আওয়ামী লীগ জামায়াতি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারবে কি?

লন্ডনে বাংলাদেশের এক মাননীয় মন্ত্রীর সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠকে আলাপ হচ্ছিল। তিনি একজন ভালো মানুষ এবং দক্ষ মন্ত্রীও। কিন্তু কতটা রাজনীতি-অভিজ্ঞ, তা আমি জানি না। তিনি ওই ঘরোয়া বৈঠকে একটু গর্ব করেই বললেন, তাঁর জেলায় তিনি জামায়াতিদের প্রায় নিকেশ করে এনেছেন। কী করে এটা সম্ভব হলো জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বললেন, ‘বেশ কয়েকজন জামায়াতি আলেমকে চাপ দিতেই তাঁরা আওয়ামী ওলামা লীগে যোগ দিয়েছেন।’ তাঁর কথা শুনে আমি চুপ করে রয়েছি। মনে মনে ভেবেছি, বাংলাদেশে জামায়াতিরা তাদের নতুন কৌশলও সফল করতে চলেছে।

প্রথমে এই খেলাটা ধরতে পারিনি। বুঝতে পারিনি, একটি উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির দলের লোকেরা কী করে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অনুসারী আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারে? কিছুদিন আগে ঢাকার কাগজেই খবর দেখেছি, আওয়ামী লীগের এক প্রতিমন্ত্রী বা উপনেতার হাতে ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে এক বিরাটসংখ্যক জামায়াতি নেতা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। আওয়ামী লীগও তাঁদের গ্রহণ করেছে। জামায়াতিরা কেন দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে, এই ধাঁধাটা বুঝতে আমার কিছুদিন সময় লেগেছে।

শেষ পর্যন্ত আমার বুঝতে বাকি থাকেনি, পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের বামপন্থীরা, বিশেষ করে কমিউনিস্টরা আত্মরক্ষার জন্য যে কৌশল গ্রহণ করেছিল, বর্তমান বাংলাদেশে জামায়াতিরা সেই কৌশল অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রপ্ত করছে ও সফল হচ্ছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পর কমিউনিস্ট পার্টিকে (অবিভক্ত) ধ্বংসাত্মক চক্র আখ্যা দিয়ে যখন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের ওপর দমননীতি চালানো হয়, তখন অধিকাংশ নেতা-কর্মী আত্মগোপন করেন বা আন্ডারগ্রাউন্ডে যান। অনেকে গ্রেপ্তার হন। প্রকাশ্য রাজনীতি করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তখন অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই কমিউনিস্ট নেতারা একটা কৌশল অবলম্বন করেন। এই কৌশলটি হলো বড় একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে ঢুকে পড়া এবং দলটিকে ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে বামপন্থী নীতিকে জয়যুক্ত করার জন্য কাজে লাগানো। এ জন্য তাঁরা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করাটাকেই তাঁদের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী তাঁদের সহযোগিতা জোগান। ফলে বামপন্থীদের চাপেই আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম থেকে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ নামে সেটি একটি অসাম্প্রদায়িক দলে রূপান্তরিত হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির আন্দোলন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ যে শুধু অংশগ্রহণ নয়, নেতৃত্ব দিয়েছে, তার প্রধান কারণ দলে বাম অংশের প্রভাব।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। নিরাপত্তা আইনে বন্দি কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা জেল থেকে বেরিয়ে এসে আবার কমিউনিস্ট পার্টি পুনরুজ্জীবিত করেন। নির্বাচনের আগে মুসলিম লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়, তাতে কমিউনিস্ট পার্টিকেও গ্রহণের কথা ছিল। আসলে বামপন্থীরাই ছিলেন এই যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রধান নেপথ্য উদ্যোক্তা। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা, বিশেষ করে হক সাহেব ও সোহরাওয়ার্দী ভয় পেলেন যে কমিউনিস্টদের ফ্রন্টে গ্রহণ করা হলে ‘নাস্তিক ও ধর্মদ্রোহীদের’ গ্রহণ করা হয়েছে বলে মুসলিম লীগ প্রোপাগান্ডা চালানোর সুযোগ পাবে। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টিকে বাদ দিয়ে নেজামে ইসলাম নামক ইসলামী দলকে যুক্তফ্রন্টে গ্রহণ করা হয় (জামায়াত তখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের দল ছিল)। তখনকার কমিউনিস্ট নেতারা আজকের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের মতো আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মম্ভরী না হওয়ার দরুনই যুক্তফ্রন্টে প্রবেশাধিকার না পেয়েও দেশকে মুসলিম লীগের অপশাসন থেকে মুক্ত করার বৃহত্তর স্বার্থে তাঁরা যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিরাট নির্বাচন-জয়ে সাহায্য জোগান।

