আজাদ রহমান : সুরের নীলিমায় ডুবে যাওয়া শুকতারা

অজয় দাশগুপ্ত

অনেকে হয়তো জানেন না, অনেক পিছিয়ে থাকা তখনকার সমাজ আর সময়ে আজাদ রহমান এমন একটা ছায়াছবি নির্মাণ করেছিলেন- যা আজকের দিনেও অনেকে নির্মাণের আগে বেশ কয়েকবার ভাববেন। আমাদের যৌবনের শুরুতে দেহমনে সাড়া জাগানো এই ছবির নাম ছিল ‘গোপন কথা’। আমাদের সিনেমার ইতিহাসে প্রথম নির্মিত শরীর বিষয়ক বিজ্ঞানভিত্তিক ছায়াছবি। যৌনতা না বলে আমি বলবো এটি ছিল শরীর ও মনকে জানার একটি বাস্তবসম্মত চলচ্চিত্র। তখনই আমরা জানতাম তিনি আধুনিক ও ব্যতিক্রমী।

কয়েকমাস করোনাভাইরাসের সংক্রমণে চলাচল ও জীবনযাপন সীমাবদ্ধ থাকার পর সিডনি এখন পুরোদমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে। তাই এখন সপ্তাহে আবার মাত্র দুদিন নিজের। যাকে বলে উইক এন্ড। শনিবার রাতে সোফায় শরীর এলিয়ে ‘গণ্ডি’ ছবিটা দেখছিলাম। দেখা শেষে ও  রেশ ছিল কিছুটা। রাতদুপুরে ঘুমাতে গিয়েই পেলাম দু:সংবাদ। আমার এক অনুজ লিখেছে “দাদা আপনি কি আজাদ রহমানকে নিয়ে লিখবেন না”? আমি তখনই ধরে নিয়েছি নির্ঘাৎ আরেকটি দু:সংবাদ আমার জন্য। এবং তাই হলো।  স্বপ্নেও ভাবিনি হঠাৎ করে এমন একটা খবর পাবো।

গুণী মানুষ, দেশখ্যাত মানুষের চলে যাওয়া সবসময় বেদনার। তাদের স্মৃতি, তাদের গুণ ও কর্ম নিয়ে বলার বা লেখার জন্য আছেন হাজার মানুষ। কিন্তু কিছু কিছু সম্পর্ক থেকে যায় মনের গভীরে। এই সম্পর্কগুলো হয়তো গড়ে ওঠে সে কারণেই যে একসময় তাই হবে বাঁচার প্রেরণা। হয়ে থাকবে আজীবন অনুগামী ছায়ার মতন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমি গান শিখিনি। গান ভালোবাসি। নিজে নিজে শৈশব থেকে গাইও। মা আমাকে বাড়িতে মাস্টার রেখে গান শেখানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু  আমার মন ছিল অন্যদিকে। আমি ভালোবাসতাম ছড়া-কবিতা লিখতে। আর গান গুণগুণ করে নিজেই বাসা বেঁধে বেঁচে রইলো মনের গোপনে। কিন্তু কেন জানিনা সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা কিংবা আমার অনুরাগ সরস্বতী বোঝেন। তা না হলে কি মান্না দে’র মতো কিংবদন্তী শিল্পীকে গান গেয়ে শোনানোর সুযোগ পেতাম আমি? সুযোগ মিলতো কি জগজিৎ সিংকে কাছ থেকে দেখার? এর বাইরেও আমাদের দেশের প্রচুর গুণী শিল্পী আমার সাথে নিবিড় বন্ধনে বাঁধা। আমি বরাবর মেনেছি এগুলো আমার শিরোধার্য কোনও আর্শীবাদ। আজ যার কথা লিখছি তার সাথে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক কিংবা স্নেহাশ্রিত হবার খুব কোনও কারণ ছিল না।

