হোম » আইনের শাসনের বড় অন্তরায়

আইনের শাসনের বড় অন্তরায়

আনু মুহাম্মদ- Tuesday, March 4th, 2014

বাড়ছে বিচারবিহীন হত্যাকাণ্ড। ‘ক্রসফায়ার’, ‘এনকাউন্টার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ প্রকৃতপক্ষে বিনা বিচারে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের এক একটি নাম। গত ১২ বছর ধরে একই ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে একটি গল্প জুড়ে দেয়া হয়। গল্প একই। হয়তো একবারই কম্পোজ করা হয়েছিল, শুধু নাম পাল্টাচ্ছে। ঘটনার বর্ণনা বা কাহিনী একই থাকছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অপরাধ দুটি : এক. বিনা বিচারে দেশের নাগরিকদের হত্যা। দুই. হত্যাকাণ্ড বিষয়ে অবিরাম মিথ্যাচার ও প্রতারণা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর বিভিন্ন সময়ে এ রকম ঘটনা ঘটলেও, আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিনা বিচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে। ২০০১ এর পর থেকে ‘ওয়ার অন টেরর’ নামে সারা বিশ্বে আধিপত্য কিংবা প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস বিস্তার করেছে। এর অংশ হিসেবে তারা বহু দেশে বিভিন্ন বাহিনী গঠন করেছে বা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। অর্থ দিয়ে, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের শক্তিশালী করেছে। ‘সন্ত্রাসী’ নাম লাগিয়ে দিতে পারলেই খুন, গুম, নির্যাতন সবকিছু বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্বে একটি ফ্যাসিবাদী আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছে। সে সময়ই বাংলাদেশে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র‌্যাব) জানা অজানা নানা বাহিনী গঠন করা হয় । যৌথ বাহিনীর নামেও অপারেশন চলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে বহুদেশে ৫০-এর দশক থেকে ৭০-এর দশক পর্যন্ত এমন হত্যাকাণ্ড ব্যাপক হারে সংঘটিত হয়েছে। তখন লাটিন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সামরিক শাসক বা সামরিক আদলের সরকারগুলো বিরোধী মত দমনে এমন হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয়। সামরিক শাসন নিশ্চিত করাসহ বহুজাতিক পুঁজির আগ্রাসন নিশ্চিত করার জন্য আইন আদালতকে তুচ্ছ করে সরাসরি হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেয়ার উদাহরণও আছে। এটা আসলে নিপীড়ন, নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করার একটি পথ। আগের বহু দেশ নারকীয় এই অবস্থা থেকে বের হয়ে সভ্য হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়াতেও এর উপস্থিতি আছে। ভারতের কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে, প্রতিবাদী মানুষদের সন্ত্রাসী বা মাওবাদী নাম দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এই কাজের জন্য সামরিক বাহিনীকে বিশেষ অধিকার দেয়া আছে। পাকিস্তানেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য সেনাবাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে আইনি বর্ম দেয়া হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তবে আশার কথা, সব দেশেই এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিস্তৃত হচ্ছে।

২০০২ সালে বাংলাদেশে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে শুরু হয়ে এই হত্যাযজ্ঞ নানা নামে এখনো অব্যাহত আছে। এক পর্যায়ে যৌথ বাহিনীকে দায়মুক্তি দেয়া হয়। ওই সময়ে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক প্রধান ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। প্রেসিডেন্ট বুশের ভাই, বিশ্ব সন্ত্রাসের অন্যতম পরিচালক, জেব বুশের সঙ্গে বাবরের বিশেষ বৈঠকের খবরও তখন ফাঁস হয়েছিল। বর্তমানে তিনি জেলে এবং দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি। এ রকম ব্যক্তিরাই আইনি প্রধান হিসেবে এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। পরবর্তী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীরা বাবরের উত্তরসূরি। বোঝা কঠিন নয় যে, সন্ত্রাসীর গডফাদারদের নেতৃত্বে পাইকারি হত্যাযজ্ঞকে ‘সন্ত্রাসী’ নির্মূলের পোশাক পরানো হয় জনমত পক্ষে রাখার জন্য। সমাজের মধ্যে এ রকম কথা চালু আছে যে, যেহেতু আইনের ওপর পুরো ভরসা করা যায় না, আইনের ফাঁক-ফোকর আছে, সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাবান এবং ছাড়া পেয়ে যায় সেহেতু বিনা বিচারে এই হত্যাকাণ্ড যুক্তিযুক্ত। অনেকে বিশ্বাসও করেন এই ধরনের কথা। এই বক্তব্যের মধ্যে ধরে নেয়া হয় যারা এসব হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তারা অপরাধী নন, সব কিছুর ঊর্ধ্বে। প্রশ্ন হলো, যদি আইনের মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা দোষীদের বিচারের সঠিক ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে বাংলাদেশে আইন-আদালত আছে কেন? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যদি সরকার একটি পন্থা হিসেবে গ্রহণই করে তাহলে গণতন্ত্র, আদালত বা আইনের নামে প্রহসন কেন?

