আজকের বাংলাদেশ

রুমীন ফারহানা

রুমীন ফারহানা‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে ভাবতে ভালোই লাগে’—একসময়ের বহুল আলোচিত একটি বিজ্ঞাপনের কথা এটি। দেশ এগিয়েছে কতটা কিংবা ঠিক কোন ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি আর এই অগ্রগতির সুফলটাইবা কাদের ভাগে পড়ছে সে আলোচনায় যদি নাও যাই তবু একথা মানতে হবে যে দেশ আজ ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে ‘উন্নয়নশীল’ হওয়ার প্রথম ধাপ অতিক্রম করেছে। যদিও এর ফলে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে, তারপরও খবরটি নিঃসন্দেহে আনন্দের।

চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে এতদিন পাওয়া ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য সুবিধা কমে যাবে। কম সুদে বিদেশি ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। তাই স্বাভাবিকভাবেই অর্থের জোগান দিতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। এটুকু অন্তত বলা যায়, ৪ কোটি ৮২ লক্ষ কর্মক্ষম অথচ শ্রমশক্তির বাইরে থাকা বেকার নিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সত্যিই কঠিন হবে। বিশেষ করে যখন অবকাঠামোগত সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঋণের উচ্চ সুদহার, ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ এমনিতেই স্থবির। তার ওপর আছে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হওয়ার চাপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে ৯টি ব্যাংক মূলধনও খেয়ে ফেলেছে। কখনও মূলধন ঘাটতি বা প্রভিশন ঘাটতি পূরণের নামে, কখনোবা মূলধন পুনর্গঠন বা মূলধন পুনর্ভরণের নামে ব্যাংকগুলোকে আগে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব বলছে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে এখন ১৭ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। আর এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে তা করতে হবে জনগণের করের টাকায়। জনগণের টাকা মেরে গুটিকয়েকের আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া এবং আবার সেই জনগণের টাকাই ভর্তুকি হিসাবে ব্যবহার বোধকরি কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। ঋণখেলাপি আর অর্থ পাচারসহ ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে IMF-এর প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকার। Transparency International-এর প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতির সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৩তম।

দেশ যখন ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে ‘উন্নয়নশীলে’ উত্তরণ উদযাপনে ব্যস্ত ঝলমলে শোভাযাত্রা, আতশবাজি, লেজার শো, সঙ্গীত নৃত্য পরিবেশনসহ ৭ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায়, তখনই আরেকটি খবর দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্র দখল করে আছে। আর তা হলো বিশ্বের নতুন পাঁচ স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নাম এসেছে বাংলাদেশের। ‘বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড পর্যন্ত মানা হচ্ছে না’ বলে মন্তব্য করেছে ‘বেরটেলসম্যান স্টিফটুং’ নামের একটি জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি সরকারি দল। বিষয়টিতে কোনও দুষ্টচক্রের দুরভিসন্ধি খুঁজে পাওয়া থেকে শুরু করে হিটলারের দেশ থেকে গণতন্ত্রের সবক নিতে তীব্র ভাষায় অস্বীকৃতি জানিয়েছে সরকারে থাকা অনেকে।

যদিও এর আগেই বাংলাদেশের স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো। World Justice Project বলছে, আইনের শাসন সূচকে ১১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২। Reporters Without Boarders-এর ২০১৭ সালের World Press Freedom Index বলছে, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ভোগের দিক থেকে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমাদের অবস্থান সবচেয়ে নিচে। প্রতিবেদনটি বলছে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তার সমালোচনাকারী ও সাধারণভাবে সংবাদ মাধ্যমের ব্যাপারে আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে, যা পরিষ্কার হয়েছে (১) সংবাদ মাধ্যমের প্রতি বৈরিতাপূর্ণ সরকারি বক্তব্য; (২) কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া;

(৩) সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রচুর মামলা দায়ের;

(৪) সাংবাদিক গুম এবং হত্যা;

(৫) বেশ কিছু শক্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে, যা সহজেই ব্যবহার করা যায় সাংবাদিক নিপীড়ন বা মানুষের বাকস্বাধীনতার বিপক্ষে।

Amnesty International-এর বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সভা সমাবেশের অধিকারের ওপর বাধা প্রদান অব্যাহত রেখেছে সরকার। চলছে গুম, বিরোধী নেতা কর্মীদের ধরপাকড়, মানবাধিকার কর্মীদের হয়রানি ও ভয় ভীতি দেখানো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। International Crisis Group-এর রিপোর্ট শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিতে পারে জঙ্গিরা।

