অন্ধকার বাংলাদেশ এবং রেবেকা মোমেন

শিতাংশু গুহ :

ক’দিন আগে পুরো বাংলাদেশ প্রায় একদিন অন্ধকারে ছিল। দোষ ভারতের। ঢাকা থেকে একজন জানতে চাইলেন, ‘জামায়াতের কারসাজি নয়তো? মৌলবাদীরা একদিনে ৫শ বোমা ফাটাতে পারে, কাজেই তারা একসঙ্গে পুরো বাংলাদেশও অন্ধকার করে দিতে পারে!’ যুক্তি অকাট্য। বেচারা ভারত! বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বাড়লেও ভারতের দোষ, বিদ্যুৎ গেল কি থাকল তাতো ভারতের দোষ হবেই। ‘যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্ট ব্যাটাই চোর’। কোনো কোনো মহল বলতে চেয়েছে, এটা সরকারের ব্যর্থতা। তবে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘তার নাটোরের সভার খবর বা ছবি না দেখানোর জন্যই এ অপকর্ম। অর্থাৎ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া এ অন্ধকার বা ব্লু্যাক-আউটকে যে যার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চেয়েছেন; অনেকটা অন্ধের হাতি দেখার মতো! যে কোনো দেশে যে কোনো সময়ে নানা কারণে ব্লু্যাক-আউট ঘটতেই পারে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা আর কতকাল অন্যের ওপর দোষ দিয়ে হাত মুছে ফেলতে চাইব? আমেরিকায় বিদ্যুৎ যায় না, কিন্তু ১৫/১৬ বছর আগে একবার গিয়েছিল এবং প্রায় সপ্তাহখানেক ব্লু্যাক-আউট, সব অচল হয়ে যায়। কানাডায় গ্রিডে বিপর্যয় ঘটেছিল। আমেরিকার জনগণ কিন্তু কানাডার দোষ দেয়নি, বরং আমেরিকা-কানাডা মিলে সমস্যার সমাধান করেছে। স¤প্রতি এনডিপির নাবিহা রহমান তার নেত্রী বেগম জিয়ার পক্ষে বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্লু্যাক-আউট’ সংবাদটি পুরো দেশকে লজ্জিত করেছে। তিনি অবশ্য ভুলে গেছেন, খাম্বার দেশ বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা বিদ্যুতের কোমল আলোয় রাঙিয়ে দিয়েছেন এবং সামনে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরো উন্নত হবে।

আমাদের একটি ‘বাতিক’ আছে। আমরা যে কোনো সমস্যার জন্য অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চাই। আমরা ভুলে যাই, আমাদের ভালোমন্দের জন্য আমরা, শুধু আমরাই দায়ী, অন্য কেউ নয়। আমাদের বাগানে ভালো বেগুন হলে আমরা বলি, ‘বিলাতি বেগুন’, যেন বিলাত ছাড়া ভালো বেগুন হয় না। ভালো মরিচ হলে বলি, ‘বোম্বাইয়া মরিচ’ বা এমনই কত কী! তবে এবার কুরবানির হাটের একটি উক্তিতে আমাদের মানসিকতার কিছুটা হলেও প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি দুই গরু বিক্রেতা দুটি নাদুস-নুদুস গরু নিয়ে বসেছে। একজন ক্রেতা এলেন, দুটো গরুই তার পছন্দ, দামও সমান। ক্রেতা ভাবছিলেন, কোনটি নেবেন। তখন এক বিক্রেতা বলেন, ‘স্যার, অরডা হিন্দু গরু (ভারত থেকে এসেছে), আমারটা নেন’। বোঝা গেল, অন্তত গরুর বাজারে আমাদের জাতীয়তাবাদ বেশ প্রখর; অনেকটা বিএনপির ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ মতো! আমাদের সমস্যা হলো, আমরা যা শুনতে চাই, তা কেউ না বললে রেগে যাই। রাস্তায় নেমে পড়ি ‘ফাঁসি চাই’, ‘কল্লা চাই’ দাবিতে। যা পড়তে চাই, এর বাইরে কেউ কিছু লিখলে তার বই বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানাই। টিভির অনুষ্ঠান পছন্দ না হলে তা বন্ধ করার জন্য মিছিল করি। কেউ মরলে তাকে শহীদ মিনারে নিতে হবে দাবি তুলি, অন্যরা আপত্তি করলে ‘দেশ গেল’ রব তুলি! পাকিস্তান আমলে আমরা সব ভারতীয় শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি, দেশীয় শিল্প বিকাশের স্বার্থে। সিনেমা শিল্প এর অন্যতম। কিন্তু আমাদের সিনেমা কি এখন আদৌ শিল্প? যে কোনো কিছুর উন্নতির জন্য প্রতিযোগিতা চাই। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় যে মানের ছবি হতো আজ তা স্বপ্ন। রহমানের মতো নায়ক আর তৈরি হয়নি। সিনেমা দেখার জন্য আমরা ভারতের মুখাপেক্ষী, অথচ নাটক দেখতে আমরা কিন্তু কলকাতার ওপর নির্ভরশীল নই। আবার বেনারসি শাড়ির জন্য আমরা কলকাতা গেলেও জামদানি কিন্তু বেইলি রোড থেকেই কিনি। অর্থাৎ ভালো জিনিসের কদর থাকবেই। ভারত আমাদের ১৬ কোটি মানুষের বাজার দখল করে নিচ্ছে বলে আমরা প্রায়শ অভিযোগ করি, যা সত্য, কিন্তু আমরা কেন ভারতের ১২০ কোটি মানুষের বাজার দখল করতে পারি না? ভারতের সেভেন সিস্টারের বাজার দখল করা কি এতই অসম্ভব?