খেয়াল করলে দেখা যাবে, যেসব সন্ত্রাসী আইনের ফাঁক দিয়ে ছাড়া পেয়ে যায়, তারা এই সুযোগ পায় ক্ষমতাবানদের জন্যই। কিছুদিন আগে মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাশিমপুর কারাগার থেকে বিকাশ নামে এক সন্ত্রাসী ছাড়া পেয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছিল। কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে তার ছাড়া পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে পত্রিকায় খবর বের হয়েছিল। ফাঁসির আসামিদেরও রাষ্ট্র মুক্তি দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আদালতে চার্জশিট প্রদান কিংবা তদন্তে জালিয়াতির প্রায় সবই হয় ক্ষমতাবানদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেয়া যাবে কী? সুতরাং আইন আদালত প্রক্রিয়ার দুর্বলতার প্রধান কারণ হচ্ছে টাকা কিংবা ক্ষমতাবানদের প্রভাব। এ ক্ষমতাবানরাই যখন কাউকে সন্ত্রাসী বলে খুন করে তখন তা যে সন্ত্রাসী দমনের কাজ নয় তা নিয়ে অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। একটু চোখ খুলে দেখলেই আমরা দেখতে পারব যে, যারা সন্ত্রাসীদের তৈরি করে, লালন-পালন করে, রক্ষা করে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত, তারাই বিভিন্ন সময়ে ক্রসফায়ার নামক বিনা বিচারে হত্যার এই প্রক্রিয়াটিকে সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার করে। মোটা দাগে এই হত্যাকাণ্ডের কয়েকটা ধরন চিহ্নিত করা যায় :

প্রথমত, রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যাকাণ্ড। একটা দীর্ঘ সময় ধরে বামপন্থি কর্মী নামে পরিচিত অনেককে হত্যা করা হয়েছে। এমন অনেককে হত্যা করা হয়েছে যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অবসর নিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। এমন অনেককেও হত্যা করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা পর্যন্ত নেই। তাছাড়া রাজনীতি বা দলমত কীভাবে একটি সভ্য সমাজে অপরাধ হতে পারে? রাষ্ট্র আক্রান্তবোধ করলে তাদের প্রকাশ্যে আইনের প্রক্রিয়ায় আনতে কী সমস্যা? দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাবানদের জন্য বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম হুমকি হয়ে উঠলে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। তৃতীয়ত, দলছুট সন্ত্রাসীদেরও এভাবে হত্যা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির সঙ্গে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল পরবর্তীতে ওই নেতাদের সঙ্গে সংঘাত হলে তাদের ক্রসফায়ারে মারা হয়েছে। এর এক সাম্প্র্রতিক উদাহরণ হচ্ছে জনসম্মুখে যুবলীগ নেতা খুন হওয়ার দু’-একদিন পরেই জড়িত ব্যক্তিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে এটাও বোঝা যায় যে, এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রকৃত হত্যাকারীকে বাঁচানো হলো। আবার দলীয় কোন্দলের পরও কেউ কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। জেল থেকে পালানো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির হত্যাকাণ্ড প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্যই করা হয়েছে, এই অভিযোগও যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত। চতুর্থত, ক্রসফায়ার নাম দিয়ে অর্থের বিনিময়ে চাঁদা না পেয়ে, লুটে বাধা পেয়ে হত্যা করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। হত্যা বা ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে বাণিজ্য করা হচ্ছে। পাইকারিভাবে ধরে এনে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ বাড়ছেই।