আন্তর্জাতিক এই পর্যালোচনাগুলোকে সত্যতা দেওয়ার জন্যই যেন গত ৩৪ দিনে চারবার বিএনপি’র জনসভা করার অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বিএনপি সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্ট ভালো নয় বলেই নাকি এই ব্যবস্থা। দলটির চেয়ারপারসন জেলে যাওয়ার পরে ২২ ফেব্রুয়ারি, ১২ মার্চ, ১৯ মার্চ এবং ২৯ মার্চ জনসভা করার অনুমতি চেয়েও পায়নি দলটি। বাধ্য হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছে দলটির সিনিয়র নেতারা। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি কোনও। এর আগে ২০১৪ সালের পর থেকে ১৭ বার অনুমতি চেয়ে মাত্র তিনবার জনসভা করার অনুমতি পায় দলটি। কিন্তু কেন এই ভয়?

(১) সভা-সমাবেশ কিংবা মিটিং করার অধিকার যেকোনও দলের গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক এবং সাংবিধানিক অধিকার। বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক, দল যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল কয়েকবার। জনগণের একটি বড় অংশের সমর্থন সবসময়ই ছিল বিএনপি’র পাশে। তাই এই দলটিকে নিরাপত্তার নামে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার অর্থই হলো মানুষের গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।

 

(২) যেখানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এবং ওয়ারর্কার্স পার্টির মতো ছোট ছোট দল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি পায় সেখানে বিএনপি’র মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশের অনুমতি না পাওয়া সরকারের ভীতি এবং অসহায়ত্বকেই স্পষ্ট করে তোলে।

(৩) ডিএমপি উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় জনসভার অনুমতি দেওয়া হয়নি বিএনপি’কে। এই পর্যন্ত সরকারের তীব্র চাপে থেকে যে অল্প কয়টি জনসভা বিএনপি করতে পেরেছে তার কোনোটিতে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে বা কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

(৪) ২০১৮ নানা কারণেই রাজনৈতিকভাবে অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। এই বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। যেখানে সরকারি দল রাষ্ট্রীয় খরচে গত দেড় বছর যাবৎ দেশজুড়ে সভা সমাবেশের মাধ্যমে জনগণের কাছে ভোট চেয়ে ফিরছে, সেখানে বিএনপি’র মতো অন্যতম বড় একটি রাজনৈতিক দলকে কোনোরকম জনসংযোগ করতে না দেওয়া একটি বিষয়কেই ইঙ্গিত করে, আর তা হলো সরকার চায় আবারও ২০১৪ সালের মতো ভোটারবিহীন একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে।

(৫) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি’র উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সাক্ষাতের পর মন্ত্রী বলেছেন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অনুমতি দেবে ডিএমপি। অর্থাৎ এ বিষয়ে সরকারের করণীয় কিছু নেই। সরকার যখন জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া গঠিত হয় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা স্বাভাবিক। সুতরাং এক্ষেত্রেও মন্ত্রী মহোদয়ের কিছু করার থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।

(৬) অতীতে দেখা গেছে বিএনপি’র সমাবেশের দিন সরকার রাজধানীতে অঘোষিত হরতাল ডাকলেও সমাবেশ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব সমাবেশ ঘিরে এই যে মানুষের উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা, আগ্রহ সেটাই বিএনপির জন্য কাল হলো?

সরকার বারবার বলছে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সরকারের লক্ষ্য। লক্ষ্য সৎ সন্দেহ নেই, কিন্তু এই লক্ষ্য পূরণে সরকারের ন্যূনতম সদিচ্ছাও তো কোথাও লক্ষণীয় নয়। সরকার যদি মনে করে বিএনপি চেয়ারপারসনকে জেলে রেখে, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, মামলা, হামলা, গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যার সাহায্য নিয়ে, দলটিকে চাপে ফেলে কিংবা কয়েকটি ভাগে বিভাজিত করে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সত্যিকারের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তারা করতে পারবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। পরিশেষে বলি, গত ১০ বছরে সরকারের দাবিকৃত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের যদি শতকরা ১০ ভাগও সত্য হয় তাহলে তাদের এতটা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

You Might Also Like