অতীত হারিয়ে যায় না, তাড়িয়ে বেড়ায়

‘ইতিহাসের শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।’ কথাটি প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক-নাট্যকার বার্নার্ড শ তাঁর নিজ দেশের ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বললেও বাংলাদেশের নিকট অতীতের রাজনীতি সম্পর্কে শতভাগ সত্য। আমাদের রাজনীতিকেরা যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতেন, তাহলে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর দেশ ও গণতন্ত্র এতটা কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতো না। জঙ্গিবাদী-মৌলবাদী শক্তিও ছোবল মারার সুযোগ পেত না।

ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ৪০তম বার্ষিকীতে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে, ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্ত ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে? এই বিতর্কে বিএনপি ছাড়াও শরিক হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও জাসদের নেতারা। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম শোক দিবসের একটি অনুষ্ঠানে প্রথম ক্ষমতাসীন জোটের শরিক জাসদের স্বাধীনতা–পরবর্তী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, জাসদই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছেন, ন্যাপ (সম্ভবত ভাসানী ন্যাপের কথাই তাঁরা বলতে চেয়েছেন) জাসদসহ বামপন্থীরাও বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য দায়ী।

রাজনীতিতে শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দুটো উপায় আছে। এক. নীতি ও আদর্শ। দুই. সুবিধাবাদ। বিতর্কে অংশ নেওয়া তিন পক্ষই নিজেদের সুবিধামতো ইতিহাস বিশ্লেষণ করছে। ১৯৭২-৭৫ সালে জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, যিনি এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাওয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, জাসদ প্রথমে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করলেও পরে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমেছিল। গণবাহিনী গঠনই তার প্রমাণ। অন্যদিকে জাসদের নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জাসদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁদের দাবি, এই সময়ে, এই বিতর্ক শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের হাতকেই শক্তিশালী করবে।

তিন মহলের তিন ধরনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে আমরা যে উপসংহারে আসতে পারি, তা হলো পুরো সত্য কেউ বলছেন না, আংশিক সত্য বলছেন। নিজের সুবিধামতো তাঁরা ঘটনা ব্যাখ্যা করছেন। আজ যাঁরা জাসদ করছেন, কিংবা স্বাধীনতার পর যাঁরা জাসদ তৈরি করেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ থেকে আসা। কেন জাসদ তৈরি হলো, এর নেপথ্যে কারা ছিলেন, সেই রহস্য আজও উদ্ঘাটিত হয়নি। লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি বইয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে; সবটা নয়। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় জাসদের জন্ম এবং আওয়ামী লীগের তরুণ ও র্যাডিক্যাল অংশ এতে সমবেত হয়েছিল। কিন্তু দলের যিনি সভাপতি হলেন, সেই মেজর জলিল আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। পরবর্তীকালে জাসদ থেকে বেরিয়ে তিনি ইসলামী দল গঠন করেন।

প্রথমেই বিএনপি নেতাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনায় যদি তাঁদের কোনো যোগসাজশ না থাকে, আর জাসদই যদি এর ক্ষেত্র তৈরি করে, তাহলে কেন তাঁরা ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করছেন না? তখন তো বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়নি (বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর)। তাহলে কেন তাঁরা ক্ষমতায় থাকতে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের রক্ষা করতে নানা রকম অপপ্রয়াস চালালেন? মওদুদ আহমদ তখন আইনমন্ত্রী ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, শত চেষ্টা করেও তিনি আপিল বিভাগে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি করাতে পারেননি। সম্প্রতি দলের আরেক নেতা নজরুল ইসলাম খান বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার স্থপতি বলে অভিহিত করেছেন। স্বাধীনতার স্থপতির হত্যার দিনে কি জাঁকজমক করে কেক কেটে দলীয় নেত্রীর জন্মদিন পালন করা যায়?

অন্যদিকে জাসদ নেতারা যেভাবে কথা বলছেন, তাতে মনে হতে পারে, পঁচাত্তরের আগে তাঁরা একেবারেই দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিলেন, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বাইরে কিছু করেননি, দলীয় মুখপত্র গণকণ্ঠে কেবল বঙ্গবন্ধুর বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করেছে (গণকণ্ঠে লিখিত ফরমান ছিল যে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে বঙ্গবন্ধু লেখা যাবে না)। তাঁদের কথায় এ-ও মনে হতে পারে যে জাসদের নেতা-কর্মীরা কোনো সাংসদকে হত্যা করেননি, ব্যাংক-থানায় আক্রমণ চালাননি।

পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর জাসদ নেতারা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যে সিপাহি জনতার অসমাপ্ত বিপ্লবটি করেছিলেন, সেই বিপ্লবের সঙ্গে যদি তাঁদের ভাষায় জিয়া বেইমানি না করতেন, তাহলে আজকে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান কী হতো? পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে খোন্দকার মোশতাকের বিরুদ্ধে জাসদ লিফলেট বিতরণ করেছে, এ কথা যেমন সত্য তেমনি অসত্য নয় কর্নেল তাহেরের প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারে আওয়ামী লীগ বা বাকশালের কোনো জায়গা ছিল না। ৭ নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবটি ঘটানো হয়েছিল ‘রুশ ভারতের’ দালালদের বিরুদ্ধে। সেদিনের কুশীলবেরা জিয়ার পাশাপাশি মোশতাকের ছবিও বহন করেছিলেন। জিয়ার শাসনামলে ১৯৮০ সালে জাসদ যে ১৮ দফা প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিনিময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জোট করার কথা ছিল। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আরও গণতন্ত্র’। অসমাপ্ত বিপ্লব থেকে আরও গণতন্ত্র। ১৮ দফা প্রশ্নে জাসদ ভেঙে যায় এবং বাসদ নামে আরেকটি দল হয়। ভুল পথে হলেও এখনো তারা সমাজবিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। আর জাসদের নেতারা জঙ্গিবাদ ও আগুন–সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করছেন। এটাই যদি প্রগতির শর্ত হয় তাহলে কেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতায় আটঘাট বেঁধে নেমে পড়েছিলেন?

