আইএস সম্পৃক্ততা সন্দেহ ব্রিটেনে নারীসহ ৬ বাংলাদেশি গ্রেফতার

ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস) জঙ্গি সম্পৃক্ততা সন্দেহে ছয় বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন গত বছরের ডিসেম্বরে সিরিয়া যুদ্ধে নিহত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ জিহাদি ইফতেখার জামানের বাবা-মাসহ একই পরিবারের ৫ জন ও অন্য এক নারী।

পোর্টসমাউথ শহরের হাডসন রোডের বাসা থেকে ইফতেখারের ৪ স্বজনকে ও সাউথ ইস্ট লন্ডনের ব্লাকহিথ থেকে আরও একজনকে গ্রেফতার করা হয় মঙ্গলবার। অন্য এক নারীকে গ্রেফতার করা হয় হ্যামশায়ারের ফার্নবারা থেকে।

রাজধানী লন্ডন থেকে ৭৫ মাইল দূরবর্তী শহর পোর্টসমাউথের বাসা থেকে গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ইফতেখার জামানের বাবা ইনু মিয়া (৫৭), মা হেনা চৌধুরী (৪৮), দুই ভাই তুহিন (২৬) ও মুস্তাকিম (২৩)।

পুলিশ জানায়, ওই পরিবারের গ্রেফতারকৃত অন্যজন হচ্ছেন ইফতেখারের বড়বোন ২৯ বছর বয়সী তামান্না শাহরিন। তামান্নাকে সাউথ ইস্ট লন্ডনের ব্লাকহিথ থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১১ মাসের শিশু সন্তান, ফার্মাসিস্ট স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে ব্লাকহিথেই বসবাস করেন তামান্না।

গ্রেফতার হওয়া বাকি একজন নারী। ২৩ বছর বয়সী ওই নারীকে হ্যামশায়ারের ফার্নবারা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

ইফতেখারের বাবা ইনু মিয়া ও মা হেনাকে বুধবার জামিনে ছেড়ে দেওয়া হলেও তার দুই ভাই তুহিন, মুস্তাকিম ও বোন তামান্না এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন।

ব্রিটিশ পুলিশ জানায়, ইফতেখারের বোন তামান্না শাহরিনকে সন্দেহজনক সন্ত্রাসী পরিকল্পনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ইফতেখারের বাবা ইনু মিয়া হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি পোর্টসমাউথে নিজের মালিকানাধীন একটি টেকওয়ে (রেস্টুরেন্ট) পরিচালনা করেন। ইনু মিয়াকে টেরোরিজম অ্যাক্ট ২০০০ এর ধারা ৩৮বি, টেরোরিজম অ্যাক্ট ২০০৬ এর ধারা-৫১এ এবং টেরোরিজম অ্যাক্ট ২০০০ এর ১৭ ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে।

সন্ত্রাস বিষয়ক তথ্য গোপন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততা এবং সন্ত্রাসী পরিকল্পনায় অর্থ ও স্থানের যোগানদাতা হিসেবেও ইনু মিয়াকে সন্দেহ করছেন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। সিরিয়ায় যুদ্ধরত জিহাদিদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন সন্দেহও রয়েছে ইনু মিয়ার বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে হেনার বিরুদ্ধে রয়েছে সন্ত্রাস বিষয়ক তথ্য গোপনের অভিযোগ। আর ইফতেখারের দুই ভাই তুহিন ও মুস্তাকিমকে গ্রেফতার করা হয় টেরোরিজম অ্যাক্ট ২০০০ এর ৪১ ধারায়, যাতে রয়েছে সন্ত্রাসে প্ররোচনা ও প্রস্তুতির সন্দেহ।

মঙ্গলবার সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে দরজা-জানালা ভেঙ্গে পোর্টসমাউথে ইনু মিয়ার ঘরে ঢোকে পুলিশ। পরে সিরিয়া যুদ্ধে নিহত ইফতেখার পরিবারের চার সদস্যকে গ্রেফতার করে।