এতকাল আমরা ভারতের সেভেন সিস্টারের বিদ্রোহীদের মদদ (জিয়া-খালেদা জিয়া-এরশাদ আমলে) দিয়েছি। বর্তমান বিশ্বকে বলা হয় ‘বিজনেস ওয়ার্ল্ড’, ভারতের বিদ্রোহীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিয়ে আমাদের উচিত ছিল ওদের সঙ্গে ব্যবসা করা, যা মহাজোট সরকারের আমলে কিছু মানুষ চিন্তা করছেন। মুক্ত পরিবেশে মানুষ সুস্থ চিন্তা করতে শিখে। জনগণের সরকারের সঙ্গে স্বৈরাচারী সরকারের এখানেই তফাৎ। আমরা নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গ করতে ওস্তাদ। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী সরকারগুলো এতকাল তাই করেছে। কোথায় যেন গল্পটা পড়েছিলাম। তিনটি ছবি : একটিতে একজন লোক ওপরে উঠছে, তাকে আর একজন সাহায্য করছে। দ্বিতীয় ছবিতে একজন লোক ওপরে উঠছে, অন্য একজন উল্টোদিকে তাকিয়ে আছে। তৃতীয় ছবিটিতে একজন লোক ওপরে উঠছে, অন্য একজন তাকে পা-ধরে টেনে নামাতে চেষ্টা করছে। বলাবাহুল্য, তৃতীয় ছবিটি আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আপাতত এটাকে এভাবে দেখা যায়, ‘শেখ হাসিনা ওপরে উঠতে চাইছেন, ম্যাডাম জিয়া তাকে পা ধরে টেনে নামাতে ব্যস্ত’। আবার দেখুন, একদা এরশাদ কবি ছিলেন। তখন তিনি ক্ষমতায়। ক্ষমতার এমনই গুণ, ব-কলমও কবি হয়ে যায়! তার কবিতা দেশের দৈনিকগুলো প্রথম পাতায় ছাপতেও বাধ্য হয়। এখন তিনি কবি নন। তার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে আর কবিতা বের হয় না! ক্ষমতা আমাদের দেশে ‘সোনার হরিণ’, সবাই ধরতে চায়, কিন্তু যিনি একবার ধরেন তিনি আর ছাড়তে চান না। এরশাদের তো বহুত খায়েশ একবার ‘প্রধানমন্ত্রী’ হওয়ার, তিনি বোঝেন না যে, ‘হি ইজ এ ডেড হর্স’। আর বেশিদিন নয়, বয়সের ভারে শেখ হাসিনা-বেগম জিয়ার জমানা শেষ হবে, ভাবছি, তখন কী? তাদের পরে তো আর কাউকে দেখছি না! মধ্যখানে ক’জনা তরুণ একটু আশার ঝলকানি দেখালেও এখন তারা নিষ্প্রভ। বিদ্যাসাগরের ভাষায়, এরা ‘দপ করে জ্বলে উঠে খপ করে’ নিভে গিয়েছেন।

এবার আসি রেবেকা মোমেনের প্রসঙ্গে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রেবেকা মোমেন সা¤প্রতিক এক সভায় বলেছেন, ‘নারীর অশালীন চলাফেরা ও পারিবারিক শৃঙ্খলা না থাকার কারণে দেশে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেছে’। পশ্চিমা দেশে প্রায়শ একটি পোস্টার সবারই চোখে পড়ার কথা, তাহল ‘ডোন্ট টেল মি হাউ টু ড্রেস, টেল দেম নট টু রেপ’। পোশাকের জন্য কি নারী ধর্ষিত হন? এমন হলে তো আরব দেশে ধর্ষণ থাকত না বা পশ্চিমা দেশে ধর্ষণের হিড়িক পড়ে যেত। শালীন পোশাকের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি অশালীন পোশাক ধর্ষণের কারণ নয়। রেবেকা মোমেন যা বলছেন তা ঠিক নয় এবং সেটা সাঈদী বা জামায়াতী এমপির মুখেই মানায়। দায়িত্বশীল লোকজনের এমনতর আবোল-তাবোল কথাবার্তা সরকারকে বিপাকে ফেলে। রেবেকা মোমেন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করেছেন বলে এখনো শুনিনি। তবে তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তসলিমা নাসরীনের কথাগুলো বেশ কর্কশ হয়ে গেছে, অতটা কঠোর না হলেও চলত। অবশ্য ওটা তসলিমা স্টাইল, চাছাছোলাভাবে নিষ্ঠুর সত্য বলে দেয়া! কিন্তু মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য যথার্থ, তিনি বলেছেন, ‘এমন কথা মেনে নেয়া যায় না’। নারীপক্ষ তার বক্তব্য প্রত্যাহার চেয়েছে। রেবেকা মোমেনের কথা ধর্ষকদের আনন্দিত করার সঙ্গে সঙ্গে মৌলবাদীদের উৎসাহী করবে সন্দেহ নেই, কারণ ওটা ওদেরই কথা। একদা আমি একটি মহিলা কলেজে অধ্যাপনা করতাম। আমরা যখনই বলতাম, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’- আমাদের মহিলা প্রিন্সিপাল সঙ্গে সঙ্গে বলতেন, ‘সেইমত স্বামী যদি থাকে তার সনে-’। আসলে এটাই সত্য। আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং অন্য একটি বড় দলের নেত্রী, স্পিকার, সবাই মহিলা। তবু মহিলারা ততটা এগুতে পারছেন না, কারণ সম্ভবত উচ্চপদে আসীন রেবেকা মোমেনের মতো মহিলাদের মানসিকতা; অন্যান্য কারণের কথা আপাতত না-ই বা বললাম।

শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৪

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

You Might Also Like