অসামান্য আনিসুজ্জামান

আনিসুজ্জামানের লেখার যে রীতি তাতে একদিকে আছে মননশীলতা এবং অন্যদিকে আছে হৃদয়গ্রাহীতা। হেলাফেলা করে কোনো কাজ করেননি। তাঁর রচনারীতিতে তথ্য ও তত্ত্ব আছে। এর কোনোটাই গুরুভার নয়। তাঁর লেখা ও কাজের মধ্য দিয়ে তিনি জীবন্ত হয়ে থাকবেন

আনিসুজ্জামান অনেক দিক থেকেই অসামান্য ছিলেন। অতুলনীয় গবেষক, প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, খ্যাতিমান সংস্কৃতিসেবক—এই তিনের সমন্বয় তাঁর মধ্যে ঘটেছিল। এই গুণগুলো তিনি অর্জন করেছেন অনুশীলন করে। এই তিনটি গুণ একসঙ্গে সবার মধ্যে দেখা যায় না। এই তিনটি গুণের একটি একজনের মধ্যে থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু এর সব কটিই তাঁর মধ্যে ছিল। এ জন্য তাঁকে বিরল মানুষ বলতে হবে। তাঁর মেধা ছিল এবং তিনি মেধার অনুশীলন করেছেন। এসবের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়, তিনি সমাজমনস্ক ছিলেন। অনেকে বিদ্বান হন, শিক্ষক ও পণ্ডিত হন; কিন্তু সমাজমনস্ক হন না। আনিসুজ্জামান একই সঙ্গে উপরোক্ত তিনটি গুণের সঙ্গে সমাজ সচেতন ছিলেন। সমাজের যে প্রবাহ, সেটি তিনি লক্ষ করতেন। প্রতিক্রিয়াশীলতাকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন এবং এর বিরুদ্ধে তাঁর যে অবস্থান সেটি অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল। প্রতিক্রিয়াশীলতার সঙ্গে তিনি কখনোই আপস করেননি। আর দৃষ্টিভঙ্গিটিকে বলা যাবে উদারনৈতিক। উদারনীতির যে গুণগুলো, সেগুলো আমরা তাঁর মধ্যে দেখেছি; যেমন—পরমতসহিষ্ণুতা, বিনয়, সমাজ-প্রগতিতে আস্থা এবং ভদ্রতাবোধ তাঁর মধ্যে ছিল। এই উদারনীতির কারণেই তিনি বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন।

আমরা লক্ষ করি, তাঁর গবেষণার ক্ষেত্রটি ছিল মূলত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস; সাহিত্যের ইতিহাসের যে উপাদান সেগুলো তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর প্রথম গবেষণা হচ্ছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম লেখকদের অবদান। এই কাজটি তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেছেন এবং এটি ছিল তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ। আমরা দেখেছি, বাংলা সাহিত্যের যে ইতিহাস, লেখকের যে কাজ সেটি অনেকে ভালো করে পড়েননি। ড. আহমদ শরীফ যেমন গবেষণা করে মধ্যযুগের সাহিত্যিকদের যে অবদান সেটি সামনে নিয়ে এসেছিলেন, আনিসুজ্জামানও তেমনি পরবর্তীকালের যে সাহিত্যিক, আধুনিককালের যে সাহিত্যিক তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে সামনে এনেছেন। এগুলো খুবই মূল্যবান কাজ। তিনি শুধু সাহিত্যিকদের বিবরণ তুলে ধরেননি, নানা দিক থেকে সেসব বিশ্লেষণ করেছেন এবং আলো ফেলেছেন। একইভাবে গদ্যসাহিত্য নিয়েও তিনি অসামান্য কাজ করেছেন।

আনিসুজ্জামান আত্মজীবনী লিখেছেন। সেখানে তাঁর নিজের কথা তো আছেই, একই সঙ্গে তাঁর সময়ের যে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি তিনি যে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তা-ও এতে তুলে ধরেছেন। ইতিহাস রচনার জন্য যে উপাদান দরকার হয় তাঁর আত্মজীবনীতে তা পাওয়া যাবে। এটি একটি বড় কাজ বলে আমি মনে করি।

আনিসুজ্জামান অনেকগুলো বই সম্পাদনা করেছেন। অনেক স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন, যেগুলো তিনি যেভাবে করেছেন, সেভাবে অন্য কেউ করতে পারত না। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নানাভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এগুলো তাঁর প্রাপ্য ছিল।

আনিসুজ্জামানের লেখার যে রীতি তাতে একদিকে আছে মননশীলতা এবং অন্যদিকে আছে হৃদয়গ্রাহীতা। হেলাফেলা করে কোনো কাজ করেননি। তাঁর রচনারীতিতে তথ্য ও তত্ত্ব আছে। এর কোনোটাই গুরুভার নয়। তাঁর লেখা ও কাজের মধ্য দিয়ে তিনি জীবন্ত হয়ে থাকবেন।

এমন সময়ে তিনি চলে গেলেন, একটা যন্ত্রণার সময়ে; তাঁর এই চলে যাওয়াটা আমাদের যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিল।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়