অবসরের পর লেখা রায় গ্রহ‌ণে প্রধান বিচারপতিকে শামসু‌দ্দিনের চি‌ঠি

অবসরের পর হাতে লেখা পূর্ণাঙ্গ রায় ও আদেশ গ্রহণ করতে প্রধান বিচারপতিকে চি‌ঠি দিয়েছেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

আজ (রোববার) বেলা ১১টার দিকে ব্যক্তিগত পিয়নের মাধ্যমে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) বরাবর তিনি এ চিঠি পাঠান বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

এর আগে, অবসরের পর যেসব রায় লেখার জন্য বাকি ছিল, সেগুলোতে আর স্বাক্ষর করতে দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

শনিবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাকে স্বাক্ষর করতে না দেয়া হলে সেগুলো আইনের দৃষ্টিতে রায় হিসেবে গণ্য হবে না।’

গত বছরের ১ অক্টোবর অবসরে যান বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। অবসরে যাওয়ার পরপরই সব সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

রায় লেখার পর জমা দিতে গেলেও তা নেয়া হয়নি বলে জানান শামসুদ্দিন চৌধুরী। এজন্য দু’দফা চিঠিও দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগ করে সাবেক এ বিচারপতি বলেন, যেহেতু প্রধান বিচারপতি তাকে নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রায় লিখতে পারবেন না এবং সে কারণেই আমার লেখা রায় গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। উনি বলেছেন, যেহেতু এটা প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন, এটা অমান্য করা কঠিন।

অবসরের পর রায় গ্রহণ না করার বিষয়ে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিএনপি-জামায়াত তার বক্তব্যের পর রাজনীতির মাঠে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছে। আরেকটি কথা বলি, এখন কিছু না করলেও নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত তার এ মন্তব্যকে নিয়ে এগোবে। আমার কাছে তথ্য আছে, তারা নির্বাচনের আগেভাগে এটা চ্যালেঞ্জ করে একটা রিট করে এ সরকারকে বেকায়দায় ফেলবে। এ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই প্রধান বিচারপতি সিনহা এসব কথা বলেছেন। আমি যে মামলাগুলোতে বিচারক ছিলাম, সেগুলোতে আমি যদি সই না করি, সেই রায়গুলো তো রায় হবে না। এখন প্রধান বিচারপতি সিনহা যদি গায়ের জোরে পাঠিয়ে দেন এবং আমার স্বাক্ষর ছাড়াই রায় হিসেবে গণ্য করার আদেশ দেন, এগুলো চ্যালেঞ্জ হবেই।

উল্লেখ্য, অবসরে যাওয়ার সময় সাবেক এই বিচারপতির কাছে ১৯৬টি মামলার রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল। এমনকি হাইকোর্টে থাকাকালীন যেসব রায় দিয়েছিলেন তার মধ্যেও কিছু রায় লেখার অপেক্ষায় ছিল অবসরে যাওয়ার পরে।

অবসরে যাওয়ার পরে রায় লেখা ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে তার মতানৈক্য দেখা দেয়। এ নিয়ে এর আগে একাধিকবার প্রধান বিচারপতিকে চিঠিও দেন শামসুদ্দিন চৌধুরী।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে টিভি টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে চলেছেন, যা বিচার বিভাগের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য বিশিষ্ট আইনজীবীদের।

গত ১৯ জানুয়ারি দায়িত্ব এক বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা একটি বাণী দেন। এটি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। এতে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘কোনো কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী।’

প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্যের পর নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিএনপি বলছে, প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রমাণ করে, বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী অবৈধ। বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রেফতারের দাবিও করেছেন তারা। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করছে বিএনপি।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যতম আলোচিত রায় সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী তথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া রায়। প্রধান বিচারপতি এমবিএম খায়রুল হক রায় ঘোষণার পর অবসরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় লেখেন। তার অবসরে যাওয়ার ১৭ মাস পর এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে অর্থাৎ বিভক্ত রায়ে ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগ। ওই রায়কে ভিত্তি ধরে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সংবিধান সংশোধন করে প্রথম মহাজোট সরকার, যাতে বিলুপ্ত হয় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলোপের পর, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এর প্রতিবাদে ২০১৩ ও ২০১৪ সাল জুড়ে রাজপথে সহিংস বিক্ষোভ দেখায় বিএনপি-জামায়াত। এতে নিহত হয় বহু মানুষ, বিপুল সম্পদ নষ্ট হয়।

You Might Also Like