৬০ বছর আগে পাকিস্তান আমলে বামপন্থীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও দেশকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করার জন্য আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের নীতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের প্রভাবের ফলেই আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দলে পরিণত হওয়া এবং শেখ মুজিবের সংগ্রামী নেতৃত্বের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগে একটি ক্যু ঘটান এবং বামপন্থীরা আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়ে ন্যাপ নামে নতুন পার্টি গঠনে বাধ্য হন। এটা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য হিতকর হয়নি। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দলের বামপন্থী অংশের সহায়তাই দলটিকে লেফট ওরিয়েন্টেড গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পুনর্গঠনের সুযোগ পান এবং দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও তার পরও বামপন্থীদের সঙ্গে সহযোগিতা ও ঐক্য অক্ষুণ্ণ রাখেন।

এবার আসল কথায় আসি। ৬০ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগে বামপন্থীদের অনুপ্রবেশ ও প্রভাব বৃদ্ধি ছিল দল ও দেশের জন্যও মঙ্গলজনক। দেশ তাতে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার অভিশাপ কাটিয়ে উঠে আধুনিক প্রগতিমুখী রাজনীতির দিকে যাত্রা শুরু করতে পেরেছিল। বাঙালির লোকায়ত সভ্যতা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটতে শুরু করেছিল। কিন্তু বর্তমানে আওয়ামী লীগে যে কৌশলী অনুপ্রবেশ, তা প্রগতিশীল বামপন্থীদের নয়। এই অনুপ্রবেশ মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধ একটি উগ্র রাজনৈতিক দলের। তবে তারা আগেকার বামপন্থীদের অনুপ্রবেশের কৌশল দক্ষতার সঙ্গে রপ্ত করে আওয়ামী লীগে এই অনুপ্রবেশ শুরু করেছে। একেই আওয়ামী লীগে শক্তিশালী লেফট গ্রুপের অস্তিত্ব নেই। দলটি সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থীদের কবজায়। এইঅবস্থায় ডানপন্থীরা সম্ভবত দলে জামায়াতিদের অনুপ্রবেশকে স্বাগত জানাচ্ছে। নইলে দলের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, নেতা বা উপনেতা ফুলের তোড়া হাতে আগত জামায়াতিদের দলে যোগদানের বিষয়টি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতেন, সতর্ক হতেন।

৬০ বছর আগের বিপরীত স্রোত এখন বইছে। তখন আওয়ামী লীগে বামপন্থী ও প্রগতিশীল অংশ শক্তিশালী হওয়ায় দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে, দেশ সামনের দিকে এগিয়েছে। আর এখন ডানপন্থী কোটারির হাতে বন্দি আওয়ামী লীগে জামায়াতি অনুপ্রবেশ এই ডানপন্থীদের হাতে শক্তি জোগাবে; আওয়ামী লীগকে তার অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে ক্রমশ সরিয়ে আনার চেষ্টা করবে এবং জামায়াত স্বনামে তাদের যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি, আওয়ামী পরিচয়ে সেই উদ্দেশ্য সফল করার চেষ্টা চালাবে। সময় থাকতে এই ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ যদি সজাগ না হয়, তাহলে দলটির ও দেশের সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের কালিমা অঙ্গে নিয়ে জামায়াত সফল হতে পারবে না জেনেই বড় রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশ করে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনের বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। এই লক্ষ্যে তারা প্রথমে বিএনপিকে গ্রাস করার নীতি গ্রহণ করে। তারেক রহমান একটু লায়েক হয়ে উঠতেই তার কাঁধে ভর দিয়ে তারা বিএনপিকে গ্রাস করতে শুরু করে। ফলে একসময় বিএনপি সম্পূর্ণ জামায়াতনির্ভর পার্টিতে পরিণত হয়। দলের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নেতাদের একে একে তাড়ানো হয়। বিএনপির গত সরকারের নামই ছিল খালেদা-নিজামী সরকার।

