনসংখ্যা ২২ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ১১ লাখ হয়েছে, আর আর্মেনিয়ানদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে ৩৪ লাখ থেকে ২৯ লাখ হয়েছে। এই পার্থক্যটি মূলত অর্থনৈতিক কারণে। আর্মেনিয়ার জিডিপি ১৯৯২ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ২.২ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জনকল্যাণে রূপান্তরিত করা হয়নি। সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রায় ৩০% আর্মেনীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। তাই তরুণ আর্মেনিয়ানদের তাদের জন্মভূমির প্রতি আস্থা নেই। সেখানে অনেকের মধ্যে অবিবাহিত থাকা এবং পরিবার শুরু করার দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা রয়েছে, অনেকে বিদেশে চলে গেছে। সরকারি তথ্য অনুসারে, নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেয়া আর্মেনিয়ানদের এক চতুর্থাংশ ইতোমধ্যে আর্মেনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। প্রায় ১ লাখ আর্মেনীয় নাগরিক অবৈধভাবে তুরস্কে পৌঁছে পরিষেবা শিল্পে চাকরি নিয়েছে।

অন্য দিকে আজারবাইজান দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য কাজ করেছে। ১৯৯২ সাল থেকে বর্তমান সময়ে এর জিডিপি ৮.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে বেড়েছে। সামরিক ব্যয়ও আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সমৃদ্ধির ব্যবধান তৈরি করেছে। ১৯৯২ এবং ২০২০ সালের মধ্যে আর্মেনিয়ার প্রতি বছর সামরিক ব্যয় ১০ মিলিয়ন থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। অন্য দিকে আজারবাইজানের সামরিক বাজেট, ১০ মিলিয়ন থেকে ১.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি দু’দেশের মধ্যে সামরিক সক্ষমতায় বিরাট পার্থক্য তৈরি করেছে।

প্রশ্ন হলো, তবে আর্মেনিয়া কেন তার প্রতিবেশীকে আক্রমণ করেছিল? আর্মেনিয়ান নেতারা কি ধরে নিয়েছিলেন যে, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি পুতিন তাদের পেছনে থাকবেন?

আজারবাইজানের প্রতি আর্মেনিয়ার আগ্রাসন তিনটি কারণে হয়েছে। প্রথমত, রাশিয়া আর্মেনিয়ার সীমানা রক্ষা করে, তাদের দেশে রুশ সেনা ঘাঁটি রয়েছে এবং ককেশাস অঞ্চলকে রাশিয়া তার ‘বাড়ির উঠোন’ হিসেবে দেখে। দ্বিতীয়ত, ফ্রান্স তার পাশে দাঁড়াবে বলে বিশ্বাস রয়েছে আর্মেনিয়ার। সবশেষে, আর্মেনিয়ান প্রবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে বেশ শক্তিশালী, তারা সেখানে ইসরাইলি লবির সমর্থন লাভ করেছে।

জানা যাচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল প্যাসিনিয়ানের খারাপ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। আর্মেনিয়ান প্রধানমন্ত্রী কিভাবে দেশ চালাচ্ছেন তা কোনো গোপন বিষয় নয়। রাশিয়ানরা সম্ভবত তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল নীরবতা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি নিজের আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ওপর নিবদ্ধ। এ সময়ে হোয়াইট হাউজ রাশিয়ার প্রভাব ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করবে বলে মনে হয় না। আর ফ্রান্সের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেকে জড়ানোর শক্তির বেশ অভাব রয়েছে।

এসব বিবেচনায় এবার আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের সঙ্ঘাতে একটি ভিন্ন ফলও আসতে পারে। আজারবাইজানের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর আর্র্মেনিয়ার আগ্রাসী মনোভাব অব্যাহত রাখার অবকাশ হারিয়ে ফেলার সমূহ সম্ভাবনাও রয়েছে। এর প্রভাব শুধু ককেসাস অঞ্চলেই নয়; মধ্যপ্রাচ্যেও পড়তে পারে। মুসলিম উম্মাহর আস্থার জায়গা এবং নেতৃত্বেও পরিবর্তনের সূচনা ঘটতে পারে। আর এক্ষেত্রে অগ্রসর অবস্থানে চলে যেতে পারে তুরস্ক।

You Might Also Like