ক্ষমতায় এসে ক্রসফায়ার বন্ধের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি বর্তমান সরকার। বরং দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একচ্ছত্র ক্ষমতা পেয়ে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা শুরুর পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও নতুন উদ্যমে হত্যাকাণ্ড শুরু করেছে এমন অভিযোগ পুষ্ট হচ্ছে। সামগ্রিক বিচারে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আরো বেড়েছে।

কোনো হত্যা নিয়ে কথা উঠলে র‌্যাব-পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় তদন্ত করা হবে। রাষ্ট্র যাদের বিনা বিচারে হত্যার লাইসেন্স দেয় তাদের বিরুদ্ধে মানুষ কোন ভরসায় অভিযোগ করবে? যারা অভিযোগ করবেন, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে, তাদের নিরাপত্তা কোথায়? মিডিয়াতেও এ নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানী কাজ করার মতো কোনো অবস্থা আছে বলে মনে হয় না। এর পরও মাঝে মধ্যে কিছু অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন কিংবা তথ্য থেকেই আমরা ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। নামের ভুলের কারণেও নিরীহ মানুষ নিহত হচ্ছে। কোনো বিচার নেই। লিমনের ঘটনা স্মরণ করতে পারি। লিমনকে গুলি করা হয়েছিল একজন সন্ত্রাসী ধরা হচ্ছে বলে। লিমন নিহত হলে সন্ত্রাসী নামেই ওর পরিচিতি থাকত। কিন্তু যেই সন্ত্রাসীকে ধরার কথা বলা হচ্ছিল সেই সন্ত্রাসী এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সভ্যতার লেশমাত্র থাকলে কোনো সমাজে ক্রসফায়ারের নামে হত্যাকাণ্ড সমর্থিত হতে পারে না। সমাজের যেসব মানুষ সঠিক তথ্য না জানার ফলে এসব হত্যাকাণ্ড সমর্থন করছেন, তারা নিজেরাও বিপদ কাছে টেনে আনছেন। এর মধ্য দিয়ে পুরো দেশের রাজনীতি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সামগ্রিক পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। দল-মত নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের উচিত এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা। কেউ যদি বড় অপরাধীও হয় যথাযথভাবে বিচারের মাধ্যমেই তার শাস্তি প্রদান করতে হবে। ক্ষমতাবানরা রক্ষা না করলে আইনের মাধ্যমেই বিচার সম্ভব। বিনা বিচারে হত্যার লাইসেন্স দিয়ে আইনি সংস্থাগুলোকে এমন এক পেশাদার বাহিনীতে পরিণত করা হচ্ছে, যেখানে জবাবদিহিতা বা আইনকানুন বলে কিছু নেই। গুম, গ্রেফতার বাণিজ্য ও হত্যাকাণ্ড যেভাবে চলছে তাতে কোনো নাগরিকই নিরাপদ নন। আইনি সংস্থা কিংবা বাহিনীর লোকজনও নন। যে কোনো সময় যে কোনো ব্যক্তি এর শিকার হতে পারেন। চিন্তা প্রতিবন্ধী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে প্রতিটি নাগরিকের উচিত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হওয়া। নীরব সকলকে, বিশেষত শিক্ষিত সমাজকে এর দায়ভার অবশ্যই নিতে হবে। বাংলাদেশে মানবাধিকার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও কীভাবে ১২ বছর ধরে এ রকম হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকতে পারে? এ রকম হত্যাকাণ্ড না থামাতে পারলে মানবাধিকার সংস্থা নামের প্রতিষ্ঠানটির প্রহসন বন্ধ করা উচিত।
লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস-বন্দর-বিদ্যুত রক্ষা কমিটি ও অর্থনীতিবিদ
(মানব কণ্ঠ, ০৫/০৩/২০১৪