অভিজিতের খুনি গ্রেফতারে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যা ও তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর হামলাকারীদের গ্রেফতারের জন্য ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন বিশিষ্টজন ও রাজনীতিকেরা। এছাড়া হামলাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে শাহবাগে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু করেছে গণজাগরণ মঞ্চ।
শুক্রবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে ‘প্রতিবাদী ছাত্র শিক্ষক ও নাগরিক’ ব্যানারে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ দাবি জানানো হয়। এসময় সেখানে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশিষ্টজনরাও তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। মিছিল থেকে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলা মেনে নেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করা হয়।
মুক্তমনা লেখক-সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার বার্ষিকীতে এ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশে সবার ক্ষোভ দ্বিগুণ হয়েছিল যেন। ফলে অভিজিৎ রায় হত্যার বিচার দাবিতে দিনভর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলন আর বিক্ষোভে উত্তাল ছিল ঢাবি ও শাহবাগ এলাকা।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা বলেছেন, দুর্বৃত্তদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করতে হবে। আর তা করতে না পারলে এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বারবার এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। একইসঙ্গে এ হামলার জন্য মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘নির্লিপ্ততাকে’ দায়ী করা হয়।
সকাল ১১টার দিকে ঢাবি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, প্রবীণ রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্য, প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানী, কলামিস্ট-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, মানবাধিকার নেত্রী হামিদা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল, মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবির, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, ঢাবি শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী প্রমুখ।
সমাবেশে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘অভিজিৎকে যখন হত্যা করা হয়েছে তখন রাত গভীর হয়নি। টিএসসির সামান্য দূরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেভাবে রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়। একইভাবে গতকাল (বৃহস্পতিবার) অভিজিৎকে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরাই এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে সাধারণ মানুষও বলতে পারবে একই জঙ্গিগোষ্ঠী এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।’
সেলিম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শুধু স্লোগান দিলে হবে না, অভিজিতের ওপর আঘাতের প্রতিঘাত আমাদের করতে হবে।’
সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ‘এখন পুলিশ ও সরকার এই ঘটনার কোনো জবাব দেবে না, যা তাদের নীরবতা দেখে বোঝা যায়। এখন এর জবাব দেবে জনগণ। অপরাধীরা গোপনে হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছেন। এই হত্যার বদলে হত্যা চাই।’
রাজনীতিক পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তারা শুধু যুদ্ধ ঘোষণাই নয়, বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী দেশ করতে চায়, বাংলাস্তান করতে চায়। এটা কোনোভাবে হতে পারে না। আমরা এটা হতে দেব না। এদের প্রতিহত করতে আমাদের একই কাঁতারে দাঁড়াতে হবে।’
ঢাবি এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার দাবি জানান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আজকের এই দিনে যখন হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করা হয় তখন ওই এলাকায় পুলিশ উপস্থিত ছিল। তাদের উপস্থিতিতে কীভাবে একজনকে হত্যা করা হয়েছিল তা আমার প্রশ্ন। গতকালও (বৃহস্পতিবার) টিএসসি এলাকায় পুলিশের উপস্থিতির মধ্যে অভিজিৎ ও তার স্ত্রীর ওপর হামলা হয়। এভাবে হামলা আমরা চলতে দিতে পারি না।’
সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘এই হত্যা অভিজিৎকে হত্যা নয়, এই হত্যা প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যা। যেন আজকে বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে আমার দেশ। আর যাতে কোনো অভিজিৎকে প্রাণ দিতে না হয় সেই জন্য আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ যারা মুক্তচিন্তার চর্চা করে তাদের কাছ থেকে হারিয়ে গেছেন অভিজিৎ রায়। পুলিশ অভিজিৎকে রক্ষা করতে না পারুক, সাধারণ মানুষও পারে নাই আমরাও পারি নাই।’
জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘দেশে হত্যার রাজনীতির মধ্য দিয়ে কেউ ক্ষমতায় থাকতে চায় আর কেউ ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু হত্যাকারীর বিচার কেউ করে না। রাজনীতির এ হত্যার খেলার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত হতে হবে।’
সন্ধ্যায় ‘প্রতিবাদী ছাত্র শিক্ষক ও নাগরিক’ শিক্ষক ব্যানারে রাজু ভাস্কর্যের সামনে মোমবাতি ও মশাল প্রজ্জ্বলন করা হয়। এই সময় শিল্পীরা প্রতিবাদী গান গেয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান।
এদিকে, অভিজিৎ রায় ও বন্যার ওপর হামলার স্থানে সকালে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে ব্লগার অ্যান্ড অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক। সন্ধ্যায় মোমবাতি মিছিল বের করে অভিজিৎ রায় হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। হুমায়ুন আজাদের হামলার বার্ষিকীতে বের করা ওই মিছিলে অভিজিৎ রায় হত্যার প্রতিবাদও সংযুক্ত করা হয়।
এছাড়া সকালে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।
গণজাগরণ মঞ্চের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান
ব্লগার-লেখক অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা আহমেদ বন্যার ওপর হামলাকারীদের গ্রেফতার দাবিতে শাহবাগে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এই অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়।
সন্ধ্যায় অভিজিৎ স্মরণে ও হত্যার প্রতিবাদে শাহবাগ এলাকায় আলোক প্রজ্জ্বলন করা হয়। এরপর সেখান থেকে বের করা হয় মশাল মিছিল। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে আবারও শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়।
অবস্থান কর্মসূচিতে গণজাগণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘যারা অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে তারা আত্মস্বীকৃত মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠী। এই জঙ্গিরা অভিজিৎ রায়কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দিয়ে আসছিল। মর্মান্তিকভাবে অভিজিৎককে খুন করা এবং তার স্ত্রীকে মুমূর্ষু করে দিলেও জড়িত মূলহোতা ও পরিকল্পনাকারীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না।’
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘একই কায়দায় বিভিন্ন ঘটনা বারবার ঘটছে। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, অধ্যাপক শফিউল ইসলাম, ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার অভিজিৎকেও হত্যা করা হলো। একের পর এক ঘটনা ঘটানো হলো কিন্তু হত্যাকারী জঙ্গিগোষ্ঠীর কোনো বিচার হচ্ছে না।’
ইমরান বলেন, ‘এই মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং যারা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে প্রশাসন এবং রাষ্ট্রকে।’
সকালে গণজাগরণ মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জ্ঞাপন করেন ঢাবি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। এ সময় তিনি বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে, এটা স্পষ্ট হয়েছে। সরকারকে অবিলম্বে হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’
আবুল বারকাত বলেন, ‘এ ধরনের হামলা বারবার ঘটছে। এসব হামলা বন্ধ করতে হলে এবং জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে হলে জঙ্গিবাদের অর্থনৈতিক শক্তিকে ভেঙ্গে দিতে হবে। তাই জঙ্গিবাদের অর্থনৈতিক শক্তি ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য একইসঙ্গে উদ্যোগ নিতে হবে।’
এদিকে, অভিজিৎ হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাত থেকে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে প্রতিবাদী আলপনা আঁকতে দেখা যায় বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের। প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী ছাত্র ও যুবকর্মী টিএসসি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত হত্যার প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিলও করে।
উল্লেখ্য, বই মেলা থেকে ফেরার পথে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাবির টিএসসি এলাকায় দুর্বৃত্তরা মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল লেখক ড. অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী ব্লগার রাফিদা বন্যাকে কুপিয়ে চলে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অভিজিতের মৃত্যু হয়। বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ-রাফিদা দম্পতি গত ১৬ ফেব্র“য়ারি দেশে আসেন। বুয়েটের সাবেক শিক্ষক অভিজিৎ পেশায় প্রকৌশলী আর বন্যা চিকিৎসক।
এ হত্যার ঘটনায় শুক্রবার সকালে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেছেন অভিজিতের বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়।

You Might Also Like