আইসিস জিহাদি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২৩ বছর বয়সী ইফতেখার জামান গত বছরের ডিসেম্বরে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ডেইর আল জউর যুদ্ধক্ষেত্রে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড আল শাম (আইসিস) এর হয়ে একটি বড় আকারের অস্ত্রভাণ্ডারের দখল নিয়ে সিরীয় বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। এর আগে বিবিসি নিউজ নাইটে সাক্ষাতকার দিয়ে আইসিস জিহাদি হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন ইফতেখার।

ওই সাক্ষাতকারে সিরিয়া যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধ’ মন্তব্য করে এ যুদ্ধে সামিল হওয়ার জন্যে ব্রিটিশ মুসলিম তরুণদের আহবান জানান ইফতেখার। নিউজ নাইট সাক্ষাতকারে ইফতেখার নিজের চেহারাও প্রদর্শন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে এসে যুদ্ধরত তরুণদের বিবাহ করে এই ‘পবিত্র যুদ্ধের পূণ্য’ হাসিল করতে ভিডিওবার্তায় মুসলিম তরুণীদেরও আহবান জানান ইফতেখার। ব্রিটিশ মুসলিম তরুণদের সিরিয়া যুদ্ধে আকৃষ্ট করতে ইফতেখারের অনলাইন প্রচারণা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে ব্রিটিশ মূলধারায়। তার এ প্রচারণা একপর্যায়ে তাকে ‘সেলিব্রেটি জিহাদি’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

এদিকে লন্ডন থেকে ৭৫ মাইল দুরবর্তী পোর্টসমাউথ শহর থেকেই সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণ সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়ায় এই শহরটিতে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিভাবকরা ব্যাপক দুশ্চিন্তায় সময় পার করছেন। এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষের দিকে পোর্টসমাউথেরই বাসিন্দা হামিদুর নামের আরেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ জিহাদিও নিহত হন সিরীয় বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে।

নিহত জিহাদি ইফতেখারের পুরো পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার পোর্টসমাউথ শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ মুসলমান কমিউনিটির শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

পোর্টসমাউথ থেকেই কেন এতো বেশি বাংলাদেশি তরুণ জঙ্গি তৎপরতায় সংশ্লিষ্ট হচ্ছেন? পোর্টসমাউথে বসবাসরত একজন প্রবাসী বাংলাদেশিকে এমন প্রশ্ন করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ব্রিটেনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে কট্টর মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ নেতা হিসেবে পরিচিত একজন ‘মুফতি’র বসবাস ছিল এই পোর্টসমাউথে। এখনও এই শহরের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ওই মুফতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের রাজনীতিকদের প্রকাশ্যে অশ্লীলভাবে গালাগালি করে কমিউনিটিতে ‘ধর্মান্ধ জঙ্গি নেতা’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ওই অশ্লীল গালাগালি ইউটিউব ভিডিও’র মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারিতও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রবাসী বলেন, নিহত আইসিস জিহাদি ইফতেখার জামানের বাবা ইনু মিয়া ও ওই মুফতির বাংলাদেশের বাড়ি একই এলাকায়। শুধু একই এলাকায় বাড়িই নয়, তারা পরস্পরের আত্মীয়ও।

তিনি বলেন, ধর্মান্ধতার পক্ষে পোর্টসমাউথের প্রভাবশালী ওই মুফতির একটি প্রভাব কাজ করতে পারে সিরিয়া-ইরাক যুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ওই তরুণদের ওপর। তাছাড়া সোমালিয়ান কমিউনিটির মধ্যেও জঙ্গি সম্পৃক্ত একটি গ্রুপ রয়েছে, যাদের সংস্পর্শ এবং ইন্টারনেটে জিহাদি কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচার বাংলাদেশি ওই তরুণদের এ পরিণতির কারণ হতে পারে।

You Might Also Like