অবশেষে জীবন শঙ্কায় আত্মগোপনে হাসান সারওয়ার্দী!

হাসান সারওয়ার্দী

হাসান সারওয়ার্দী

যেকোনো মুহূর্তে গুম, অপহরণ বা প্রাণহানির শঙ্কা করছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বাহিনীর ইনচার্জ হিসেবে বিদায় নিয়েছেন খুব বেশিদিন হয়নি। দায়িত্ব পালন করেছেন সেনাবাহিনীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা পদাতিক ডিভিশনের জিওসি পদে। ফেসবুকে লাইভে দেয়া এক সাক্ষাতকারের পর থেকেই বেশ বিপাকে পড়েছেন হাসান সারওয়ার্দী।

সাক্ষাতকারে কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন সরকার, সেনাবাহিনী প্রধান, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কেলেংকারি, গুম-খুনের ভয়াবহ সন্ত্রাস আর প্রতিবেশী দেশ ভারতের এদেশের ইস্যুতে সরাসরি হস্তক্ষেপের মতো নানান স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে।

হাসান সারওয়ার্দী জানিয়েছেন ১৪ জুলাই নিউইয়র্ক নির্বাসিত সাংবাদিক কনক সারওয়ারের সাথে ফেসবুকে সাক্ষাৎকারটি দেবার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছে তাকে। এখন তাকে জোরপূর্বক তোলে নিয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপারমাত্র। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তিনি।

সারওয়ার্দী বলেন, “সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার এক শুভাকাংখীর কাছ থেকে আমি একটি বার্তা পেয়েছি। বার্তাটি অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই ডিলিট করে দিতে হয়েছে। বার্তাটি হলো-“তারা আপনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার পরিকল্পনা নিচ্ছে, আপনি এখন তাদের গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট।”

টার্গেট-এর অর্থ কী সেটা আমি ভালো করেই বুঝি। এর মানেই হলো জােরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে আসা, অপহরণ করা কিংবা এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে যার আর কোনো হদিস মিলবে না। অথবা তাকে তোলে নিয়ে যাওয়া হবে এবং কদিন পর গ্রেফতার দেখিয়ে তার নামে মামলা ঠুকে দেয়া হবে। এ দুটোই আমার সঙ্গে ঘটতে পারে।”

তিনি বলেন, “কোনো জায়গাকেই আমার কাছে এখন নিরাপদ মনে হচ্ছে না। একটা জায়গায় অবস্থান করছি, কিন্তু কোনো কিছুতেই আমি নিরাপদ না। এটা নিশ্চিত যে আমি কোথায় আছি সেটা তারা জানে এবং উপর মহল থেকে ধরে নেবার জন্য সুবজ সংকেতের অপেক্ষায় আছে। যখনি তারা সে সংকেত পাবে তখনি ধরে নিয়ে যাবে। কেউ জানবেও না কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সবাই বলছে-“আজকের দিনটাই তোমার শেষ দিন।”

সারওয়ার্দী জানিয়েছেন বুধবার সকালেই তাকে ওয়ালটনের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি বলেন, “কোম্পানিটি আমাকে জানিয়েছে তারা গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকার থেকে বড় ধরনের হুমকি পেয়েছে। আর সেজন্য আমাকে সেখানে আর রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার আমার কাজ, উপার্জনের রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছে।”

সাবেক এই তিন তারকা জেনারেল জানান তিনি এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনের আইনের খড়গে পড়েছেন। “দেশের মানুষের এখন সত্য বলার সুযোগ নেই।”

মঙ্গলবার সাংবাদিক কনক সারওয়ারকে দেয়া সাক্ষাতকারে সারওয়ার্দী নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন না হবার জন্য সরকারের কড়া সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, “যেভাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার কুক্ষিগত করে রেখেছে তাতে জনগণ কখনোই ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ পাবেনা।”

সারওয়ার্দী বলেন, “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি নির্বাচনের মাধ্যমে কখনোই এই সরকার পরিবর্তন করা যাবে না।”

রানা প্লাজা ধসের পর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে উদ্ধারকাজের নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় আসেন চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী। ২৬ মার্চ ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ আয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। এরপর তিনি আর্টডকের জিওসি ও ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট হন। সেনাপ্রধান হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকলেও সে আশা পূরণ হয়নি। সেখান থেকে ২০১৮ সানের ১ জুন অবসের যান। এর আগে তিনি আনসার ও ভিডিপি এবং এসএসএফের মহাপরিচালক এবং সেনা গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এখন দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।

রাজধানীর দুই হাসপাতালে সাম্প্রতিককালের করোনা টেস্ট কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সারওয়ার্দী বলেন, “এরকম হাজার হাজার লোক (সাহেদ) আছে যাদের পুলিশ স্কোয়াড দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। সামনে-পেছনে বাঁশি বাজে। গাড়িতে পতাকার স্ট্যান্ড আছে। তারা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যায়, বঙ্গভবনে যায়, গণভবনে যায়, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে এবং ফুলের তোড়া হাতে তোলে দেয়। মানেটা কী দাঁড়ালো-তাদের সেখানে যাবার সুযোগ আছে। আমার মতো লোক যারা দেশের সেবা করে যাচ্ছে তাদের কিন্তু সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। রাষ্ট্র এদেরকে সহযোগিতা করছে দুর্নীতি করতে।”