অনেক বছর আগে ‘একুশে বইমেলা সিডনি’র উদ্যেক্তারা তাকে নিয়ে একটা সেমিনার করেছিলেন। সেখানে  আমাকেও  আলোচক হিসেবে রাখেন তারা। মাঝে মাঝে তাদের দয়ার শরীর বলে এমনটা হয়। সেদিন খুব বেশিক্ষণ থাকতেও পারি নি। তেমন করে ছবিও তোলা হয় নি। আমি আমার কথাগুলো বলে এবং আজাদ রহমান ও সেলিনা আজাদকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাড়াতাড়ি চলেও এসেছিলাম। মনে আছে আমি এটা বলতে ভুলিনি- জীবনে কিংবদন্তী বা কালজয়ী হতে খুব বেশি কাজের দরকার পড়ে না। সময় উত্তীর্ণ একটি কাজই যথেষ্ঠ। তেমন কয়েকটি কাজ আছে আজাদ রহমানের আর সেলিনা আজাদ এক গানেই বাজিমাত করেছেন বাংলাদেশে।

চলে আসার পর অনেকেই বলেছিল উনি আমার কথার প্রশংসা করে আমাকে খুঁজেছিলেন। ধরে নিয়েছিলাম বড় মানুষদের সৌজন্য। কিন্তু না এরপর যখনই আসতেন ফোনে কথা হতো নয়তো বা দেখা হয়ে গল্প আর আড্ডা। অনেক না বলা কথা ছিল তার। আমি জানি না তিনি সেসব লিখে রেখে যেতে পেরেছেন কি না!  না পারলে আমাদের গানের জগত বিশেষত বাংলা খেয়াল গানের জগত মূল্যবান এক উপহার হারিয়েছে। যা আমাদের আজকের বাস্তবতায় ছিল জরুরি। মিতাভাষী মানুষ, মুখে একটুকরো হাসি লেগেই থাকতো। আধুনিক গানের আকাল আর সর্বনাশের কথা উঠলে কখনো হৈ হৈ করে ঝাঁপিয়ে পড়তেন না। মৃদুকণ্ঠে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন সর্বনাশ কোথায় হচ্ছে বা কারা করছে। তার ভেতর একটা প্রচ্ছন্ন অভিমান থাকলেও তিনি নাখোশ-নাদান টাইপের ছিলেন না। এখন যেমন আমার পদক চাই আমার স্বীকৃতি চাই আমার টাকা চাই সম্মান চাই বলে বড় বড় নামধারীদের আহাজারি তেমন কিছু দেখিনি কখনো। বরং কেমন একটা প্রসন্নতা ছিল চোখে-মুখে। তৃপ্ত মানুষের এক অসাধারণ মুখচ্ছবি ছিলেন তিনি। কতবড় মাপের সঙ্গীত পরিচালক ও সুরস্রষ্টা তা তাঁর গানগুলো শুনলেই বোঝা সম্ভব।

‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’, ‘মনেরও রঙে রাঙাবো’, ‘ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি’সহ বহু গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আজাদ রহমান। কোনওটির সুরকার তিনি, কোনওটিরও সংগীত পরিচালক। রাজ্জাক পরিচালিত প্রথম ছবি ‘অনন্ত প্রেম’-এ ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই’ গানটি ব্যবহৃত হয়। খুরশিদ আলম ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে আজাদ রহমানের সুর করা এই গানের কথা লিখেছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীত পরিচালক আজাদ রহমান ১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্ম নেন। তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খেয়ালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কলকাতার জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মিস প্রিয়ংবদা’র সংগীত পরিচালনা দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে তার পথচলা শুরু। এই ছবিতে তার পরিচালনায় গান গেয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরতি মুখোপাধ্যায়। বাংলাদেশে তিনি প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন বাবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘আগন্তুক’ ছবিতে। এরপর ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘এপার ওপার’, ‘পাগলা রাজা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘আমার সংসার’, ‘মায়ার সংসার’, ‘দস্যুবনহুর’, ‘ডুমুরের ফুল’, ‘মাসুদ রানা’সহ বহু ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।

বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আজাদ রহমানের লেখা সংগীতবিষয়ক বই ‘বাংলা খেয়াল’। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘গোপন কথা’ নামের একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন। বয়সী অনেক মানুষের মতে ‘একমুখী ট্রাফিক’ মানে কেবল নিজে বলতেন না। শুনতেনও। কী করে যেন তার ধারণা হয়েছিল- আমি ভালো লিখতে পারি। গান বাজনা বা সংস্কৃতি বিষয়ে আমার হালকা লেখাগুলো ও ভালো লাগতো তার। তিনি গল্প করেছিলেন অতীতের- কিভাবে একটা মাত্র অর্কেস্ট্রা দিয়ে ঢাকায় আধুনিকায়নের শুরু করেছিলেন, কেমন করে জন্ম দিয়েছিলেন ‘মনের রঙে রাঙাবো’ কিংবা ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’ এমন সব গানের।

বছরও পুরোয়নি এখনো এক দুপুরে অচেনা ফোন নম্বর থেকে ফোন এলো মোবাইলে।  ফোন ধরে অবাক হয়েছিলাম। অনেকদিন পর তিনি আমাকে ফোন করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি যখন দেশে থাকেন তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। গুণী মানুষ নামী মানুষ কতো কাজ তার। যোগাযোগও স্বভাবতই থিতিয়ে আসে। যদিও মনে থাকেন মনজুড়ে থাকেন।

জানলাম- তিনি  আমাকে খুঁজছেন। পরদিন তাকে ঘিরে বাংলা একাডেমি নামে সিডনির প্রতিষ্ঠানটি  আয়োজন করেছিল সেমিনার ও গান শেখার আসর। তার অনুরোধ অথবা আবদার বা আমাকে  যেতেই হবে। আমি তা আদেশ বলে ধরে নিয়েই  গিয়েছিলাম। আমার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না, কারণ জায়গাটা দূরে আর আমি স্ত্রী দীপা না থাকলেই রাস্তা গুলিয়ে ফেলি। সেবারও তাই হয়েছিল। কাছাকাছি গিয়ে গাড়ি নিয়ে একবার এদিকে যাই, আরেকবার ওদিকে। জিপিএস নামের যন্ত্রের সব আদেশ মেনে ড্রাইভারের চলা অসম্ভব। একটু বিলম্বে হলেও পৌঁছেছিলাম।

এখন মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস আমি গিয়েছিলাম সেই পড়ন্ত দুপুরে। তা না হলে আজ আমার কষ্ট আর গ্লানির সীমা থাকতো না। কোনদিন কোনকালে তার সান্নিধ্য পাবারও সুযোগ নাই আর।

যাবার পর অনুষ্ঠানের ফাঁকে  আমাদের গল্প চললো অবিরল। যতোক্ষণ ছিলাম তার পাণ্ডুলিপি, ওপার বাংলায় সমাদৃত তার খেয়াল বিষয়ক গবেষণার কথা হলো। তারপর গান।

যেখানে সেলিনা আজাদ গাইবেন সাথে তার গুণী দুই কন্যা। সেখানে আমাদের কণ্ঠ মেলানো স্পর্ধা জেনেও তাই করতে হয়েছিল। শেষটা ওখানে হতে দিলেন না। চলে আসার আগে কিছু বলতেই হবে।  আমার বলার সময়  সেলিনা আজাদের হাসি মুখ আর আজাদ রহমানের তৃপ্তিমাখা মুখ মনে করিয়ে দেয় কতোটা ভালোবাসতেন। কথা ছিল-  আবার দেখা হবে। আবার আসবেন সিডনিতে। সত্যি বলছি, এমন সুখি চমৎকার দম্পতি বিরল। সাধারণত শিল্পী  বা গুণী দম্পতিদের ভেতর ফারাক থাকে বেশি, কিন্তু যারা তাদের চেনেন সবাই জানেন কতটা গূঢ় আর মনোময় ছিল তাদের বন্ধন। আজ সে বন্ধন ছিঁড়ে গেছে। সেলিনা  আজাদের জন্য মনটা বিষাদে ভরে আছে।

আজাদ রহমান বাংলাদেশে নানা কারণে অগ্রদূত। তাকে সময় মূল্যায়ন করবেই। মনে রাখবে লাখো কোটি মানুষ, মনে রাখবে আগামী দিনের গায়ক-গায়িকা, সঙ্গীত প্রেমিকেরা। প্রয়াত সুরকার গায়ক  আজাদ রহমানকে ভোলা অসম্ভব আমার।

ভালো থাকবেন আপনি। প্রণাম।

You Might Also Like