জোটের ও দেশেরও বড় দল আওয়ামী লীগ। সে জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে প্রশ্নটি বড়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, তখন দলের নেতারা কি তাঁকে সহায়তার বদলে যুদ্ধ শেষের প্রাপ্য নিয়ে আত্মকলহে লিপ্ত ছিলেন না? দলের নামে অনেকেই কি বাড়ি-অফিস-কারখানা দখলে ব্যস্ত ছিলেন না। নকশাল-সিরাজ সিকদার ও গণবাহিনীর লোকেরা যেমন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা করেছে, তেমনি আওয়ামী লীগের, ছাত্রলীগের অনেক কর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। মুহসীন হলে সাত হত্যাকাণ্ড জাসদ বা নকশালরা করেনি। করেছিল ছাত্রলীগের শফিউল আলম প্রধানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। বঙ্গবন্ধু সেই হত্যার বিচার না করলে হয়তো আজও শফিউল আলম প্রধান আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদ অলংকৃত করে থাকতেন।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, যে বঙ্গবন্ধু একাত্তরে সমগ্র দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, পাকিস্তানিদের কারাগারে বন্দী থেকেও মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা হয়েছিলেন, সেই বঙ্গবন্ধু কেন দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারলেন না? এর পেছনে কোন ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল? আওয়ামী লীগের ডানপন্থী অংশের নেতা মোশতাক, কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ্ মোয়াজ্জেম, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, নূরুল ইসলাম মঞ্জুরদের কারা তখন পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন? কারাই বা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের দূরত্ব তৈরি করেছিলেন, ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটভূমি ব্যাখ্যা করতে এসব প্রশ্নের উত্তর খুবই জরুরি।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যখন নিহত হন, তখন কার কী ভূমিকা ছিল, সেটা আজ ইতিহাসের বিষয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে কারা ‘রুশ ভারতের দালাল ধরো, সকাল-বিকেল নাশতা করো’ স্লোগান দিয়েছিল, সে কথাও আমরা ভুলে যাইনি। যাঁরা দুদিন আগেও বঙ্গবন্ধু–বন্দনায় কাতর ছিলেন, প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাকশালে যোগদানের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, ১৫ আগস্টের পর তাঁদেরই দেখা গেল বিপরীত ভূমিকায়। ৪০ বছর আগের সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালেই সেই নির্মম সত্যই বেরিয়ে আসবে। সেদিন যাঁরা পুলকিত হয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ আজ নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সাচ্চা সৈনিক প্রমাণ করারও চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগের মধ্যে ডান ও বামের লড়াই বেশ পুরোনো। আওয়ামী লীগে বামপন্থীরা ছিলেন বলেই স্বাধীনতার আগে দলটি গঠনতন্ত্রে সমাজতন্ত্র ও জাতীয়করণকে গ্রহণ করেছিল। ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি আত্তীকরণ করেছিল। আবার স্বাধীনতার পর ডানপন্থীদের দৌরাত্ম্যের কারণে বঙ্গবন্ধু কৃষি ও ভূমি সংস্কার সফল করতে পারেননি। ১০০ বিঘা জমির সিলিং করার বিরোধিতা আসে দলের ভেতর থেকেই। এখন আওয়ামী লীগের নেতারা খোন্দকার মোশতাককে কুচক্রী ও খুনি বলে গালমন্দ করেন। কিন্তু একাত্তরে তাঁর ঘৃণ্য ভূমিকা সত্ত্বেও ১৫ আগস্টের আগে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেছেন, জানা যায়নি। বরং যে তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে মোশতাক ষড়যন্ত্র করেছিলেন, সেই তাজউদ্দীনকে রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে।

আমরা অবাক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করছি যে ১৫ আগস্টের এই বিতর্কে একটি পক্ষ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, যাঁরা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন, যাঁরা ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী; কেউ আত্মগোপনে থেকে, কেউ প্রকাশ্যে জনগণকে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করেছিলেন। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লিফলেট ছেপে ছাত্র ও তরুণদের মধ্যে বিলি করেছিলেন। কেউ কেউ টাকায় লিখেও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী পালিয়ে থাকলেও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সবার আগে প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আজ তিন পক্ষের বিতর্কের কোথাও তাঁরা নেই। এখনো আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বামপন্থী শুনলেই আঁতকে ওঠেন। যেসব বাম দল বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে, কেবল তারাই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নয়; যেসব রাজনৈতিক দল তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল, তাদেরও একহাত নিতে দ্বিধা করেন না আওয়ামী লীগের এই নেতারা।

অতএব, কেবল অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হোন। নিজের ভুল স্বীকার করুন। অতীত কখনো হারিয়ে যায় না। অতীত তাড়িয়ে বেড়ায়।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

sohrabhassan55@gmail.com

You Might Also Like