আরেকটি ঘটনার প্রসঙ্গ অবতারণা করে সাবেক এই সেনাকর্মকর্তা বলেন, “আমি আমার স্ত্রীসহ একটি কাপড়ের দোকানে যাই। এমন সময় পুলিশ এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রবেশ করলেন বললেন-জায়গা ফাঁকা করে দিতে হবে ভিআইপি আসবে। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম সেই ভিআইপি হলো জোসেফ। বর্তমান সেনাপ্রধান আজিজ আহমদের ভাই। ২০০৪ সালে জোসেফ খুনের দায়ে অভিযুক্ত হলেও ২০১৮ সালে মে মাসে ক্ষমতার বিশেষ ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট তাকে ক্ষমা করে দেন।”

তিনি বলেন, “আমি জোসেফকে চিনি একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসাবে। সে একজন খুনী।তার রয়েছে আরো চার ভাই-হারিস, আনিস, টিপু এবং বর্তমান সেনাপ্রধান। তাদের মধ্যে একজন বন্দুকযুদ্ধে নিহতহয়েছে এবং ২ জন পলাতক। জোসেফ সম্মান দিয়ে মুক্তিদিয়েছে সরকার।”

সারওয়ার্দী বলেন, “জোসেফ এই ভিআইপি সম্মান দেখেআমি হতবাক হয়ে পড়েছিলাম। পুলিশ তাকে পাহারা দিয়ে সম্মান দিচ্ছে। আমি দেশের সেবা করলাম ৪০ বছর। এখনসে কীনা ভিআইপি আর আমি পাচ্ছি তার উল্টােটা!”

সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দাদের হস্তক্ষেপ নিয়ে কথা বলেন সারওয়ার্দী। তিনি জানান সেনাবাহিনী এবং আমলা পর্যায়ে নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ভারতের গোয়েন্দারা।

সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, “আমি মনে করিনা সেনা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটবে। আমি এটা বিশ্বাসও করিনা। জনগণ স্বাধীন নয়। মাত্র কিছু লোক স্বাধীনতা বা সুবিধা ভোগ করছে। বাকীরা পরাধীন। তাদের হক আছে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে অধিকার আদায়ে রাজপথে নামতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণে লড়াই ছাড়া আমি বিকল্প পথ দেখিনা।”

 

হাসান সারওয়ার্দীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে দেশের সকল সেনানিবাস এবং এর আওতাভুক্ত সকল স্থাপনায় তার প্রবেশ, সিএমএইচে চিকিৎসাসেবা, অফিসার্স ক্লাব, সিএসডি শপ ইত্যাদিতেও তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হলো।

রবিবার (১৯ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (অবসরপ্রাপ্ত) বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে সেনানিবাসে প্রবেশ এবং সেনাবাহিনী সম্পর্কে মিথ্যাচার করেন, যা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর এনডিসির কমান্ড্যান্ট থাকাবস্থায় একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তিনি এনডিসিতে পরিচালিত বিভিন্ন কোর্সের সাথে বিদেশে ভ্রমণকালেও অনেক মেয়েকে নিয়ে চলাফেরা করেন এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তার এই অশোভনীয় আচরণ এবং মেলামেশার ছবি কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হলে কর্তৃপক্ষ বিব্রত হয় এবং তাকে বিভিন্নভাবে উপদেশ দেয়া হয়।

আইএসপিআর জানায়, হাসান সারওয়ার্দী এলপিআরে থাকাকালীন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেন। একই বছরের ২১ নভেম্বর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সেনা আইন বহির্ভূতভাবে মেসকিট (সামরিক পোশাক) পরে দ্বিতীয় স্ত্রীকে বিবাহ করেন। কিন্তু তিনি বিয়ের আগে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বর্তমান স্ত্রীকে নিয়ে ২০১৮ সালের ৩ নভেম্বর থেকে একই বাসায় অনৈতিকভাবে অবস্থান করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে হাসান সারওয়ার্দীর ব্যক্তিগত জীবনের আমলনামা তুলে ধরে বলা হয়, তিনি বিয়ের আগে তার বর্তমান স্ত্রীকে নিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন, সাজেক, রিসোর্ট, খাগড়াছড়িতে অবকাশ যাপন, বিভিন্ন সময় ভারত, থাইল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডে ভ্রমণ করেন। যার সচিত্র আলামত সামরিক ও অসামরিক পরিমণ্ডলে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। এছাড়া তিনি যাকে বিয়ে করেন সে একজন বিতর্কিত নারী হিসেবে পরিচিত।

আইএসপিআর জানায়, চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর এ ধরনের আচরণ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর। এ ধরনের ঘটনা সেনাবাহিনীতে কর্মরত অফিসার এবং অন্যান্য পদবির মধ্যে নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে কাজ করে ও বিরূপ প্রভাব ফেলে। সামগ্রিক বিবেচনায় গত বছরের ১০ এপ্রিল ওই অফিসারকে (হাসান সারওয়ার্দী) সেনানিবাস ও সেনানিবাস আওতাভুক্ত এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।

উল্লেখ্য, সেনা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অবাঞ্ছিত ব্যক্তির জন্য সেনানিবাস ও সেনানিবাসের আওতাভুক্ত সকল স্থাপনা এবং সেনানিবাসের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা যেমন- সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাসেবা, অফিসার্স ক্লাব, সিএসডি শপ ইত্যাদিতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়।

 

 

কেন হাসান সারওয়ার্দী অবাঞ্ছিত : আইএসপিআর