বিএনপি এখন নামে মাত্র একটি দল। জামায়াতের লোক ছাড়া খালেদা জিয়ার সভায় জনসমাগম তেমন হয় না। জামায়াতের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সমর্থন ছাড়া বিএনপি কোনো আন্দোলনে নামতে পারে না। ভারতে যেমন বিজেপির খোলসে শিবসেনা, আরএসএস ক্ষমতায় এসেছে; বাংলাদেশেও তেমনি ভবিষ্যতে বিএনপির খোলসে জামায়াত ক্ষমতায় এলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। বিএনপিকে সম্পূর্ণ গ্রাস করার পর জামায়াত এখন আওয়ামী লীগের দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। কারণ বিএনপির সহযোগিতায় দেশব্যাপী সন্ত্রাস চালিয়ে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করেও তারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেনি। বরং আওয়ামী লীগ আরো পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসেছে। এখন প্রবল জনদাবির মুখে আওয়ামী লীগ সরকার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান শেষ করার কাজে দ্রুত এগোতে পারে; এমনকি জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পথেও এগোতে পারে। এই সম্ভাবনা রোধ ও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই জামায়াতকে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়েছে। এই কৌশলটি হলো আওয়ামী লীগকে বাইরে থেকে ঘায়েল করা না গেলে ভেতরে ঢুকে ঘায়েল করতে হবে।

আওয়ামী লীগে জামায়াতিদের অনুপ্রবেশ এখনো লক্ষণীয়ভাবে শুরু হয়নি। তবে শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড সতর্ক না হলে এই অনুপ্রবেশ দ্রুত বাড়বে এবং এই অনুপ্রবেশের প্রভাব দলের নীতিনির্ধারণের ওপরও পড়বে। বাজারে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি গোপন সমঝোতার কথা প্রচারিত হয়েছে, তা আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু জামায়াতকে নিষিদ্ধকরণ ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করার ব্যাপারে সরকারের ঢিলেঢালা নীতি অনেকের মনে নানা সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে। হেফাজতিদের তোষণ করে চলার নীতিও দেশের সচেতন যুবসমাজকে এমনিতেই আওয়ামী লীগের প্রতি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে, তারপর এই গুজব যদি সঠিক হয় যে জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডদানের ব্যাপারে সরকারের বর্তমান গড়িমসি নীতির পেছনে উদ্দেশ্য আছে, তাহলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে সাফল্য সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকার জনসমর্থন হারাতে থাকবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের যুবসমাজকে ডিজিটাল বাংলার টোপ দেখিয়েও আওয়ামী লীগের পক্ষে ধরে রাখা যাবে না।

আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁদের দলে জামায়াতিদের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে কতটা সচেতন, তা আমি জানি না। কিন্তু সময় থাকতে সচেতন হওয়ার জন্য অনুরোধ জানাই। আওয়ামী লীগ একটি অসাম্প্রদায়িক গণভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। অনুপ্রবেশ ঘটলে, জামায়াতি রাজনীতির কালচার ঢুকলে দেশের মহাসর্বনাশ হবে। এখন প্রশ্ন, দলে জামায়াতিদের এই ধীর অথচ কৌশলী অনুপ্রবেশ আওয়ামী লীগ সময় থাকতে ঠেকাতে পারবে কি?

You Might Also Like